খালেদার পক্ষে বিবৃতি দেয়া কার্লাইলের ‘মূল কাজ’

107

বিএনপি নেত্রীর পক্ষে আদালতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই তার ব্রিটিশ আইনজীবী লর্ড এলেক্স কার্লাইলকে বেগম খালেদা জিয়ার আইনি পরামর্শক হিসেবে নিয়োগে দেয়া হলেও।

তাহলে কার্লাইলকে কেন নিয়োগ দেয়া হয়েছে-এমন প্রশ্নে খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলাকালে কার্লাইল যেমন এই বিচারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে বক্তৃতা, বিবৃতি বা দূতিয়ালি করেছেন, খালেদা জিয়ার মামলাতেও একই কাজ করবেন তিনি।

বাংলাদেশের আদালতে দাঁড়াতে হলে বার কাউন্সিলের সনদ নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই সনদ না থাকলে কারও পক্ষে আইনগত সহায়তা দেয়া সম্ভব নয়। ইতিপূর্বে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের নেতাদের পক্ষে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তবে তারা বাংলাদেশে এসে আইনগত সহায়তা দিতে পারেননি।

বার কাউন্সিলের সদস্য ও আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম ঢাকাটাইমসকে জানান বলেন, বাংলাদেশের আদালতে বিদেশি আইনজীবী এসে আইনগত সহায়তা দেয়ার সুযোগ নেই। তাই খালেদা জিয়ার মামলায় পরোক্ষ-প্রত্যাক্ষ কোনোভাবেই সহায়তা দিতে পারবেন না কার্লাইল।

‘তবে তিনি বিদেশে বসে মামলা ভণ্ডুলের চেষ্টা করতে পারেন’-বলেন সুপ্রিমকোর্টের এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।

তাহলে লর্ড কার্ডলাইল কী করবেন? জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদিন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘তারেক রহমান সাহেব লন্ডনে আছেন। তিনি ম্যাডামের মামলার বিষয়টি বুঝতে তাকে নিয়োগ দিয়েছেন।’

‘তিনি (কার্লাইল) বাংলাদেশে এসে মামলা পরিচালনা করবেন না। তিনি এ বিষয়ে বিবৃতি দিতে পারেন।’

গত ২০ মার্চ লর্ড কারলাইলকে খালেদা জিয়ার আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

ব্রিটিশ আইনজীবী হয়ে খালেদা জিয়ার মামলায় কী ভূমিকা রাখবেন-সে নিয়ে তবে সেদিনই মির্জা ফখরুল ইঙ্গিত দেন, তিনি ‍মূলত বিদেশে বিএনপির বক্তব্য তুলে ধরবেন।

ফখরুল বলেন, ‘বিশ্ব সম্প্রাদয়ের কাছে খালেদা জিয়ার মামলা ও সাজার বিষয়ে তুলে ধরতে কাজ করবেন লর্ড কার্লাইল।’

ব্রিটিশ লর্ডসভার সদস্য হলেও কার্লাইলের নাম এর আগেও এসেছে বাংলাদের গণমাধ্যমে।

পোল্যান্ড থেকে যুক্তরাজ্যে অভিবাসিত ইহুদি আইনজীবী লর্ড কার্লাইল বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কঠোর সমালোচক ছিলেন। তিনি এই বিচারের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে নানা সভা, সেমিনার এবং ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে দূতিয়ালির চেষ্টা করেছেন।

২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ‘নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার’ জন্য আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি জানান লর্ড কার্লাইল। জেনেভাস্থ ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশন ফর হিউম্যান রাইটস-এর হাই কমিশনার নাভি পিল্লাই বরাবর লিখিত এক চিঠিতে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপও চেয়েছিলেন লর্ড কার্লাইল।

আলবদর নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর না করার দাবিতে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের কাছে চিঠিও লিখেছিলেন ব্রিটিশ এই আইনজীবী।

২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলন চলাকালে বাংলাদেশে ‘গ্রহণযোগ্য’ সরকার গঠনে উদ্যোগ নিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে অনুরোধ করেছিলেন লর্ড কার্লাইল।

কার্লাইলের এই ভূমিকার কারণে তাকে ব্রিটেনে জামায়াতের লবিস্ট আখ্যা দিয়ে বিএনপির এই নিয়োগের সমালোচনা করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। এরপর আবার কার্লাইলের পক্ষ খেকে প্রতিক্রিয়া এসেছে। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, তার সঙ্গে জামায়াতের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এরপরও এই অভিযোগ তুললে তিনি আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিরোধিতার বিষয়ে তার বক্তব্য এমন: ‘বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মান বজায় থাকছে কি না- সে বিষয়ে একজন আন্তর্জাতিক আইনজীবী হিসেবে আমি আমার মতামত সেখানে দিয়েছি।’

এরই মধ্যে গৌরব ’৭১ নামে একটি সংগঠন গত ২৩ মার্চ রাজধানীতে মানববন্ধন করে কার্লাইলকে জামায়াতের দোসর আখ্যা দিয়ে তাকে দেশে আসতে না দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে খালেদা জিয়া নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি আছেন। তিনি হাইকোর্ট থেকে চার মাসের জামিন পেলেও আপিল বিভাগ তা স্থগিত করেন। আগামী ৮ মে এ বিষয়ে শুনানি হবে।

এই মামলাটি ছাড়াও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরও ৩৫টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা। এর মধ্যে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় যু্ক্তি উপস্থাপন চলছে। তবে অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় তিনি কারাগারে যাওয়ার পর থেকে আর যুক্তি উপস্থাপন হয়নি। তবে মামলাটি দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।

এর বাইরে দুর্নীতির আরও তিনটি মামলা অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে আছে। আর বাকি মামলা আন্দোলনের সময় নাশকতা, মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য, স্বাধীনতাবিরোধীদের মন্ত্রী করা, ১৫ মার্চ ভুয়া জন্মদিন পালনসহ নানা অভিযোগে করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসের সদস্য লর্ড কারলাইল কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভের চেয়ারম্যান। যুক্তরাজ্যের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের স্বাধীন পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রায় এক দশক কাজ করা এই আইনজীবী ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই সিক্সের সাবেক প্রধান জন স্কারলেটের সঙ্গে মিলে এসসি স্ট্র্যাটেজি লিমিটেড নামে একটি পরামর্শ সেবা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন, যা বছর তিনেক আগে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আসে।