Home / আর্ন্তজাতিক / চীনের ভূমিকা কী,নেপাল-ভারত সম্পর্কের অবনতি ?

চীনের ভূমিকা কী,নেপাল-ভারত সম্পর্কের অবনতি ?

ব্রিটিশ ও রুশ সাম্রাজ্যের মধ্যে ১৯ শতকে ‘গ্রেট গেম’ শুরু হয়েছিল মধ্য এশিয়ার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের জন্য । বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় একই ধরনের ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে দুটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি ভারত ও চীনের মধ্যে।

উত্তর ও দক্ষিণ-দুই দিক থেকে দুটি শক্তিশালী প্রতিবেশীর মধ্যে চিড়ে-চ্যাপ্টা হওয়া নেপাল অনেক বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও কুশলী কূটনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এশিয়ার দুই জায়ান্টের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অবস্থানে থাকার সুযোগটি সে পেয়েছে। ভূরাজনৈতিক দাবার ছকে নেপাল আর অধিকতর শক্তিশালী প্রতিবেশীর হাতের ‘ঘুঁটি’ হয়ে থাকতে চায় না। বরং সে চায় কুশলী হাতে ভারত ও চীন উভয়ের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতে।

গত ৯ মে ভূবেষ্টিত হিমালয়ের দেশ নেপাল তার ভাষায় একটি বিরোধপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে যাওয়া নতুন লিঙ্ক রোড নির্মাণের জন্য ভারতের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এর এক দিন আগে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং লিঙ্ক রোডটি উদ্বোধন করেছিলেন। এর ছয় মাস আগে ভারতের প্রকাশিত একটি মানচিত্রে এলাকাটিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে দেখানো হয়েছিল।
কোভিড-১৯ লকডাউন সত্ত্বেও নেপালে বিশাল বিক্ষোভ হয়েছে। নেপালি পার্লামেন্ট ও রাজপথ উভয় স্থানেই প্রবল আবেগ প্রদর্শন করা হয়েছে।

এই আগ্রাসী অবস্থানে আবারো প্রমাণিত হলো যে কমিউনিস্ট প্রধানমন্ত্রী খগড় প্রাসাদ শর্মা ওলির অধীনে নেপালের ভূরাজনৈতিক শক্তিকে নেপাল ও ভারতের কৌশলগত ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আর অবমূল্যায়ন করতে পারবে না। সাম্প্রতিক আন্দোলন দুই দেশের মধ্যকার টানাপোড়নের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ করল।

ভারত বলছে- লিঙ্ক রোডটি ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের ধারচুলাকে চীনের সাথে ভারতের সীমান্ত লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলের (এলএসি) কাছে লিপুলেখ পাবর্ত্য গিরিপথে মিলিত হয়েছে। কিন্তু নেপাল বলছে-এটি তার দক্ষিণ দিকের কালাপানি নামে পরিচিত ভূখণ্ডের গিরিপথ দিয়ে অতিক্রম করেছে। কালাপানি হলো দুই দেশের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ এলাকা।
ভারতের সাথে নেপালের সীমান্ত বিরোধ ৫৬ বছর ধরে চললেও তা অবসান ঘটেনি। ভারতের ‘বড় ভাইসুলভ’ নীতিরও প্রতিবাদ করছে নেপাল। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক কৃষ্ণা পাখরেল বলেন, বিরোধপূর্ণ এলাকায় নেপাল প্রয়োজনে তার সেনাবাহিনী পাঠাবে।

তিনি বলেন, ভারত মনে করছে যে সে তার সামরিক শক্তি দিয়ে যা খুশি তাই করতে পারে। ভারতের শক্তি প্রদর্শনের মনোভাব বরদাস্ত করা উচিত নয়। প্রয়োজন হলে নেপালের উচিত হবে ভারতের মুখোমুখি হওয়া এবং বিরোধপূর্ণ এলাকায় তার সেনাবাহিনীর মোতায়েন বাড়ানো।

তিনি বলেন, নেপাল যদি রাস্তা নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, তবেই কেবল ভারতের একতরফা কাজের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নজর দেবে। নেপাল এখন পর্যন্ত ভারতের কঠোর ধরনের কৌশলের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ামূলক মনোভাব প্রদর্শন করেছে। এখন সময় এসেছে ভিন্ন ভূমিকা গ্রহণ করে ভারতের দিকে অবস্থা ঘুরিয়ে দেয়ার। যাই হোক না কেন, নেপালের উচিত হবে সক্রিয়া হওয়া। নেপাল যদি তার ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব রক্ষাই করতে না পারে, তবে ৯০ হাজার সদস্যের শক্তিশালী সেনাবাহিনী দিয়ে কী হবে?

ভারত বলছে যে নতুন রাস্তাটি তীর্থযাত্রীদেরকে চীনের তিব্বতের হিন্দুদের পবিত্র স্থান কৈলাশ-মানোসসরোবরে যাওয়ার পথ অনেকটাই কমে গিয়ে তাদের পরিশ্রম লাঘব করবে। কিন্তু নেপাল মনে করছে, এটা হলো বিরোধপূর্ণ ভূমি দখল করার একটি কৌশল।

তবে কাঠমান্ডু ক্রমবর্ধমান হারে বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ হওয়া নিয়ে দিল্লির অস্বস্তির বিষয়টি বিবেচনা করলে লিপুলেখ সীমান্ত বিরোধে পর্দার আড়াল থেকে চীনের ভূমিকা উড়িয়ে দেয়া যায় না বলে কোনো কোনো বিশ্লেষক জানিয়েছেন। চীনা ফ্যাক্টরের কারণে ভারত ও নেপালের মধ্যকার জটিল সম্পর্ক আরো প্যাঁচালো হতে পারে বলে তাদের অভিমত।
চীন এখন পর্যন্ত লিপুলেখ গিরিপথ সীমান্ত বিরোধে সরাসরি কোনো অবস্থান গ্রহণ না করলেও নেপাল যে চীন কার্ড খেলছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই অভিমত চীন বিশেষজ্ঞ ড. বিনোদ মিশ্রের। কলকাতাভিত্তিক সেন্টর ফর স্টাডিজ ইন ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চের পরিচালক মিশ্র সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, এই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নেপাল খুবই কুশলী হাতে কূটনৈতিক কার্ড খেলছে, তারা তাদের আপত্তির কথা প্রকাশ্যে জানাচ্ছে।

কৌশলগত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন সত্যি সত্যিই নতুন গ্রেট গেমে পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে ভারত ও চীন উভয়ের সাথে আলোচনা করা এবং লিপুলেখ, কালাপানি ও লাম্পিয়াধুরা যে নেপালের অংশ তা নিশ্চিত করা।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, লিপুলেখ ইস্যুটি এখন ওলি সরকারের জন্য বাধ্যবাধকতাপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়ে গেছে। আঞ্চলিক অবস্থান ও ২০১৫ সালের ভারত ও চীনের মধ্যকার চুক্তির বিষয়টি মাথায় রেখে অনেকেই বলছেন যে এ নিয়ে বেইজিংয়ের সাথে আলোচনা করা কাঠমান্ডুর কর্তৃব্য। তবে ২০১৫ সাল থেকে লিপুলেখ নিয়ে চীনের সাথে কোনো পর্যায়েই নেপাল সম্পৃক্ত হয়নি।

মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য মূল গ্রেট গেমে যেভাবে আধা সরকারি কর্মকর্তা ও বেসরকারি অভিযাত্রীরা গোপন অভিযান চালিয়েছিল, নিয়ন্ত্রণ লাভের নতুন খেলাও হচ্ছে অনেক ফ্রন্টে এবং তাতে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কার ব্যাপ্তিতে সাহায্য, বিনিয়োগ ও রাজনীতি সক্রিয় রয়েছে।

ভারতে নিযুক্ত সাবেক নেপালি কূটনীতিক লোকরাজ বড়াল বলেন, লিপুলেখ বিরোধ নতুন না হলেও গিরিপথে লিঙ্ক রোড নির্মাণ বিরোধটিকে সামনে নিয়ে এসেছে, নেপাল কঠোর কূটনৈতিক নোট দিয়েছে।

২০১৫ সালেও নেপালের অনুমতি ছাড়াই ভারত ও চীন লিপুলেখ গিরিপথকে অন্তর্ভুক্ত করে যে চুক্তি করেছিল, তার বিরোধিতা করেছিল বলে বড়াল উল্লেখ করেন। ভারত এখন নেপালি ভূখণ্ড দিয়ে লিঙ্ক রোড নির্মাণ করায় বিষয়টি আরো জটিল হয়ে গেল।

টেলিফোনে সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বড়াল বলেন, কালাপানি ইস্যু নিয়ে ভারত ও নেপালের মধ্যকার প্রধান পার্থক্য হলো মহাকালি নদী। দিল্লি এখন বলছে যে করোনাভাইরাস লকডাউনের পরে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু কাঠমান্ডু বলছে, এটি যত দ্রুত সম্ভব করা উচিত। দ্রুত আলোচনা শুরুর জন্য নেপালের মধ্যে প্রচণ্ড চাপ রয়েছে।
মোদি সরকার ২০১৯ সালের নভেম্বরে জম্মু ও কাশ্মির ও লাদাখ নিয়ে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এই মানচিত্র দুই প্রতিবেশীর মধ্যে নতুন করে তীব্র বিরোধ সৃষ্টি করেছে বলে সাংবাদিক অনিল গিরি জানিয়েছেন। কালাপানি বিরোধ নিয়ে নভেম্বরে পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল নেপাল। কিন্তু ভারত তাতে সাড়া দেয়নি বলে গিরি জানান।

চীন বিশেষজ্ঞ বিনোদা মিশ্র বলেন, কালাপানির কৌশলগত লিপুলেখ গিরিপথ দিয়ে চীনা সৈন্য ও বেসামরিক চলাচলের ওপর চোখ রাখতে চায় ভারত। লিপুলেখ গিরিপথটি ভারতের জন্য যেমন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ, একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ চীন ও নেপালের জন্য।

নেপাল ১৮১৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের সাথে করা মানচিত্রের ভিত্তিতে লিপুলেখের ওপর দাবি তুলছে। কিন্তু ১৯৬২ সালে চীনের সাথে যুদ্ধের পর থেকে নেপালের কথায় কর্ণপাত করছে না ভারত। পোখরেল বলেন, এখন নিজের উপস্থিতি প্রদর্শনের জন্য নেপালকেও সেখানে সৈন্য পাঠাতে হবে। ১৩ মে নেপাল বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে এলিট আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে। নেপাল এখন লিপুলেখ, কালাপানি, লাম্পিয়াধুরাসহ ভারতের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সব এলাকা নিজ ভূখণ্ডের অন্তর্ভুক্ত করে নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সূত্র- সাউথ এশিয়ান মনিটর 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: