জমজমাট ফুটপাত থেকে অভিজাত মার্কেট

10

অর্থনীতির চাকা করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকায় স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও সচল হয়েছে। এর মধ্যেই খুশির বারতা নিয়ে আসছে ঈদ। ফলে দুই বছর পর উৎসবকেন্দ্রিক বাণিজ্যের পালেও হাওয়া লেগেছে। এবার ঈদের বাজারে নেই কোনো কড়াকড়ি, বিধিনিষেধ কিংবা স্বাস্থ্যবিধি মানার চাপ। তাই দীর্ঘদিন পর ক্রেতারা ফিরে এসেছেন ঈদের কেনাকাটায়। ফুটপাতে হকারদের দোকানগুলো থেকে শুরু করে অভিজাত মার্কেটগুলোয় এখন প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে উপচেপড়া ভিড়। পণ্য কিনতে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে হন্যে হয়ে ঘুরছে মানুষ। সবার চাই ঈদের নতুন জামা-জুতা। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক পণ্য, আসবাব, টিভি-ফ্রিজের বিক্রিও অনেক বেড়েছে। দর্জির দোকানগুলোতেও বেড়েছে ব্যস্ততা।

ঈদের কেনাকাটায় ক্রেতাদের এই অভাবনীয় সাড়া হাসি ফুটিয়েছে করোনাকালে আর্থিক ক্ষতির মধ্যে থাকা ব্যবসায়ীদের। তারা বলছেন, ব্যবসায় দীর্ঘ খরা কাটিয়ে অবশেষে ঈদ-বাণিজ্যের পালে হাওয়া লেগেছে। এবার প্রথম রোজা থেকেই নগরবাসী মার্কেটমুখী হয়েছেন। পাইকারি বাজারে বিক্রি গত দুই বছরের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ব্যবসায়ীরা পেছনের লোকসান থাকা সত্ত্বেও এ বছর বৈশাখ ও ঈদের মৌসুম ঘিরে সবার শেষটুকু দিয়ে, ঋণ করে বিনিয়োগ করেছেন। ভয় ছিল ক্রেতারা ফেরেন কিনা। কিন্তু ব্যবসায়ীদের হতাশ হতে হয়নি। এ বছর প্রথম রোজা থেকেই বিক্রি বেড়েছে। এবার বৈশাখ ও রোজার ঈদকে ঘিরে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিলাম আমরা। বৈশাখের ব্যবসা ততটা ভালো হয়নি। কিন্তু রোজার ঈদ উপলক্ষে দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যবসা হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা রয়েছে। প্রতিদিনই বিক্রি বাড়ছে, ব্যবসায়ীরা খুশি। আমাদের প্রত্যাশার বেশি বাণিজ্য হবে বলে আশা করছি।

বিগত কয়েক দিনে গুলিস্তান, মালিবাগ, নিউমার্কেট, বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সসহ রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিনই ভিড় বাড়ছে। পোশাকের পাশাপাশি জুতা-স্যান্ডেল, পাঞ্জাবি, টুপি-তসবিহ, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, টিভি-ফ্রিজ, ফার্নিচারসামগ্রী, স্বর্ণ ও ইমিটেশন গহনা, হীরার রিং ও নাকফুলসহ নানা পণ্যসামগ্রীতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন ক্রেতারা। নিউমার্কেট এলাকার নিউ সুপার মার্কেটের টিএস ফ্যাশনের ব্যবসায়ী মো. সোহেল জানান, গত দুই বছরের তুলনায় এবার বিক্রি কয়েক গুণ বেড়েছে। মাঝে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের অনাকাক্সিক্ষত সংঘাতের ফলে এখানকার ব্যবসায়ীরা অনেকটা পিছিয়ে পড়েছেন। কিন্তু এবার ঈদের বাজার ভালো। মানুষ এবার মার্কেটমুখী হয়েছে। ভালো বিক্রি হচ্ছে।

গুলিস্তানের ঢাকা ট্রেড সেন্টারের কমফোর্ট জোনের পোশাকের পাইকারি ব্যবসায়ী মো. দুলাল হোসেন বলেন, এবার অনেক আগে থেকেই পাইকারি বাজারে পোশাকের বিক্রি শুরু হয়েছে। এবার ব্যবসা ভালো যাচ্ছে। পেছনের ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা যাবে। ইতোমধ্যে আমার প্রায় ৪০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি শেষ, এখনো অর্ডার আসছে। কিন্তু পণ্য ফুরিয়ে গেছে। সরবরাহ দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কেরানীগঞ্জেও ডেলিভারি চেয়ে পাচ্ছি না।

গুলিস্তানের ফুটপাতে ভিড় করছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা

গুলিস্তান মাজার মোড়ে ফুটপাত থেকে জামা কিনছিলেন মো. আনিস। তিনি বলেন, ক’দিন পরই গ্রামে যাব। তাই পরিবারের জন্য গেঞ্জি, প্যান্ট ও জামা কিনে নিচ্ছি। মার্কেটে বেশি দাম, তাই ফুটপাত ঘুরে দেখছি। দামে মিললেই কিনে নেব।

ফুলবাড়িয়ার ফুটপাত ব্যবসায়ী মো. মুন্না জানান, এবার কাঁচা বাদাম ও পুষ্পা থ্রি-পিস পাওয়া যাচ্ছে। এগুলোর চাহিদা বেশি। বিভিন্ন রঙের কাঁচা বাদাম ডিজাইনের থ্রি-পিস পাওয়া যাচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে এবং পুষ্পা ডিজাইনের থ্রি-পিসে খরচ পড়বে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা।

পোশাকের পাশাপাশি জুতার বাজারেও ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। নামিদামি ব্র্যান্ডের শোরুমসহ ফুটপাতের দোকানগুলোয় ভিড় বেড়েছে কয়েক গুণ। রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের হাই ম্যানশনের ‘ওয়ান স্টার সুজ’ দোকানের মো. কাওসার আহমেদ জানান, এবার বিধিনিষেধ না থাকায় মানুষ মার্কেটে আসছে। সু, কেডস, সিøপার, স্নিকার্সে আগ্রহ দেখাচ্ছে তরুণরা। প্রায় একই কথা জানালেন দামি ব্র্যান্ড এপেক্স ফুটওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরও। তিনি বলেন, এবার বাণিজ্যে সুদিন ফিরেছে। ঈদকে কেন্দ্র করে আমাদের প্রস্তুতি ও লক্ষ্যমাত্রা অনেক ছিল। দশ রোজা পর্যন্ত কম বিক্রি একটু ভাবিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বিক্রি ডবল ডিজিটে বাড়ছে। আমরা এতে সন্তুষ্ট।

এদিকে গরমের দিন হওয়ায় ফ্রিজ, এয়ারকুলারের বিক্রিও বেড়েছে। পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির টিভি, মোবাইল ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বিক্রিও বেড়েছে বলে জানা গেছে। ওয়ালটনের মিডিয়া উপদেষ্টা এনায়েত ফেরদৌস বলেন, দেশীয় পণ্য হিসেবে দেশের মানুষের মনে আস্থা অর্জন করেছে ওয়ালটন। আমরা প্রত্যেক উৎসবকে কেন্দ্র করে বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করি। প্রতিবারই আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়। এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি বিক্রির আশা করছি। প্রথম রোজা থেকেই ফ্রিজ, এসিসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স পণ্য বেশ ভালো বিক্রি হচ্ছে।

ঈদের বাজারে সেমাই, চিনি, দুধ, সুগন্ধি চালসহ বিভিন্ন ঈদসামগ্রীর বিক্রিও বেড়েছে। একই সঙ্গে মসলাজাতীয় পণ্যের বিক্রি কয়েক গুণ বেড়েছে বলে জানান কারওয়ানবাজারের ঢাকা স্টোরের ব্যবসায়ী মো. মুজাহিদ।