কি চর্চা করছি? সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেনো ভালো হয়ে চলি। কবিতার এই লাইনগুলো আমরা যারা বড় হয়েছি তারা বোধকরি সকলেই পড়েছি। কিন্তু ডিজিটাল এই সময়ে আমরা কি পড়ছি?  সাহিত্য চর্চা করেন, টকশোতে কথা বলেন এমন এক বাবাকে আক্ষেপ করে বলতে শুনেছি, বাড়িতে ফিরি ঠিকই কিন্তু কারও সঙ্গে কথা হয় না। কেন? এমন প্রশ্নে আটকে গেলেন তিনি। স্ত্রী আর কন্যা দুজন দুই কামড়ায় স্মার্টফোনে ব্যস্ত। খাবার টেবিল ফাঁকা। অথচ এক সময় কি হতো, বাবা বাসায় ফিরলে সন্তান দৌড়ে আসত, জড়িয়ে ধরত। সবাই মিলে টেবিলে খেতে বসে নানান গল্প হতো।

আর এখন হাজারো সামাজিক মাধ্যম। কে কোন মাধ্যমে মজেছে তার হদিস বোধকরি কেউ জানতে পারছে না। অথছ এই সেদিনও ছিল পারিবারিক বন্ধনের অন্যরকম মেলা। সময় যাচ্ছে পারিবারিক বন্ধন বলে কিছুই বোধকরি আর থাকছে না। সকলের খবর নিতে সামাজিক মাধ্যমে রিঅ্যাক্ট দিয়ে দায় সারছি এখন সকলে। আর চিঠিপত্র লেখাতো বোধকরি সকলে ভুলেই গেছি।

মধ্যবিত্ত আরেক পরিবারের কথা বলি। তিনজনের পরিবার। মা, এক ছেলে, এক মেয়ে। তিনজনেরই বেশিরভাগ সময় কাটে ডিজিটাল ডিভাইসে। বলা যায়, ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে খেলা করে। ছেলেটি ছোট বলে গেমস নিয়ে ব্যস্ত। তাও সে পাবজির খোঁজ রাখছে। কিন্তু অবারিত স্ক্রলে তার লক্ষ্য যে আরও বদলাবে না এই নিশ্চয়তা কি সেই পরিবার দিতে পারবে? আর মেয়েটি রাতভর চ্যাটিং আর ইউটিউব নিয়ে জেরবার। তার দিনের আলো বাতাস কেড়ে নিয়েছে রাতের ফেলে রাখা ঘুম। মায়ের চেঁচামেচির গুরুত্ব কতখানি? বলাবলি আছে, কি করবে? করোনায় বন্দি জীবনের আশ্রয় তাই ডিভাইসে। যেখানে রয়েছে খোলামেলা আদর্শিত মত পথের সঙ্গেই অনেক, অনেক অন্ধ চোরাগলি।

কথাগুলো মনে আসছে সাম্পতিক সময়ে ধানমন্ডিতে ঘটে যাওয়া একটি ধর্ষণ ও  মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে। পুরো সপ্তাহ জুড়ে এ বিষয়টিই ছিল মূখ্য আলোচনা। দুটি ইংরেজি মাধ্যমে পড়–য়া শিক্ষার্থীর মধ্যে ঘটনাক্রম এবং তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বোধকরি আমাদের সামাজিক বন্ধনগুলো নিয়ে ফের ভাবিয়ে তুলেছে। চলছে কি হলে কি হতো বা কি হতো না তার ইতিউতি বিশ্লেষণ।

সাংবাদিক সুপন রায় তার পেজে লিখেছেন, সময় হয়েছে, ইংরেজি, বাংলা সব মাধ্যমে পড়া প্রতিটি সন্তান, প্রতিটি শিক্ষার্থীর পিতা-মাতাকে সচেতন হবার। এটিকে ওয়েকআপ কল হিসেবে নিন।

লজ্জার আবরণ ঝেড়ে ফেলে খোলামেলা আলাপ করুন সেক্স নিয়ে। কী করা উচিত, কী উচিত না বুঝিয়ে বলুন। সীমারেখা টেনে দিন। জোর জবরদস্তি করে নয়। বুঝিয়ে।

গ্রুপস্টাডির নামে কী হচ্ছে? কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে? বন্ধু বা সহপাঠী কারা, দয়া করে খোঁজ নিন। আর নিজেরাও একটু স্মার্ট ফোন, গেজেট ব্যবহার ইত্যাদি শিখুন। তাহলে সহজেই বুঝতে পারবেন কী হচ্ছে না হচ্ছে।
মেয়েটিকে হারিয়ে বাবা-মা পাগল হয়ে গেছেন। আমার কিছু হয়নি বলে চুপ করে থাকবেন না। নীরব সান্তনা খুঁজবেন না। চুপ করে থাকলে, চোখ কান খোলা না রাখলে, আপনাদেরও একদিন এমন করেই কাঁদতে হতে পারে।
অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেন নাজনীন আহমেদ তার প্রতিক্রিয়ার এক অংশে লিখেছেন, মেয়ে কোথায় যাচ্ছে না যাচ্ছে সেটা দেখা জরুরি, তা ঠিক। কিন্তু তারচেয়েও জরুরি হলো ঘরের মধ্যে পশু তৈরি হচ্ছে কিনা সেটা দেখা। একটা মেয়েকে একা পেলে তার সাথে পশুর মত আচরণ করতে হবে, এই শিক্ষা কোথা থেকে আসলো? আমি তো মনে করি এই ছেলের বাবা-মায়ের মুখোশ উন্মোচিত হওয়া উচিত কি করে ছেলে পশু হল?

এ সকল দুষ্কর্মে বারবার মনে হয়, হাতে থাকা উন্মুক্ত সমাজের ড্রাইভ হুইল অথবা অধিকতর ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় মুঠো বন্দি ডিভাইসটিই দায়ী কিনা? নাকি শৈশব থেকেই নীতি শিক্ষায় আমরা গড়ে তুলতে পারছি না সন্তানদের।

ডিজিটাল ডিভাইস উন্মুক্ত না গোপনীয়তার ব্রাকেটে বন্দি থাকবে এমন বিতর্কও আছে। কোন পথে হাঁটলে বর্তমান সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। প্রশ্নটা অনেকদিন থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। আমাদের ডিজিটাল উন্মাদনা নিয়ে। বলাবলি আছে, আমরা এগিয়েছি, কিন্তু কতোটা? তথ্য প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের ফলে আলোর বিপরীতে অন্ধকার দেখছি? কোন পথে হাঁটছে আমাদের যুবসমাজ? এর সমাধান তাহলে কি?

ইন্টারনেটের অবাধ প্রবাহের একেবারে শুরুর দিকে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গবেষণা করেছিল, কি করলে অ্যাডাল্ট কনটেন্ট থেকে তরুণ সমাজ থেকে দূরে রাখা যায়? বহু গবেষণার পর এক গবেষক এর একটি সহজ সমাধান বাতলে দিয়েছেন। তা হলো: তোমার বাড়িতে থাকা ডেস্কটপটি উন্মুক্ত স্থানে বসাও। সেক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করবে। হয়েছিলও তাই। কিন্তু হাতের মুঠোয় বন্দি স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে যে সংক্রমণ তা রোধ করবেন কিভাবে? এতো কম্বলের নিচেই জায়গা করে নিয়েছে। আর এমন মাতাল হওয়া থেকে সন্তানদের বাঁচাতে পথ বের করাও এখন সময়ের দাবি বোধকরি।

Share Now
September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930