দুদকের ১২ সুপারিশ বাস্তবায়নের খবর নেই তিতাসে দুর্নীতনীতির ২২ উৎস

12

তিতাস ঘুষ বাণিজ্য, দুর্নীতিসহ নানা অনিয়মের কারণে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে । সেবাধর্মী এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ অনেক পুরনো। যা গত বছরের (২০১৯) দুদকের অনুসন্ধানে আরো স্পষ্টতই ধরা পড়ে। সে সময় দুর্নীতি দমন কমিশন তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির ২২টি উৎস চিহ্নিত করে। এর প্রেক্ষিতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ১২ দফা সুপারিশ সংবলিত একটি প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে উপস্থাপন করে দুদক। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার একটি সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি। দেখা যায়নি, জোরালো কোনো পদক্ষেপও।

সূত্র জানায়, তিতাস গ্যাসে ভয়াবহ দুর্নীতি হয় শুধুমাত্র গ্যাসের অবৈধ সংযোগ দেয়ার মাধ্যমে। এটি যেন তিতাসের অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যক অবৈধ সংযোগ রয়েছে। এতে তীব্র গ্যাস সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। আর ঘুষের বিনিময়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়া তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাতারাতি ধনী হয়ে যাচ্ছেন। অবৈধ সংযোগ ছাড়াও মিটার টেম্পারিং, সিস্টেম লস দেখিয়ে গ্যাস চুরি এবং বাণিজ্যিক গ্রাহককে শিল্প শ্রেণি হিসেবে সংযোগ দেয়ার মতো ঘটনার চাক্ষুষ প্রমাণ রয়েছে। এ ছাড়া গ্রাহকদের প্রকৃত বিল গোপন করা, সংযোগ নীতিমালা অনুসরণ না করার মতো বিষয়গুলো তো আছেই।

অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে তিতাসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আবাসিক গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস সরবরাহের পরিবর্তে শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়। টাকার অঙ্কের সঙ্গে মিল রেখে শিল্প-কারখানায় গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো কিংবা কমানো হয়। অন্যদিকে আবাসিকে গ্যাসের তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়। সরজমিন রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বসিলা, রায়ের বাজার, মিরপুর, বাড্ডা, ডেমরা, যাত্রাবাড়ীসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় একেবারেই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে। শীত মৌসুমে এই সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। একাধিক গ্রাহক অভিযোগ করে মানবজমিনকে জানান, প্রতিদিন সকাল ৯টার আগেই গ্যাস চলে যায়, আসে বিকালে। শীত মৌসুম শুরু হলেই প্রতিবছর এই সংকট সৃষ্টি হয়। তবে এবার শীত আসার এক মাস আগেই গ্যাসের চাপ কমতে থাকে। গ্রাহকদের অভিযোগ, মূলত এই প্রক্রিয়াতেই সিস্টেম লস করে গ্রাহকদের হয়রানি করা হয়। এ ছাড়া অবৈধ সংযোগ দেয়ার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন তিতাসের কর্মকর্তারা। যা অনেকটা নিয়মে পরিণত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

মন্ত্রণালয়কে দেয়া দুর্নীতি সংক্রান্ত দুদকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, তিতাসের অসাধু কর্মকর্তারা প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে মিটার টেম্পারিং করে থাকেন। তদন্ত কমিটির সদস্যরা সে সময় রাজধানীর আশেপাশের ৫টি এলাকায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৪৫৫টি অবৈধ গ্যাস সংযোগেরও সন্ধান পায়। গ্রাহকদের প্রকৃত বিল গোপন করা, সংযোগ নীতিমালা অনুসরণ না করা, সিস্টেম লস দেখিয়ে গ্যাস চুরিসহ নানা অপরাধের প্রমাণ মেলে তদন্তে। গত বছরের ১৭ই এপ্রিল ওই প্রতিবেদনটি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের হাতে তুলে দেয় দুদক। এতে তিতাসে দুর্নীতির ২২টি উৎস চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে ১২ দফা সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিতাসে গ্যাস সংযোগে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না। অবৈধ সংযোগ, মিটার টেম্পারিং, কম গ্যাস সরবরাহ করেও সিস্টেম লস দেখানো হয়। বাণিজ্যিক গ্রাহককে শিল্পশ্রেণির গ্রাহক হিসেবে সংযোগ দেয়া হয়। সংস্থার অসাধু কর্মকর্তারা ঘুষের বিনিময়ে মিটার টেম্পারিং করে গ্রাহকের প্রকৃত বিল গোপন করে সরকারকে ঠকিয়ে নিজেরা লাভবান হন। অবৈধভাবে সংযোগ নিতে তিতাসের কর্মচারীদের ৪৫ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। এখন সেই রেট আরো বেড়েছে। এভাবেই অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতির জাল বিস্তার করেছেন প্রতিষ্ঠানটি ঘিরে।
দুদকের ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, তিতাসে ৬ শতাংশ সিস্টেম লস হয় অবৈধ সংযোগের কারণে। ঢাকার আশেপাশের এলাকাগুলোয় বিশেষ করে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জে বিপুল পরিমাণ অবৈধ গ্যাসলাইন সংযোগের তথ্য পাওয়া যায়। গৃহস্থালির চেয়ে শিল্পেই বেশি অবৈধ সংযোগ রয়েছে। রাতের আঁধারে অবৈধ সংযোগগুলো দেয়া হয়। তিতাসে কেউ নতুন সংযোগের জন্য আবেদন করলে বা অবৈধ সংযোগ বৈধ করার জন্য আবেদন করলে সেটি সহজে অনুমোদন পায় না। তাই তারা অবৈধ সংযোগকে বৈধ করতে আগ্রহী নয়। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে অনেক সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। আদালত অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলেও রাতের আঁধারে সেটি অর্থের বিনিময়ে পুনঃসংযোগ দেয়া হয়। অনেক সময় অদৃশ্য হস্তক্ষেপে অবৈধ সংযোগ দেয়া হয়। ওই হস্তক্ষেপের কারণেই অবৈধ সংযোগ বন্ধও করা যায় না।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, শিল্পশ্রেণির গ্রাহকদের কমমূল্যে গ্যাস সংযোগ দেয়ার নিয়ম থাকায় অনেক সময় অর্থের বিনিময়ে বাণিজ্যিক শ্রেণির গ্রাহক যেমন- হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বেকারি, সুপার শপ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে শিল্পশ্রেণির গ্রাহক হিসেবে সংযোগ দেয়া হয়। অবৈধ সংযোগের পাশাপাশি মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমেও তিতাসে দুর্নীতি হয়। এ ছাড়া অনুমিত পরিমাণের চেয়ে গ্যাস কম সরবরাহ করেও সিস্টেম লস দেখানোর অভিযোগ আছে তিতাসের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে দুদক জেনেছে, বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় অবৈধ সংযোগ বা বাইপাস করে তা গৃহস্থালিতে সিস্টেম লস হিসেবে দেখানো হয়। অবৈধ চুলার জন্য বৈধ চুলার সমান টাকা আদায় করে আত্মসাৎ করার তথ্যও রয়েছে দুদকের কাছে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে মিটার টেম্পারিং রোধ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের অপচয় বন্ধ করাসহ ১২টি সুপারিশ দেয় সংস্থাটি। তবে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও দুদকের কোনো সুপারিশ কার্যকর হয়নি।
এ বিষয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌ. আলী ইকবাল মো. নূরুল্লাহ’র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে দুদকের প্রতিবেদনের ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমি নতুন এসেছি, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। বিষয়টি দেখতে হবে। দেখে পরে আপনাকে এ সম্পর্কে বলতে পারবো। তবে অবৈধ সংযোগ দেয়ার মাধ্যমে ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা দীর্ঘদিন ধরে হয়ে আসছে। আমরা এ ব্যাপারে অবশ্যই পদক্ষেপ নেব।

এ ব্যাপারে দুদকের কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মো. মোজাম্মেল হক খান মানবজমিনকে বলেন, সুপারিশগুলো দেয়ার পর একটি কমিটি করা হয়েছে। তারা রিপোর্ট তৈরি করবে, তাদের কাছ থেকেই এ ব্যাপারে আমরা খোঁজখবর নেব। তবে এখন পর্যন্ত কোনো রিপোর্ট আমরা পাইনি। এতদিনেও সুপারিশগুলো কেন কার্যকর হচ্ছে না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এমন আরো অনেক মামলা চলছে। নতুন নতুন আরো অনেক অভিযোগ আসছে। সবই একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্যকর হয়ে থাকে। তিতাসের সুপারিশগুলো নিয়ে কমিটি কাজ করছে।

এদিকে সম্প্রতি তিতাসের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সুপারিশ করা হয়। এতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগসহ পেট্রোবাংলা ও তিতাস গ্যাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। যদিও সুপারিশটির অগ্রগতি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কিছু জানা যায়নি।