Home / চট্টগ্রাম / দুই কোটি টাকার ব্যর্থ সমুদ্রযাত্রা ৩৯৬ রোহিঙ্গার

দুই কোটি টাকার ব্যর্থ সমুদ্রযাত্রা ৩৯৬ রোহিঙ্গার

বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী দুই মাস ধরে সমুদ্রে ভাসমান থাকা চারশ রোহিঙ্গা, মিয়ানমারে অবস্থানরত ‘মগ দালালদের মাধ্যমে’ মালয়েশিয়া যেতে চেয়েছিল। অনুসন্ধানে এটা অনুমেয় যে, টাকার অঙ্কে এটা ছিল ষোলো কোটি ৩১ লাখ ৫৯ হাজার ২০০ টাকার একটি সমুদ্র যাত্রা। এরমধ্যে প্রত্যাগত রোহিঙ্গারা প্রায় দুকোটি টাকা বাংলাদেশের জলসীমা ছাড়ার আগেই দালালদের হাতে তুলে দিয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। অনেকেই মনে করেন, এই টাকার ভাগ কে বা কারা পেয়েছেন, আদৌ পেয়েছেন কিনা, সেটা খতিয়ে দেখা দরকার।   

অনুসন্ধানে আরো দেখা যায়, করোনার কারণে ওই চারশ জন সেদেশে ঢুকতে না পারলেও তাদের অল্প আগে যাওয়া একটি গ্রুপ ঢুকতে পেরেছে।  গত ৫ এপ্রিল আরো ২০২ জন রোহিঙ্গা মালয়েশিয় উপকূলে পৌছাতে সক্ষম হয়। তাদের সবাইকে আটক করা হয়েছে। এবং মালয়েশিয় কর্তৃপক্ষের আশংকা আরো অন্তত দুটি বা তিনটি রোহিঙ্গা বোঝাই জাহাজ মালয়েশিয়ার অভিমুখে আসছে। দেশটির খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘আটক রোহিঙ্গারাই একথা বলেছিলেন।’’ আর সেটা যে সত্য ছিল, তা চারশ জনের ফিরে আসায় প্রমাণিত।     

গত ১০ এপ্রিল মালয়শিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী দাতুক সেরি হামজা জইনউদ্দিন এক সাংবাদিক সম্মেলনে তথ্য দেন যে, ওই ২০২ জন রোহিঙ্গা এবং ধরা পড়া সিন্ডিকেট সদস্যদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তারা বাংলাদেশের কক্সবাজারে দালালদের মাথাপিছু ২০০০ মালয়েশিয় রিঙ্গিতের (বাংলাদেশী ৩৮,৭০০ টাকা) সমপরিমাণ অর্থ অগ্রিম শোধ করেছে। মালয়েশিয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এই অর্থ কক্সবাজারে দালালদের পরিশোধ করা হয়েছে।  আর শর্ত ছিল, তারা মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যুক্ত করিয়ে দিতে পারলে মাথাপিছু আরো ১৫ হাজার রিঙ্গিত বা দুই লাখ ৯০ হাজার ২৫০ টাকা শোধ করবে।

এই তথ্যের ভিত্তিতেই ফিরে আসা ৩৯৬ জনের তরফে কত টাকার লেনদেন হতে পারে তা অনুমান করা হয়েছে।   

মালয়েশিয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছিলেন, তারা উপকূলে নৌ টহল জোরালো করেছে। কারণ তারা জানেন আরো এরকম আরো রোহিঙ্গা বোঝাই শিপ মালয়েশিয়ায় ভেড়ার চেষ্টা করবে।

উল্লেখ্য, এবারের মিশনে যাওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে কমপক্ষে ২০ জনের মুত্যু ঘটেছে। করোনার কারণে মালয়েশিয় দালালরা তাদেরকে দেশটিতে ওই হতভাগ্য রোহিঙ্গাদের ঢোকাতে ব্যর্থ হয়। তবে ওয়াকিবহাল সূত্রগুলো বলছে, একটি ত্রিদেশীয় সিন্ডেকেটের আতাত ছাড়া এই মানব পাচার হতে পারে না।

এরমধ্যে একটি কাকতালীয় বা সুপরিকল্পিত ঘটনা ঘটে গেছে। ওই ৩৯৬ রোহিঙ্গার বাংলাদেশের উপকূলে পৌছানোর ঠিক ২৪ ঘন্টা আগে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের সঙ্গে তার সীমান্তের সবকটি বৈধ গেট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।

বর্মী প্রেসিডেন্ট অফিসের মুখপাত্র ইউ জাও হয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় পরামর্শদাতা অং সান সু চি ও ইউ কিয়াও টিন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী মিয়ানমারে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মনজুরুল করিম খান চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলেন। গত ১২ এপ্রিল বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূতকে গেট বন্ধের বিষয়টি অবহিত করেন ।

মুখপাত্র ইউ কিয়াও টিন বলেন, মিয়ানমার প্রতিবেশী চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও লাওসের সঙ্গে সীমান্তের ফটক থেকে মানুষের বের হয়ে আসা ও প্রবেশের প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে তারা। কেবল পণ্য পরিবহনের জন্য গেট খোলা থাকে । তিনি আরো বলেন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে পণ্য চলাচলা অব্যাহত থাকবে । মিয়ানমারে এপর্যন্ত করোনায় ৪ জনের মুত্যু এবং প্রায় ১শ আক্রান্ত হয়েছে।

তবে ঢাকায় পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করেন যে, এ ঘটনা প্রমাণ করল যে, মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী নাসাকা বাহিনী মানব পাচার ছাড়াও বাংলাদেশে মাদক পাচারে সক্রিয় থাকতে পারে। আরো একটি বিষয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করল। আর সেটা হলো বাংলাদেশী দালাল এবং অন্যান্য প্রভাবশালী কুশলীবরা সক্রিয় না থাকলে  মানব পাচারের এই উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হতো না।

গত বুধবার সাড়ে নয়টায় টেকনাফ উপজেলার বাহাছড়া ইউনিয়নের জাহাজপুরা নামক সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা দিয়ে মালয়েশিয়া ফেরত উদ্বাস্তুদের উদ্ধার করা হয়। রাতের অন্ধকারে ট্রলার থেকে উপকূলে নেমে কোমর সমান পানি ডিঙ্গিয়ে নারী–শিশুদের তীরে উঠতে হয়েছে।

 বিবিসির দক্ষিন এশিয় সংবাদদদাতা জোনাথন হেড বলেছেন, ২০ জনের বেশি রোহিঙ্গা মারা গেছে। বৃহস্পতিবার রয়টার্স বলেছে, ২৪ জনের বেশি মারা গেছেন।  বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার পর প্রায় ৪শ অভুক্ত মানুষকে নিয়ে বুধবার উদ্ধার করা হয়েছে একটি জাহাজ। এটা লক্ষণীয় এবং বিরাট প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যে, ৪০০ জনের মধ্যে মাত্র ১৫০ জন পুরুষ। বাকিরা নারী ও শিশু।  

এর আগে মালয়েশিয়ায় আটক হওয়া ২০২ রোহিঙ্গার মধ্যে ১৫২ পুরুষ, ৪৫ নারী, চার বালক ও এক কিশোরী ছিল। মালয়েশিয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বলেছেন, অন্তরীণ নারীরা বলেছেন, তারা তাদের স্বামীর সঙ্গে পুনর্মিলনের জন্য সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন। তাদের স্বামীরা বহু বছর ধরে মালয়েশিয়ায় আছেন। অন্যরা বলেছেন, মালয়েশিয়ায় তাদের পরিবার ৭ থেকে ৮ বছর ধরে আছে। তাদের সঙ্গে বসবাস করার তীব্র আকাঙ্খাই তাদেরকে এই দু:সাহসী অভিযাত্রায় অবতীর্ণ করতে বাধ্য করেছে।      

 তারা দুই মাস ধরে সমুদ্রে ভাসমান ছিল। করোনার কারণে মালয়েশিয়া তাদের ঢুকতে দেয়নি। আজ ১৬ এপ্রিল টেকনাফে কর্মকর্তরা বলেছেন, ৩৯৬ জন রোহিঙ্গা নারী–পুরুষকে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নারী ১৮২, পুরুষ ১৫০ ও শিশু ৬৪।

কোস্ট গার্ডের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “তারা প্রায় দুই মাস ধরে সমুদ্রে ছিলেন এবং অনাহারে ছিলেন । ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ৩৮২ জনকে প্রতিবেশী মায়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য  চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ‘ নেওয়া হয়েছে। ওই রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে যাত্রা করেছিল। ১৬ এপ্রিল বিবিসির খবরে বলা হয়,  এরমধ্যে নৌকাটির সাথে যাদের যোগাযোগ হয়েছিল, তারা বলছেন নৌকাটি গত মাসে মালয়েশিয়ার উপকূলে ভেড়ার উদ্দেশ্যে দু’বার আন্দামান সাগর পারাপার করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: