ঘোষিত মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতেই হবে

362

জনগণের মনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স ঘোষণা। একদিকে সাধারণ মানুষ আনন্দিত যে এই রকম কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। দেশ যেভাবে ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে, সেই অবস্থায় এমন ভূমিকা না নিলে আরো দুঃসহ হয়ে পড়বে মাদক নিয়ন্ত্রণ। অন্যদিকে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বন্দুক যুদ্ধ এর সমাধান হতে পারে না। তাঁরা বলেন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ অভিযান এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ ও জনগণকে সচেতন করে সমস্যা কমিয়ে আনা সম্ভব। তবু আপাত দৃষ্টিতে ‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ শীর্ষক র‌্যাবের দেশব্যাপী সচেতনতা কার্যক্রমকে  জানাচ্ছে দেশের লোকজন।

ইয়াবা এখন নানা জায়গায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কেননা মাদকের নীল দংশন পুরো দেশকে গ্রাস করে ফেলছে। এ সব মাদকের মধ্যে বর্তমানে ইয়াবার চালান একেবারে অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছে। লাখে লাখে পাচার হচ্ছে এ ট্যাবলেট। কখনো বাসের চাকায়, কখনো বাইকের তেলের ট্যাংকে, কখনো বা সিএনজি টেক্সির সিলিন্ডারে করে যে যেভাবে পারছে সেভাবে পাচার করছে ইয়াবা। র‌্যাব–পুলিশের অভিযানে ধরাও পড়ছে পাচারকারীরা। তবুও যেন থামানো যাচ্ছে না ইয়াবা পাচারকারীদের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বহনে সহজযোগ্য হওয়ায় পাচারকারীরা নানা পন্থায় ইয়াবা পাচার করছে। বিভিন্ন পথে এ ট্যাবলেট চোরাচালানি সিন্ডিকেট পৌঁছে দিচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে তৈরি এ ইয়াবা বিভিন্ন ক্যাটাগরির। স্বল্পমূল্য ও বেশি মূল্যের বিভিন্ন জাতের এ সব ইয়াবা ট্যাবলেটের ক্রেতা সমাজের যুবসমাজ থেকে অভিজাত শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে। এর চাহিদা এত বেশি বেড়ে গেছে, এটাকে রোধ করা কোনোক্রমেই সম্ভব হচ্ছে না। চাহিদার কারণে নকল ইয়াবাও দেশে তৈরি হচ্ছে বলে পত্রপত্রিকায় জানা গেছে।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য থেকে জানা যায়, গত শতকের নব্বই–এর দশকের শেষ দিক থেকে এ ইয়াবা ট্যাবলেট বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। শুরুতে এটির চাহিদা ব্যাপকভাবে ছিল রাজধানী ঢাকায়। পরে তা বিস্তৃত হয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বর্তমানে সড়ক পথে, নৌপথে এবং সাগর পথে সবদিক থেকেই ছোট বড় নৌযান ও যানবাহনযোগে বিভিন্ন কৌশলে ইয়াবার চালান পৌঁছে যাচ্ছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ঢাকায় প্রায় কোনো না কোনোদিন ছোট বড় ইয়াবার চালান আটক হচ্ছে। ধরা পড়ছে চালানের বাহকরা।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা হচ্ছে এ ইয়াবা পাচার রোধে মূল দায়িত্ব যাদের ওপর সেই পুলিশের একশ্রেণির অসৎ সদস্য এ ব্যবসার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। মূলত মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা সততার মাধ্যমে দায়িত্ব পালন না করলে এ ধরনের ইয়াবাসহ চোরাচালানের বিভিন্ন পণ্য সহজে পার পেয়ে যাওয়ার অবকাশ থেকে যায়। সমাজের বিভিন্ন স্তরে অসৎ ব্যক্তিদের অবস্থান যেমন রয়েছে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতেও এ ধরনের লোকজন যে নেই তা বলা যাবে না। এদের সহযোগিতায় ইয়াবা পাচারকারীরা পার পেয়ে যায়। ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের পাচারের ব্যাপারে আইনের যথাযথ প্রয়োগ দরকার। শাস্তির ব্যবস্থাও সর্বোচ্চ করা অপরিহার্য। না হয় ইয়াবার আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশের যুব সমাজকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স ঘোষণা অভিনন্দন পাওয়ার মতো উদ্যোগ। কিন্তু মাদকাসক্তি ও মাদকের সহজলভ্যতার কারণগুলো চিহ্নিত না করে, ছিদ্রগুলো বন্ধ না করে, বড় বড় রাঘব–বোয়ালদের ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে এবং চুনোপুঁটি মাদক বিক্রেতাদের নির্বিচারে হত্যা করে মাদক–বিরোধী অভিযান সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

ইয়াবার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এটির চোরাচালান ও বিক্রয়ে জড়িয়ে পড়াদের গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা যেমন দরকার, তেমনি সীমান্তসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর করা এবং পাচার–বহন ও এ ব্যবসায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োগ করা দরকার। মাদকব্যবসার সাথে সন্ত্রাসী–অস্ত্রবাজরা জড়িত হয়ে পড়েছে বলে যে অভিযোগ চালু আছে, সেখানে কঠোর হস্তে তাদের মোকাবেলা করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে ঘোষিত যুদ্ধে সরকারকে জয়ী হতেই হবে।