ট্রায়াঙ্গুলার রাজনীতি চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র : করোনা মহামারি

57

ভারত করোনা সঙ্কটের মুখে এ মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি টিকা তৈরির কাঁচামাল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল । কিন্তু এমন অনুরোধের প্রেক্ষিতে দৃশ্যত খুঁড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করে ওয়াশিংটন। অজুহাত হিসেবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মানুষকে আগে টিকা দেয়ার প্রয়োজনিয়তার কথা তোলে। যুক্তরাষ্ট্রের এই জঘন্য প্রতিক্রিয়ায় (টেপিড রেসপন্স) ভারতের বহু মানুষ হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কারণ, এ দেশটি এখন বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহতার মোকাবিলা করছেন। প্রতিদিনই করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের নতুন নতুন রেকর্ড গড়ছে। হাসপাতাল এবং শ্মশান বা কবরস্তান উপচে পড়ছে। চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে রোগী মারা যাচ্ছেন।

এই যখন পরিস্থিতি তখন যুক্তরাষ্ট্রের এমন অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা হয়। বিশেষ করে তাদেরকে ধুয়ে দেয় চীনের মিডিয়া। এ ছাড়া দেশের ভিতরেও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুততার সঙ্গে তার অবস্থান পরিবর্তন করে। প্রতিশ্রুতি দেয় ভারতকে সহায়তা দেয়ার। এ নিয়ে ভারতের বাইরে খুব জোরালো এবং কর্কশ সমালোচনা হয় চীনে। এক সপ্তাহ ধরে চীনের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া ওয়াশিংটনকে সমালোচনায় ধুয়ে দিয়ে বিপুল পরিমাণ লেখা প্রকাশ করে। তাতে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র যে ‘পুরোপুরি স্বার্থপর’ তা ফুটিয়ে তুলেছে। একই সঙ্গে এসব লেখায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে, বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যখন তীব্র আকার ধারণ করেছে করোনা মহামারি তখন টিকা সরবরাহের বৈশ্বিক প্রচেষ্টায় তারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। এ খবর দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অনলাইন সিএনএন।
নেকটার জান এবং জেসি ইয়াংয়ের লেখা প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, নিজের দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনার পর থেকেই এই মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বৈশ্বিক নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে বেইজিং। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যখন যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম নীতিতে অটল ছিলেন, তখন এর বিপরীতে গিয়ে অন্য দেশকে সহায়তা করতে উদগ্রীব ছিল চীন। এরই মধ্যে ভারতে করোনা মহামারি দ্রুততার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ সময়ে চীনা নেতারা বার বার ভারতকে সহায়তার ইচ্ছা প্রকাশ করতে থাকেন। তারা প্রতিশ্রুতি দেন যে, ‘যদি সুনির্দিষ্ট চাহিদার বিষয়ে ভারত আমাদের কাছে তথ্য জানায়, তাহলে আমরা সর্বোত্তম সক্ষমতা দিয়ে তাদেরকে সাপোর্ট ও সহায়তা দিতে প্রস্তুত’।

তবে এখন পর্যন্ত বেইজিংয়ের এই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি নয়া দিল্লি। কেন? যখন লাশ রাখার জায়গা নেই, হাসপাতাল উপচে রাস্তায় পড়ে আছেন করোনা রোগী, সারাদেশে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা তখন কেন বেইজিংয়ের প্রস্তাবে সাড়া দিচ্ছে না দিল্লি? এশিয়ার শক্তিধর এই দুটি দেশের মধ্যে মাঝে মাঝেই যে পারস্পরিক অনাস্থা দেখা দেয় তা এবং সেই অবস্থার আরো গভীরতার সঙ্গে এ অবস্থা সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভারতের এই চাপা ভাব আরো উল্লেখযোগ্যভাবে বিবেচ্য। কারণ, ২০১৯ সালের শেষের দিকে প্রথম দিকে যখন চীনের উহান শহরে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় তখন সেখানে প্রথম যেসব দেশ চিকিৎসা সামগ্রী পাঠিয়েছিল তার মধ্যে ভারত অন্যতম। কিন্তু তারপর থেকে ভারত ও চীনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দ্রুতগতিতে মারাত্মক অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে হিমালয়ের পাদদেশে পাহাড়ি এলাকায় সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ভয়াবহ উত্তেজনা। ৪০ বছরের মধ্যে গত বছর জুনে ভারত ও চীনের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয় ওই সীমান্তে। এতে ভারতের কমপক্ষে ২০ জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে হাতাহাতিতে ওই সময় চীনের চারজন সেনা নিহত হয়েছেন বলে পরে জানায় চীন।
এই ফাঁকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে তুলেছে নয়া দিল্লি। এ অঞ্চলে চীন যখন ক্রমবর্ধমান হারে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে এবং তার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা রয়েছে তখন তাকে কাউন্টার দেয়ার জন্য ভারতকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন। এর ফলে কোয়াডের প্রতি দ্বিগুণ বেগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় ভারত। এই কোয়াড হলো যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং ভারত- এই চারটি দেশের একটি আনুষ্ঠানিক জোট। এর ফলে ভারত ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে এবং ভারত যখন করোনা ভাইরাস সংক্রমণে ভয়াবহতার মুখে তখন এই মিত্রের প্রতি ওয়াশিংটনের সহায়তায় ব্যর্থতার জন্য চীনের রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় তুখোড় সমালোচনার বাণ ছোটে। একটি পত্রিকা তো যুক্তরাষ্ট্রকে অনির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করে। এতে বলা হয়, ভারতকে এক্ষেত্রে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা ব্যবহার করা টিস্যু পেপারের মতো ফেলে দিয়েছে ভারতকে।

ভারতের অনেকে এই বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত হয়ে থাকতে পারেন। তা সত্ত্বেও বহু মানুষ গত বছরের অভিজ্ঞতার পর এটা মানতে পারেন না। তারা মনে করেন, এক্ষেত্রে নিজেদের উত্তম স্বার্থই বেইজিংয়ের হৃদয়পটে। এমনও ধারণা আছে যে, এই সঙ্কটের সময়ে চীন সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে, যাতে নয়া দিল্লি এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরানো যায়।
দেশের ভিতরে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রোববার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কোভিড-১০ এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জরুরি সহায়তা এবং রিসোর্স দিয়ে পূর্ণাঙ্গ সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি এক ফোনকলে এ কথা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে।
পক্ষান্তরে চীন কিন্তু কোনো ফোনকল পায়নি এখনও। তা সত্ত্বেও মঙ্গলবার বেইজিং বলেছে, তারা বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোকে জরুরি সহায়তায় সরবরাহ ‘রিজার্ভ’ প্রতিষ্ঠা করবে। এ নিয়ে অনলাইন মিটিংয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ভারতকে। কিন্তু চীনের রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার মতে, এতে যোগ দেয়নি ভারত। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, আশা করা যায় আমাদের এই মিটিং করোনা মহামারির বিরুদ্ধে ভারতকেও সহায়তা করতে পারে।