জানালেন রাজসাক্ষী শিনাকে হত্যা করেছিলেন ইন্দ্রাণী

2

shina_118714ঢাকা : জানালেন ঘটনার রাজসাক্ষী গাড়ি চালক শ্যামবর রাই শিনা বরোকে হত্যা করেছিলেন ইন্দ্রাণী, ।

তিনি বলেন, ‘ইন্দ্রাণী ম্যাডাম শিনার উপর চড়ে বসে ওর গলা টিপে ধরেছিলেন৷ আমাকে বলেছিলেন ওর মুখটা চেপে ধরে থাকতে৷ শিনা খুব জোরে আমার আঙুল কামড়ে দেয়।’

চার বছর আগে শিনা বোরা ঠিক কী ভাবে খুন হয়েছিলেন, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে এমনই বয়ান দিয়েছেন ইন্দ্রানীর গাড়ি চালক এবং মামলার রাজসাক্ষী শ্যামবর রাই৷

সম্প্রতি আদালত তাকে রাজসাক্ষী হওয়ার অনুমতি দেয়ার পর তিনি সিবিআইয়ের কাছে বয়ান দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশে তার কপি এ দিন অভিযুক্তদের আইনজীবীর হাতে তুলে দেয়া হয়েছে৷ তবে শিনা হত্যায় ইন্দ্রাণী, সঞ্জীব এবং নিজের ভূমিকার কথা স্পষ্ট করে বললেও পিটার মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে শ্যামবর কোনো অভিযোগ করেননি।

হিন্দিতে ১৪ পাতার ওই বয়ানে শ্যামবর জানিয়েছেন , ইন্দ্রাণী নিজের হাতেই শিনাকে শ্বাসরোধ করে খুন করেন৷ তার প্রাক্তন স্বামী সঞ্জীব খান্না এবং চালক শ্যামের ভূমিকা ছিল সহকারীর৷ তারা দুই জনে মিলে শিনাকে চেপে ধরে রেখেছিলেন৷ শ্যামের দায়িত্ব ছিল শিনার মুখ চেপে রাখা আর সঞ্জীব খান্না শিনার চুলের মুঠি ধরে এমন ভাবে পিছন দিকে টেনে রেখেছিলেন, যাতে তিনি নড়াচড়া করতে না পারেন৷ খুনটা হয়ে যাওয়ার পর নিজেদের মধ্যে কিছুক্ষণ ইংরেজিতে কথাবার্তা বলেন ইন্দ্রানী ও সঞ্জীব৷ যা শ্যাম বুঝতে পারেননি, তিনটে শব্দ ছাড়া- মিখাইল, রাহুল এবং ওরলি৷

পরের দিন শিনার মরদেহ ফেলা এবং পুরো ঘটনাকে আত্মহত্যার চেহারা দেয়ার চেষ্টায় প্রধান ভূমিকায় ছিলেন ইন্দ্রাণী। শ্যাম জানান, রাস্তার ধারে একটি নির্জন জায়গা দেখে ম্যাডাম গাড়ি থামাতে বলেন। তার পর সঞ্জীব আর ইন্দ্রাণী মিলে ধরাধরি করে গাড়ি থেকে শিনার মৃতদেহ নামিয়ে তা রাস্তার পাশে নিচু জায়গায় ফেলে দেন৷ ইন্দ্রাণী সেই দেহটির উপর শাড়ি এবং গ্লাভস ছুড়ে দেন৷ সঞ্জীবকে বলেন পেট্রল ঢালতে আর আগুন ধরিয়ে দেন নিজেই৷

শ্যামবরের বয়ান থেকে স্পষ্ট , এই খুনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল অনেকদিন ধরে৷ ২০১২ সালের মার্চ মাসে প্রথম খুনের পরিকল্পনার কথা শ্যামকে জানান ইন্দ্রাণী৷ সে সময় ইন্দ্রাণী ছিলেন দিল্লিতে৷ তার সহকারী কাজল শ্যামকে বলেন একটি স্কাইপ অ্যাকাউন্ট খুলতে৷ কারণ, ইন্দ্রাণী তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান৷ স্কাইপে ইন্দ্রাণী বলেন,’তুমি আমার বিশ্বস্ত লোক৷ তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে৷ যা তুমি কাউকে বলবে না৷’

তারপরেই ইন্দ্রানী জানান , মিখাইল এবং শিনা তাকে নিজের মা পরিচয় দিয়ে অসুবিধায় ফেলছে৷ তাই তাদের রাস্তা থেকে সরাতে চান তিনি৷ শ্যামের বয়ান অনুযায়ী ইন্দ্রাণী তাকে বলেছিলেন, ‘রাহুলের সঙ্গে শিনার একটা সম্পর্ক আছে৷ আমি ওকে মারব৷ তুমি ভয় পেও না৷ তোমার কাজ হবে শুধু গাড়ি চালানো৷ কলকাতা থেকে এক জন আসবেন৷ আসল কাজটা তিনিই করবেন৷’

এর বদলে শ্যামেন সন্তানদের পড়াশোনার খরচ এবং তার পরিবারের সবার চিকিৎসার ভার বহনের প্রতিশ্রুতি দেন ইন্দ্রাণী৷

শ্যাম রাজি হওয়ার পর ইন্দ্রাণী মুম্বাইয়ে আসেন৷ মিখাইলকে মুম্বাইয়ে আসতে বলা হয়। একটি প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ কেনার জন্য তাকে ব্যবহার করেন ইন্দ্রাণী৷ যদিও মিখাইল তখন আসতে রাজি হননি৷ শ্যামের গাড়িতে করেই খুনের দুই তিন দিন আগে মুম্বাই থেকে লোনাভালা, খান্ডালা ও খোপলির রাস্তায় বার বার যাতায়াত করে শেষ পর্যন্ত লোনাভালা-খোপলি সড়কের একটি জায়গা হত্যার জন্য পছন্দ করেন ইন্দ্রাণী৷

খুন এবং মৃতদেহ পাচার হয়ে যাওয়ার পর অবশ্য শ্যামকে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলেছিলেন তিনি৷ ইন্দ্রাণীর সহকারী কাজল, একটি পার্সেল ধরিয়ে দিয়ে এবং তিন মাসের অগ্রিম বেতন নিয়ে শ্যামকে চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে যেতে বলেন। সেই সঙ্গে ইন্দ্রাণী হুমকি দেন, ‘যা হয়েছে, তা নিয়ে মুখ খুলবে না৷ কাউকে কিছু বললে কিন্তু তোমার জন্য ফলটা আদৌ ভালো হবে না৷’

বাড়ি ফিরে পার্সেল খুলে শ্যাম দেখেন, তার মধ্যে রয়েছে একটি দেশি পিস্তল৷ যা দেখে তিনি খুব ভয় পেয়ে যান৷ পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিতে গিয়ে শিনা বোরা হত্যার কথা বলেন তিনি৷ একে একে ধরা পড়েন ইন্দ্রানী, সঞ্জীব ও পিটার৷ এরা সকলেই এখন জেলে৷ গত মাসে শ্যামবরের রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন মঞ্জুর করে আদালত৷ কিন্তু তিনি সিবিআইয়ের কাছে রাজসাক্ষী হিসেবে যে বয়ান দিয়েছিলেন, প্রথমে তা প্রকাশ করতে রাজি হননি গোয়েন্দারা৷ শেষ পর্যন্ত সঞ্জীব খান্নার আইনজীবী শ্রেয়াংশ মিঠারের আবেদনের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার বম্বে হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়, বয়ানের প্রতিলিপি সব অভিযুক্তের হাতে তুলে দিতে হবে৷