Home / খবর / দুষ্টচক্র বেপরোয়া পঙ্গু হাসপাতালের

দুষ্টচক্র বেপরোয়া পঙ্গু হাসপাতালের

বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের (পঙ্গু হাসপাতাল) অনিয়মের দুষ্টচক্র। দীর্ঘদিন ধরে একই দায়িত্বে থেকে চক্রটি দুর্নীতি ও ক্ষমতার
মহীরুহে পরিণত হয়েছে। হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়েছে নিজেদের কব্জায়। সাধারণ স্টাফরা তাদের চোখ রাঙানিতে তটস্থ। এ চক্রটির অনৈতিক চাওয়া-পাওয়ার কাছে অসহায় প্রশাসন। নিয়মনীতি, আইনকানুন, এমনকি সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের আদেশ-নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে হাসপাতালে রামরাজত্ব কায়েম করেছে তারা। আর তাদের এ অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই, বলি হতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের। প্রশাসনের খড়গ নেমে আসছে তাদের ওপর।

সরজমিন হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা যায়, এ দুষ্টচক্রের অপকর্ম ওপেন সিক্রেট। কানাঘুষা চললেও বদলি বা হেনস্তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। সম্প্রতি মানবজমিনে চক্রটির নানা অপকর্ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন জোরপূর্বক দায়িত্ব আঁকড়ে থাকা ব্যক্তিদের সরিয়ে নিয়মানুযায়ী রোস্টার পরিবর্তন করা হয়।  এতেই ক্ষেপে যায় চক্রটি। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে নানা কুৎসা রটনা করে। নার্সিং সুপারিনটেন্ডেন্ট (মেট্রন)-এর বিরুদ্ধে নানা কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে হাসপাতালের দেয়ালে দেয়ালে লিফলেট সাঁটিয়ে দেয়। রাতের আঁধারে নোটিশ বোর্ড থেকে তুলে ফেলে নতুন রোস্টার। এতেই থেমে থাকেনি তারা। হাসপাতাল প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বদলির হুমকি দেয়া হয়েছে ওই মেট্রনকে। এ ছাড়া নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তদের পদে যোগদান করতে দেয়া হয়নি।

গত ১লা নভেম্বর পঙ্গু হাসপাতালের নানা অনিয়ম নিয়ে মানবজমিনের শেষের পাতায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ‘পঙ্গু হাসপাতাল, অনিয়মের দুষ্টচক্র’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে একই ব্যক্তি বছরের পর বছর দায়িত্ব আঁকড়ে থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তাদেরকে কোনোভাবেই ওই দায়িত্ব থেকে সরানো যাচ্ছিলো না। এমনকি তাদের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর থেকে একাধিকবার চিঠি দেয়ার পরও দায়িত্বে বহাল থাকেন তারা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পূর্বের মেট্রনের পৃষ্ঠপোষকতায় সিন্ডিকেটটি ধরাকে সরা জ্ঞান করে। নতুন মেট্রন যোগদানের পর বিষয়টি নজরে নিয়ে এবং অধিদপ্তরের চিঠির প্রেক্ষিতে একাধিকবার দায়িত্ব পরিবর্তনের উদ্যোগ নিলেও সিন্ডিকেটের বাধার মুখে তাতে সফল হননি। পরে প্রতিবেদনটি প্রকাশ পেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মৌখিক নির্দেশে তিনি নতুন দায়িত্ব বণ্টন করেন।
জানা যায়, নিয়মানুযায়ী যেকোনো বিভাগের ইনচার্জ পদে ২ বছর পূর্ণ হলেই তাকে আবশ্যিকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। কিন্তু বিভিন্ন বিভাগে এই দায়িত্বে রয়েছেন বছরের পর বছর। এমনকি কেউ কেউ রয়েছেন টানা দুই যুগ। রোস্টার পরিবর্তনের পরও তারা  জোরপূর্বক ওই দায়িত্ব আঁকড়ে রয়েছেন। অন্যদের যোগদান করতে দেননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন রোস্টার অনুযায়ী ‘এ’ ওয়ার্ডে ৩ বছর ধরে দায়িত্বপালনকারী সিনিয়র স্টাফ নার্স সালমা খানমকে পরিবর্তন করে ইনচার্জের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তৃষ্ণা রানী হালদারকে, ‘বি’ ওয়ার্ডে ৪ বছর ধরে ইনচার্জের দায়িত্বে আছেন মাজেদা বেগম। তার স্থানে নতুন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মলিনা রানী রায়কে। ‘সিডি’ ওয়ার্ডে গত ১৬ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন রেজিনা ব্যাপারী। নতুন রোস্টার অনুযায়ী এ ওয়ার্ডে ইনচার্জ করা হয়েছে বাসন্তী রানী দত্তকে। ‘ই এফ’ ওয়ার্ডে ৩ বছরের অধিক সময় ধরে ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করা রওশন আরাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে পাপিয়া সুলতানাকে। ‘আই জে’ ওয়ার্ডে সেলিনা পারভীন ১৩ বছর ধরে ইনচার্জের দায়িত্বে, তার স্থানে দেয়া হয়েছে সামসুল হককে। ‘প্যারা’ ওয়ার্ডে ৫ বছর ধরে আছেন রাশিদা বেগম। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে সুনীতি রানী বাড়ৈকে। রাশেদা এর আগে অন্য আরেকটি ওয়ার্ডে টানা ১০ বছর ইনচার্জ ছিলেন। আঁখি বেগম ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করছেন ১০ বছর ধরে। তার স্থানে দেয়া হয়েছে হেলেনা খাতুনকে। এর আগে আঁখি প্যারা ওয়ার্ডে আরো ১০ বছর ইনচার্জের দায়িত্বে ছিলেন। এ ছাড়া ‘কেবিন’ ওয়ার্ডে ২০ বছর ধরে ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করা শামীমার স্থানে রওশন আরা বেগমকে, ‘সি ওটি-১’ এ ১১ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা কনিকা হালদারের জায়গায় কার্মেল রর্ড্রিক্সকে, ‘সি আর-১’-এ ৫ বছর দায়িত্ব পালন করা রিনা আক্তারের পরিবর্তে শিল্পী মারিয়া কস্তাকে, ‘আইসিইউ’তে ৯ বছর ধরে থাকা শাহনাজ বেগমের পরিবর্তে পারভীন আক্তারকে, ‘ই ওটি-৪’-এ ১৫ বছর ধরে থাকা শাহিদা পারভীনের পরিবর্তে জেনেভি দেশাইকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
কিন্তু নতুন এ দায়িত্ব বণ্টন মেনে নিতে পারেনি পুরাতনরা। তারা পদ আঁকড়ে ধরতে হাঙ্গামা সৃষ্টিসহ নতুনদের যোগদান করতে দেয়নি। জানা যায়, ১১ জন নার্সিং সুপারভাইজারের স্বাক্ষর করা দায়িত্ব বণ্টনের নতুন তালিকা নোটিশ বোর্ডে টানানো হয় গত ২৬শে ডিসেম্বর। এদিনই হাসপাতালে হইচই সৃষ্টি করে সিন্ডিকেটটি। তারা রাতের আঁধারে তা তুলে ফেলে। ওইদিন রাতেই দেয়ালে দেয়ালে নার্সিং সুপারিনটেন্ডেন্ট-এর বিরুদ্ধে পোস্টারিং করে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই কাজে নেতৃত্ব দেন বহির্বিভাগের ইনচার্জ আলমগীর, জরুরি বিভাগের ইনচার্জ আঁখি বেগম, ওটি (জরুরি বিভাগ) ইনচার্জ সাহিদা পারভীন, নার্সিং সুপারভাইজার শাহনাজ সরকার (যদিও নতুন রোস্টারে তার স্বাক্ষর রয়েছে)। এ ছাড়া বহির্বিভাগের গাজী আমিনুল হক, সিডি ওয়ার্ডের হেলাল উদ্দিন, ‘ই আর ওয়ার্ডে’র এমএ কাউয়ুম, ‘আই জে’ ওয়ার্ডের ইদ্রিস আলী তাদের সঙ্গে ছিলেন। আমিনুল কাজে অনুপস্থিত থাকলেও হাসপাতালে উপস্থিত থেকে নতুন রোস্টারের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। এ দুষ্টচক্রটি হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের কাছে গিয়ে নতুন রোস্টার বাতিলের দাবি জানায়। তাদের কাছে নতি স্বীকার করে কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিন পর দেয়া পরিবর্তিত রোস্টার বাতিল করে।
তাদের দাবির প্রেক্ষিতে গত ৩রা জানুয়ারি হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. তড়িৎ কুমার সাহা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে নতুন রোস্টার বাতিল করা হয়। তাতে বলা হয়, ‘রোস্টার পরিবর্তনে পরিচালক মহোদয়ের সম্মতি না থাকায় অসম্পূর্ণ আদেশটি পরিচালক মহোদয়ের নির্দেশক্রমে বাতিল করা হইলো।’
নতুনদের যোগদানে বাধার ব্যাপারে তড়িৎ কুমার সাহা বলেন, কাজ করতে গেলে কিছু সমস্যা হবে। আমরা এ ব্যাপারে সমাধান বের করতেছি। কোভিডের মুহূর্তের পুরাতনদের সরিয়ে নতুন কাউকে দিলে কিছুটা সমাধান হবে। তবে সময় লাগবে। এত বছরেও কেন সমাধান হয়নি- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অতীতের কথা বলতে পারবো না। চিহ্নিত ওই সিন্ডিকেটের কাছে হাসপাতাল প্রশাসন জিম্মি কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন- এমনটা না, আমরা ম্যানপাওয়ার তৈরি করে ম্যানপাওয়ার ছাড়বো। পরে তিনি বলেন, স্যার (হাসপাতালের পরিচালক) একটু অসুস্থ, উনি সুস্থ হয়ে আসলে ব্যবস্থা নেবো। ভারপ্রাপ্ত পরিচালক বলেন, এখানে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ নেই। আমরা একটি পয়সাও খাইনি কারো কাছ থেকে। জনস্বার্থে রোস্টার পরিবর্তনের আদেশটি বাতিল করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নতুনদের দায়িত্ব পালনে বাধাদানকারীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদেরও কোনো স্বার্থ নেই।
এদিকে, মেট্রনের বিরুদ্ধে মানহানিকর পোস্টারিং ও নতুনদের দায়িত্ব পালনে বাধাদানের প্রেক্ষিতে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি পঙ্গু হাসপাতাল পরিদর্শন করে। ঘটনার সত্যতা পেয়ে গত ৭ই জানুয়ারি অভিযুক্ত ৭ জনকে তাৎক্ষণিক বদলি করেন। এর মধ্যে মো. আলমগীরকে কক্সবাজারের রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, শাহনাজ সরকার ও আঁখি বেগমকে ফেনীর সোনাগাজী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, শাহনাজ সুলতানাকে ছাগলনাইয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, সাহিদা পারভীনকে পরশুরাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, শামীমা আক্তারকে নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং গাজী আমিনুল হককে নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে বদলি করা হয়েছে। আগামী ১৩ই জানুয়ারির মধ্যে তাদের যোগদানের আদেশ দেয়া হয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, এ বদলির আদেশ পরিবর্তনে তারা পঙ্গু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হয়েছে। যেকোনো মূল্যে তারা সংশ্লিষ্ট স্থানে যোগদান থেকে বিরত থাকতে চান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: