দীর্ঘসময় মনে রাখতে চান পড়ার কোনো টপিক? তাহলে অমনোযোগী হোন!

161

এটা আমার কথা নয়, সায়েন্সের কথা। শিরোনাম পড়ে অবাক হচ্ছেন? অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই।নিউ ইয়র্ক টাইমস এর মেডিকেল ও সায়েন্স বিষয়ক রিপোর্টার এবং সাংবাদিক বেনেডিক্ট ক্যারি তার বহুল আলোচিত ‘হাউ উই লার্ন’ বইয়ে এই অদ্ভুৎ কথাটি বলেছেন। তিনি বলেন, কোনো পড়ার বিষয় দীর্ঘসময় মনে রাখতে চাইলে পড়ার মাঝে কিছুটা অমনোযোগী হওয়া ভালো। এতে পড়ার বিষয়টি মস্তিষ্কের স্থায়ী মেমোরিতে গেঁথে যায়। বেনেডিক্ট ক্যারি এর জন্য জেইগার্নিক ইফেক্ট (zeigarnik effect) এর উদাহরণ টানেন। প্রিয় পাঠক, আসুন তার আগে জেনে নিই, এই জেইগার্নিক ইফেক্টটি কী এবং এর উৎপত্তি কীভাবে হয়েছে?

জেইগার্নিক ইফেক্ট এর আবিষ্কারক হলেন ব্লুমো জেইগার্নিক, লিথুনিয়ায় জন্মগ্রহণকারী একজন মনোবিজ্ঞানী। তিনিই সর্বপ্রথম ১৯২০ সালে তাঁর ডক্টরেট থিসিসে এই জেইগার্নিক ইফেক্ট এর ব্যাখ্যা দেন। ব্লুমো এই বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা পান যখন তিনি একটি রেস্টুরেন্টে দেখেন যে, একজন ওয়েটার যে টেবিলের বিল পরিশোধ হয়ে গেছে তার থেকে যে টেবিলে বিল পরিশোধ হয় নাই তার অর্ডারের কথা বেশি মনে রাখতে পারছেন। তিনি খেয়াল করেন যে, বিল পরিশোধ হওয়া টেবিলের অর্ডারের কথা তার স্মরণে একেবারেই থাকছে না। কিন্তু যে টেবিলের বিল এখনও দেওয়া হয়নি তার অর্ডারের কথা পুরোপুরি স্মরণে থাকছে। আবার যখনই ঐ টেবিলের বিল পরিশোধ হয়ে যাচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যে সে টেবিলের অর্ডারের কথাও তিনি ভুলে যাচ্ছেন। অর্থাৎ ওয়েটারটি শেষ হয়ে যাওয়া কাজের চেয়ে অসমাপ্ত কাজগুলো বেশি মনে রাখতে পারছে। এর কারণ হিসেবে ব্লুমো তার থিসিসে ব্যাখ্যা করেন যে, আমাদের অবচেতন মন সবসময় খেয়াল রাখে যে কোন কাজটা শেষ হয়ে গেছে আর কোন কাজটা এখনও শেষ হয় নাই। অবচেতন মন শেষ হয়ে যাওয়া কাজগুলোকে মুছে ফেলে নতুন কাজগুলোকে সংযুক্ত করতে থাকে।

এই বিষয়টিকে যদি আমরা আমাদের পড়াশোনার পদ্ধতির সাথে মেলাই তাহলে দেখা যায় যে, আমরা এমন অনেকেই আছি যারা কোনো পরীক্ষার জন্য খুব করে মনোযোগ দিয়ে পড়ছি, সেটা পরীক্ষা হল পর্যন্ত হয়ত কিছুটা মনে রাখতে পারছি কিন্তু পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথে তা আমাদের মস্তিষ্ক থেকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পরীক্ষার দুদিন পরে সেই পড়াগুলোকে আর কোনোভাবেই মনে করতে পারছি না।

পড়ার মাঝে একটা ছোট্ট ঘুম পড়ার বিষয়টিকে মনে রাখতে সহায়তা করে। 

বেনেডিক্ট ক্যারি এই অবস্থার সাথে জেইগার্নিক ইফেক্ট এর মিল রেখে একটা সমাধান বের করেন। তাঁর মতে, আমরা যদি পড়াগুলোকে কিছুটা অমনোযোগের সাথে পড়তাম তাহলে সেগুলো দীর্ঘসময় মনে রাখতে পারতাম। কীভাবে? এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, আমরা যখন কোনো বিষয়ে পড়ি এবং এর মাঝে কিছুটা অমনোযোগী হয়ে একটু ঘুমিয়ে বিশ্রাম নিই বা হাঁটাহাঁটি করি তখন আমাদের পড়ার কাজটি অসমাপ্ত থেকে যায় আর এ সময়ে জেইগার্নিক ইফেক্ট কাজ করাও শুরু করে। এতে করে আমাদের অবচেতন মন শেষ হয়ে যাওয়া কাজগুলো মস্তিষ্ক থেকে মুছে ফেলে নতুন কাজের জন্য জায়গা তৈরি করতে থাকে। এরপর আমরা যখন আবারও পড়ায় মনোযোগ দিই তখন পড়াটি আমাদের মস্তিষ্কের ফাঁকা অংশে জায়গা করে নেয় এবং তা দীর্ঘসময় পর্যন্ত মনে রাখতে সহায়তা করে। আর এই জেইগার্নিক ইফেক্ট এর জন্য সবচেয়ে উপকারী হলো ১৫-২০ মিনিটের একটা ছোট্ট ঘুম।