ঘটছে হত্যা-ধর্ষণ শ্লীলতাহানি ও ডাকাতি

11

গণপরিবহনে হত্যা, ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি ও ডাকাতির ঘটনা ঘটছে । বাসে নারী যাত্রীকে একা পেলেই টার্গেট করে দুর্বৃত্তরা। চালক-হেলপারের যোগসাজশে ঘটে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণের ঘটনা।  আবার ভারতীয় টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘ক্রাইম প্যাট্রোল’-এর আদলে ডাকাতি করে আসছে কয়েকটি চক্র। বাস ভাড়া করে নিজেরাই চালক-হেলপার সেজে যাত্রী তুলে বিভিন্ন চক্র। তারপর  নির্বিঘ্নে সর্বস্ব লুটে নিয়ে যায়। বছরের পর বছর এভাবেই বাসে ডাকাতি হচ্ছিলো। দেশব্যাপী ছড়িয়ে রয়েছে এসব চক্রের সদস্যরা। পুরো বাসজুড়ে যাত্রীবেশে থাকে চক্রের সদস্যরা।

বিভিন্ন কৌশলে এক বা দুইজন যাত্রী তুলে তারা। তারপর সুবিধাজনক নির্জন স্থানে নিয়ে মারধর করে সর্বস্ব লুটে নিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। সম্প্রতি কয়েক চক্রের সদস্যরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর জানা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

গত ২৪শে  জুলাই রাত ২টায় গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাট যাওয়ার জন্য বাসে উঠেন ব্যবসায়ী মাইদুল ইসলাম। দীর্ঘ সময় সাভারের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েও বাস পাচ্ছিলেন না। এরমধ্যেই ‘অফিস স্টাফ’ লেখা একটি বাসের দেখা মিলে। ধীরগতিতে চলছিল বাসটি। মাইদুল হাত নাড়েন। সঙ্গে সঙ্গেই বাসটি থামে। এতেই উঠেন মাইদুল ইসলাম। বাসে উঠার পরপরই ঘটনাটি ঘটে। কিছু বুঝে উঠার আগেই বাস চালকসহ সাত-আট জন তাকে জাপটে ধরে। এসময় বাধা দিলে তাকে বেদম মারধর করা হয়। তার হাত-পা ও চোখ বাঁধা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে মোবাইলফোন সেট, নগদ টাকা লুটে নেয়। এমনকি বিকাশে থাকা টাকাসহ প্রায় ২৬ হাজার টাকা নিয়ে হাত- পা বাঁধা অবস্থায় সাভার থানার তুরাগ নদ সংলগ্ন নির্জন এলাকায় ফেলে দেয় তাকে। তারপর দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে গত ২৫শে অক্টোবর সাভার থানায় মামলা করেন তিনি। মামলা দায়েরের পর গ্রেপ্তার করা হয় দুই ডাকাতকে। এরমধ্যে লালন সর্দার নামে এক ডাকাত আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এই চক্রের অন্যদের গ্রেপ্তার করতে গত বৃহস্পতিবার রাতে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর থানার দুর্গম চর থেকে ডাকাত দলের মূলহোতা মানিকগঞ্জের আলমগীরসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়াতেই ডাকাতি শেষে দুর্গম বাঁচামারা নামক এই চরে রাতযাপন করতো চক্রের সদস্যরা। তাছাড়া ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করতো।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই’র ঢাকা জেলার এসআই সালেহ ইমরান জানান, গার্মেন্টস ছুটির পর শ্রমিকদের পৌঁছে দিয়ে মধ্য রাতে বাসটি নিয়ে ডাকাতিতে নামতো এই চক্র। বাসে ১০-১৫ সদস্যের একটি ডাকাত দল থাকতো। পিবিআই’র অভিযানে গ্রেপ্তাররা হচ্ছে, মো. সুমন মিয়া (২৫), মো. শরীফ মোল্লা (২০), মো. মুহিত শেখ (২২),  মো. আলমগীর হোসেন (২৮) ও মো. রাজীব হোসেন (২১)।

এরকম একটি চক্রের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে হোটেল ব্যবসায়ী রবিউল ইসলামকে। গত ৫ই অক্টোবর সাভারের বলিয়ারপুর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

গত বছরের ৫ই অক্টোবর সাভারের নবীনগরে একটি বাসে উঠেন রবিউল। বাসে উঠার পর তার সর্বস্ব লুটে নিতে চাইলে বাধা দেন তিনি। এ সময় হুইল রেঞ্জ দিয়ে রবিউলের অণ্ডকোষে আঘাত করলে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু ঘটে। পরে হেমায়েতপুরে লাশটি ফেলে যায়। ১৩ই অক্টোবর সাভার থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ওই চক্রের বাছির মোল্লাকে। পরবর্তীতে এই চক্রের আরো আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। এই চক্রে মোট ১৮ জন কাজ করতো। বাস ভাড়া নিয়ে তাতে স্টিকার পরিবর্তন করে, রং দিয়ে বিভিন্ন রুটের নাম লিখে যাত্রী উঠিয়ে ডাকাতি করছিল চক্রের সদস্যরা। তাদের মধ্যে কেউ চালক, কেউ হেলপার ও বাকিরা যাত্রী সেজে বসে থাকে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ ডাকাতিই তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে। তবে কখনো কখনো নারী যাত্রী পেলে তাদের অশালীন আচরণের শিকার হন তারা। এ ছাড়া গণপরিবহনে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডও ঘটছে। পরে তার লাশ টাঙ্গাইলের মধুপুর বন এলাকায় ফেলে যায়। টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে ঢাকার আইডিয়াল ল’ কলেজের ছাত্রী রূপা খাতুনকে গণধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। ২০১৮ সালের এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পর গণপরিবহনে নারীদের উত্ত্যক্ত করা থেমে নেই।

গত বছরের ২৬শে ডিসেম্বর সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে বাসের চালক ও তার সহকারী। নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে বাস থেকে লাফ দিয়ে আহত হন ওই ছাত্রী। সুনামগঞ্জ-দিরাই সড়কের সুজানগর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সিলেট থেকে বাসে বাড়ি ফেরার সময় এ ঘটনা ঘটে। এসময় বাসে অন্য কোনো যাত্রী ছিল না। এসব বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি সোহেল রানা বলেন, জেলা ও হাইওয়ে পুলিশ রাতে মহাসড়কে টহল দিচ্ছে। যে কারণে ডাকাতি কমেছে। পুলিশের কঠোর নজরদারির কারণে ডাকাতরা নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। এক্ষেত্রে পুলিশও সচেতন রয়েছে বলে জানান তিনি।