চীন-রাশিয়া থেকে দ্রুত টিকা পেতে পারে বাংলাদেশ টিকা রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা অনৈতিক

77

বিশ্বের সবচেয়ে বড় টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউট অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী তাদের টিকা উৎপাদন করছে । সিরাম ইন্সটিটিউটের সিইও আদর পুনাওয়ালা জানিয়েছেন, আরো কয়েকমাস অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা রপ্তানিতে প্রতিষ্ঠানটিকে অনুমতি দেবে না ভারত সরকার।
বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশ আশা প্রকাশ করেছিল, শিগগিরই সিরামের উৎপাদিত অক্সফোর্ডের টিকা তাদের দেশে পৌঁছবে। তাই ভারতীয় এমন সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের বহু নাগরিক হতাশা প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশে এখন কবে ভ্যাকসিন আসবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে মানবজমিনের সাথে কথা বলেছেন বিশ্ব ব্যাংকের সিনিয়র হেলথ স্পেশালিস্ট ড. জিয়াউদ্দিন হায়দারঃ

টিকার উদ্ভাবকতো অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা। ভারতের সিরামের ভূমিকা তাহলে কি?
-হ্যা। টিকার উদ্ভাবক অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিরামকে তারা তাদের প্রযুক্তি সরবরাহ করে যাতে সিরাম বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য দ্রুত টিকা সরবরাহ করতে পারে।

এখন এই সরকারি নিষেধাজ্ঞার জন্য সিরাম  অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলোতে পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টিকা সরবরাহ করতে পারবে না।

এতো টিকা থাকতে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য অক্সফোর্ডের টিকা-ই কেন নির্বাচিত করা হলো?
-অন্যান্য টিকাগুলো সংরক্ষণের জন্য যে তাপমাত্রা প্রয়োজন তার সুবিধা বাংলাদেশ এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর নেই। অক্সফোর্ডের টিকা ৪-৮ ডিগ্রী (+) সেলসিয়াসে সংরক্ষণ সম্ভব। তাই এর চাহিদাটা বেশি। তাছাড়া বাংলাদেশে ইপিআই এর মাধ্যমে যেভাবে অন্যান্য টিকা দেয়া হয় সেভাবেই এই টিকা দেয়া সম্ভব। তাই টিকাদানকারীদের বাড়তি প্রশিক্ষণ দেবারও প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশ অক্সফোর্ডের টিকা পাবার পরিকল্পনা কিভাবে করেছিল?
-গ্যাভি-কোভ্যাক্সের অ্যালায়েন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্পমূল্যে টিকা পাবার কথা। কোভ্যাক্সের বাইরে সরকার সিরামের সাথে তিন কোটি ডোজ টিকার জন্য চুক্তি করে, যা দেড় কোটি মানুষকে দুই ডোজ করে দিতে পারার কথা। এখন সবকিছু নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হলো।

টিকা রপ্তানিতে ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কিভাবে দেখছেন?
-এটা বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের হুমকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক নীতির পরিপন্থী। কারণ করোনার টিকা এক ধরনের ‘গ্লোবাল পাবলিক গুড।’ কেউ তা আটকাতে পারে না। আটকালে সেটা হবে সম্পূর্ণ অনৈতিক। এতে বাংলাদেশ সহ অনেক দেশের জনগণের কাছে টিকা পৌঁছাতে অন্তত ৪ থেকে ৫ মাস দেরি হবে, যা শুধু দুঃখজনকই নয় রাষ্ট্রীয়, আঞ্চলিক এবং বিশ্ব জনস্বাস্থ্যের উপরও বড় ধরণের চপেটাঘাত। সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত অমানবিক, অনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার সাথে সাংঘর্ষিক।

ভারত সরকার কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল? নিজ দেশের সব জনগণের টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে?
-এটা ভারতীয় রাজনীতিবিদদের একটা ভুল সিদ্ধান্ত। নিজেদের নাগরিকদের কথা বিবেচনায় রেখেও যদি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলেও সেটা আত্মঘাতী। কেননা করোনা একটা বৈশ্বিক মহামারী। নিজে সুরক্ষিত থেকে যদি প্রতিবেশি অরক্ষিত থাকে তাহলে নিজেকেও আক্রান্ত হতে হবে। আর বিশ্বায়নের যুগে অন্যান্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাও সম্ভব নয়। ভারত চাইলে রাশিয়া বা অন্য দেশ থেকেও টিকা আমদানি করতে পারতো। এই সিদ্ধান্তের ফলে যে অনিশ্চয়তা নেমে আসলো তার দায় দায়িত্ব ভারতের বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে এবং সেটা ইতিহাসের পাতায় একটি কালো সিদ্ধান্ত হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আমার বিশ্বাস ভারতের অগুণিত চিন্তাশীল মানুষ টিকা রফতানি বন্ধের এই জনস্বাস্থ্য বিরোধী সিদ্ধান্তের জন্য উদ্বিগ্ন এবং লজ্জিত।

এখন বাংলাদেশের মানুষের জন্য দ্রুত টিকা নিশ্চিত করার উপায় কি?
-এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে, চীন বা রাশিয়ার মতো দেশ হয়তো এগিয়ে আসতে পারে।