Home / অন্যান্য / অপরাধ / চেয়ারম্যান লাশ পুড়িয়ে ফেলার হুমকি দিয়েছিল

চেয়ারম্যান লাশ পুড়িয়ে ফেলার হুমকি দিয়েছিল

কান্না জড়িত কণ্ঠে এভাবেই বলছিলেন এক বাবা বাবারে হাতে পায়ে ধরতে চাইছি তাও লাশটা চেয়ারম্যান গ্রামত(গ্রামে) নিবার দেয় নাই। । এই অভাগা বাবার নাম গোলাম মোস্তফা। মেয়ের লাশ তাকে দুই বার শনাক্ত করতে হয়েছে তিন দিনে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের সহযোগিতায় মেয়ের লাশ দাফন করতে পেরেছেন ।

লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী তাদের বাড়ি। দরিদ্র পরিবারটির মাথাগোজার ঠাঁই হয়েছে গুচ্ছ গ্রামে। মোস্তফার বড় মেয়ের নাম মৌসুমি আক্তার। বয়স আনুমানিক ২২।

মোস্তফা জানান, মৌসুমির বিয়ে হয় প্রায় ৬ মাস আগে। বাউড়া ইউনিয়নের সরকারের হাট এলাকার আবুল কালামের ছেলে মিজানুর রহমানের সঙ্গে। কিন্তু স্বামীর ঘরে থাকা হয়নি তার। স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে এক মাসের মাথায় চলে আসেন বাবার বাড়িতে। কিন্তু দরিদ্র বাবার বোঝা হতে চাননি তিনি। তাই জানুয়ারী মাসে এলাকার এক পরিচিত বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলে যান গাজীপুর। শুরু করেন পোশাক শ্রমিকের কাজ।

গাজীপুরে তার এক পরিচিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন, করোনার কারণে অনেক গার্মেন্টস বন্ধ হয়। সেসময় অনেক শ্রমিক বাড়ি ফিরলেও মৌসুমি ফেরেনি। ভয়টা তার স্বামীর বাড়ি ফিরতে যাতে না হয়। অনেকেই আজে বাজে কথা বলত মৌসুমিকে নিয়ে, কিন্তু ও কাউকেই পাত্তা দিত না। এরপর কিছুদিন পরেই খুলে যায় গার্মেন্টস। মাসিক বেতনও পেয়েছিল। সব ভালো ভাবেই চলছিল। তবে মঙ্গলবার (১৯শে মে) থেকে একটু জ্বর দেখা যায় মৌসুমির শরীরে। সেদিন হালকা জ্বর নিয়েই অফিস করে। বুধবার আর গার্মেন্টসে যায়নি। বৃহস্পতিবার (২১শে মে) রাতে সবজির ফিরতি ট্রাকে পাটগ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। প্রশ্নের জবাবে জানান, ট্রাকে ওঠার পর আর কোন কথা হয়নি তার সঙ্গে।

মৌসুমির বাবা মোস্তফা জানান, মেয়ে বাড়ি আসছে তাকে জানিয়েছেন। ভেবেছেন ঈদ করতেই বাড়িতে আসছে। তবে অসুস্থতার কথা বলেননি। ট্রাকে ওঠার পর কয়েকবার ফোন দিয়েও যোগাযোগ করতে পারেননি। পরদিন শুক্রবার সকালে ফোন আসে তাজহাট থানা থেকে। তখনই তিনি অটো রিকশা নিয়ে রংপুর পৌঁছান দুপুরে। শনাক্ত করেন মেয়ের লাশ। তাজহাট থানা থেকে জানা যায়, তারা শুক্রবার ভোরবেলা মডার্ন মোড়ে লাশ পড়ে আছে বলে জানতে পারি। এরপর গিয়ে সচেতনতার সঙ্গে লাশ মেডিকেলে নিয়ে যাই।

মর্গেই করোনার শনাক্তকরণের পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মর্গসূত্রে জানা যায়, শারীরিক কোন ক্ষতের চিহ্ন বা ধর্ষণের কোন লক্ষণ ছিল না শরীরে।

মৌসুমীর বাবা বলেন, লাশ নিয়ে বাড়িতে আসার কথা তিনি প্রতিবেশীদের মোবাইলে জানান। তারা চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। তিনি চেয়ারম্যান আবু সাইদ নেওয়াজ নিশাতকে ফোন দিলে গ্রামে লাশ ঢুকতে দেয়া হবে না বলে জানান। আরও হুমকি দেন লাশ পুড়িয়ে ফেলার। অনেক অনুরোধের পরেও চেয়ারম্যান রাজি হননি, বলেন মোস্তফা।

কিন্তু বিষয়টি অস্বীকার করেন চেয়ারম্যান আবু সাইদ নেওয়াজ নিশাদ। তিনি বলেন, ডিজিটাল যুগ। আমার সঙ্গে কথা হয়েছে কিনা তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমেই বের করা যাবে। আমি অপরাধী এটা যদি প্রমাণ হয় আমি নিজেই আত্মসমর্পণ করব।

মৌসুমির বাবা আরও বলেন, এরপর উপায়ন্তর না দেখে অনেক সময় মর্গের সামনে, মেডিকেলে হাঁটাহাঁটি করি। এক ব্যক্তি এসে তাকে লাশ দাফনের কথা বলেন। এজন্য চান ১০ হাজার টাকা। দরাদরির পর পাঁচ হাজার টাকা ঠিক হয়। এরপর মর্গ থেকে লাশ বুঝে নিয়ে তার হাতে তুলে দেন। তাকে চেনেন কিনা জানতে চাইলে বলেন, চেনেন না তবে অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার পরিচয় দেয়।

লাশ একটি অ্যাম্বুলেন্সের ভিতর নিয়ে হাসপাতাল পার হয়ে যায়। মেডিকেল মোড়ে বাবা মোস্তফাকে নামিয়ে দেয়। অ্যাম্বুলেন্সটি চলে যায় শহরের দিকে।

মেয়ে হারানোর শোক নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসেন মৌসুমীর বাবা। কিন্তু দুদিন পর রোববার ফের ফোন আসে থানা থেকে। এবারের ফোন লালমনিরহাট জেলার আদিতমারি থানা থেকে। ফের সেখানে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন তিনি। মেয়ের লাশ ৩ দিনে ২ বার শনাক্ত করতে হলো তাকে। তিস্তা নদীতে লাশটি পড়ে থাকতে দেখে খবর দেন স্থানীয় লোকজন। আদিতমারি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে লাশটি মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্দ্ধন গ্রামে তিস্তা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়।

সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকারি লাশের ব্যাগে মোবাইল নম্বর মেলে বাবার৷ বাবা লাশ শনাক্ত করেন এবং মর্মান্তিক ঘটনা বলেন। এরপর সেই বাবার অনুরোধে আদিতমারি ও পাটগ্রাম থানা পুলিশ যৌথভাবে থানা চত্তরে জানাজা পড়ান। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সদস্য, তার বাবা ও ভাই। ঈদের দিন সোমবারই জানাজা শেষে আদিতমারি কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়।

তিনি আরও বলেন, মৌসুমির লাশের করোনা শনাক্তকরণের নমুনা নেয়া হয়েছে তবে এখনো ফলাফল জানা যায়নি। আর চেয়ারম্যানের বিপক্ষে অভিযোগের সত্যতা এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: