Home / আর্ন্তজাতিক / নরসুন্দর ও সিনেটরের হেয়ারকাট লকডাউনে

নরসুন্দর ও সিনেটরের হেয়ারকাট লকডাউনে

করোনাকালে হিউস্টন থেকে বিমানে উড়ে ২২৫ মাইল দূরে ডালাস গিয়েছেন চুল কাটাতে। টেক্সাসের রিপাবলিকান দলীয় ইউএস সিনেটর টেড ক্রুজ। লকডাউন শিথিল করায় গত ৮ মে সেখানকার ‘সেলুন এ মুডি’তে চুল কাটান সিনেটর ক্রুজ। যার মালিক শেলী লুথার নামের একজন মহিলা। আগের দিন জেল থেকে ছাড়া পান তিনি। লকডাউন আইন অমান্য করে সেলুন খোলা রাখার চেষ্টা করলে আদালত কারাদন্ড দেয় তাকে। সদ্য কারামুক্ত শেলী নিজে হেয়ার কাট সম্পন্ন করেন টেড ক্রুজের। পরে শেলী লুথারের কারাদণ্ড প্রদানকে হাস্যকর বলে মন্তব্য করেন সিনেটর ক্রুজ।

এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন প্রভাবশালী এই সিনেটর। কোভিট-১৯ পজিটিভ এমন কারো সংস্পর্শে এসেছেন সন্দেহে মার্চে দু’সপ্তাহের জন্য আইসোলেশনে যান তিনি। এরপর আর চুল কাটাতে পারেননি। ঘরে স্ত্রীও কটাক্ষ করছিলেন এ নিয়ে। ফলে অস্বস্তিতে ভুগছিলেন টেড ক্রুজ।
সিনেটরের মতো অস্বস্তি এখন আমাদের অনেককেই পেয়ে বসেছে। লম্বা চুল দাঁড়ি নিয়ে আর কতো অপেক্ষা। সেলুন সব বন্ধ। ছোঁয়া নেই ক্ষুর কাঁচির। লকডাউন চলছে দু’মাস হলো। কিছুতেই কাটছে না কর্মজীবী মানুষের কর্মহীন অলস সময়। বিশ্রামে বিশ্রামে ক্লান্ত। তাই ঘুরে ফিরে চোখ যায় ফেসবুকে। করোনা কালে ছবিতে ঠাসা ফেসবুকের দেয়াল। ব্যাক্তিগত প্রোফাইলেও দেখা যাচ্ছে নতুন চেহারা। আমার এক বন্ধুও নিজ দেয়ালে সেঁটেছেন নতুন ছবি। প্রথম দর্শনে চিনতে কষ্ট হয় তাকে। লম্বা ঝাঁকড়া চুল। দামিয়ে উঠা অবিন্যস্ত দাঁড়ি গোফ। ক্যাপশন দিয়েছে-‘এ সন্যাস বেশ অনিচ্ছাকৃত।’ ইদানিং অনেকেই দিচ্ছেন এমন পোস্ট। মন্তব্য আসছে ‘মাশাআল্লাহ, নূরানী চেহারা। আল্লাহর ওয়াস্তে রেখে দিন।’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কেউ আবার মাথা ন্যাড়া করে ছবি ছাড়ছেন। মাথা মোড়ানোর কাজটি নিজ ঘরে সম্পাদন করা যেতে পারে। কিন্তু বিপাকে পড়েছেন যারা নিয়মিত ‘বারবার শপ’ বা সেলুনে চুল কাটান তাঁরা। লকডাউনের প্রথম ধাক্কায়ই বন্ধ হয়ে গেছে সব হেয়ার কাটিং সেলুন। আর যারা এই পেশায় নিয়োজিত, থমকে গেছে তাদের জীবন জীবিকা। কঠিন সময় পার করছেন তারা। আজ লকডাউনে উপলব্ধি হচ্ছে সমাজে নরসুন্দরদের প্রয়োজন কতটা জরুরি। চুল দাঁড়ি কামিয়ে নরকূল অর্থাৎ মানুষের সৌন্দর্য বর্ধন করে বলেই এদের নাম হয়েছে নরসুন্দর। প্রচলিত ভাষায় বলা হয় নাপিত। আর প্রমিত বাংলায় বলে ক্ষৌরকার বা পরামানিক। ক্ষৌরকর্ম নিঃসন্দেহে একধরণের আর্ট। বাহারি ফ্যাশনের হেয়ার কাট দেখলেই তা বোঝা যায়। এ পেশা চলমান আছে মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের লগ্ন থেকে। সমাজে কোন পেশাকেই খাঁটো করে দেখার অবকাশ নেই। আমাদের দেশে একসময় ছিল যখন শুধুমাত্র নিম্নবর্ণের হিন্দুদের একটি অংশ এ পেশায় জড়িত ছিল। এখন আর সেই বালাই নেই। অনেক শিক্ষিত মুসলমান যুবক যুবতী জীবিকা হিসেবে বেছে নিচ্ছে এই পেশা। মানুষ সৌন্দর্যের পূজারি। কে না চায় নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে। কেশ বিন্যাস সৌন্দর্য চর্চার অন্যতম উপজীব্য। এজন্যই সবাই ছূটেন ‘বারবার শপ’ বা সেলুনে। দ্বারস্থ হন নরসুন্দরের। চুল কাটানোর বিষয়টি অনেকটা স্পর্শকাতর। একবার চুল কাটানোর কথা মনে হলে তা শেষ না করা পর্যন্ত অস্বস্তি বোধ হতেই থাকে। অনেকেরই আবার থাকে পছন্দের ক্ষৌরকার।
চুল দাঁড়ি কামানো ছাড়াও নরসুন্দরদের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অতীত ইতিহাস। ইউরোপে মধ্যযুগে নরসুন্দররা পরিচিত ছিলেন ‘বারবার সার্জন’ Barber Surgeon)হিসেবে| । পশ্চিমা রোমান সা¤্রাজ্যের পতনের পর পঞ্চম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কাল ছিল মধ্যযুগ। রেনেসাঁর পূর্ব পর্যন্ত পুরো সময় নরসুন্দরগন গোটা ইউরোপে পালন করেন চিকিৎসকের দায়িত্ব। বিশেষ করে যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ পরবর্তীতে আহত সৈনিকদের চিকিৎসা করতেন তারা। আহতদের অঙ্গ কর্তনসহ জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হতো ক্ষৌরকারদের হাতে। পেশাদার চিকিৎসকরা কদাচিৎ এ কাজে হাত দিতেন। এতে প্রচুর রক্তক্ষরণ ও ইনফেকশনে মৃত্যুহার বাড়লেও এটাই ছিলো নিয়ম। ব্রিটেনে ১৭৪৫ সালে ‘রয়েল কলেজ অব সার্জনস’ প্রতিষ্ঠিত হয়। তার আগে ১৫৪০ সাল থেকে ব্রিটিশ চিকিৎসকরা ‘কোম্পানি অব বারবার সার্জনস’ এর সাথে যৌথভাবে চিকিৎসা কাজ চালাতেন। সেলুন বা নরসুন্দরের দোকান এখনো সামাজিক যোগাযোগের একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। যেখানে রাজনীতি, খেলাধুলা, বিনোদন সহ সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়। পাড়ার সেলুন গুলোতে রমরমা আডডা চলে বেকার যুবকদের। দিনে ঘুরে ফিরে বারকয়েক ডু মারে তারা। সেলুনের চিরুনি দিয়ে কেশবিন্যাশ করে। অবশ্য এতে কিছু মনে করেন না সেলুন মালিকরা। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আঙ্গিক বদলেছে হেয়ার কাটিং সেলুনের। পরিবর্তন এসেছে চুল কাটার যন্ত্র ও প্রসাধন সামগ্রীতে। খদ্দেরদের মনোরঞ্জনের জন্য যুক্ত হয়েছে এলডি টিভি। তারপরও বাপ দাদার পেশার পুরনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন অনেকে। গ্রামের হাট বাজার ও রাস্তার পাশে গাছ তলায় এখনো চালাচ্ছেন ক্ষৌরকর্ম্ম। একসময় ছিল নরসুন্দররা হাট বাজারে বসার পাশাপাশি মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চুল দাড়ি কামাতেন। সে সময়টায় মানুষের হাত ও পায়ের নখ কাটার কাজটিও করতেন তারা। এ নিয়ে একটি প্রবাদ আছে – ‘নাপিত দেখলে নখ বাড়ে’।
গ্রামের নাপিতরা নগদ নারায়ন ছাড়াও বাড়ি প্রতি বাৎসরিক মজুরি হিসেবে ধান সংগ্রহ করতেন ফসলি মৌসুমে। ঈদে, পূজায় এবং বিয়ে বাড়িতে নরসুন্দরদের ছিল বাড়তি কদর। তখন চার আনা,ছয় আনা হলেই দেয়ানো যেত দিলীপ, উত্তম, স্কয়ার বা পছন্দসই যেকোনো ছাঁট। নরসুন্দরদের অনেকেই এখন সচ্ছল, ধনবান।
বিশ্বের সবচেয়ে ধর্নাঢ্য নরসুন্দর ভারতের রমেশ বাবু। বেঙ্গালুরের অতিসাধারণ একজন নরসুন্দর এখন বিলিওনিয়ার। দেশটির বড় শহরগুলোতে তার রয়েছে হেয়ার কাটিং ও স্টাইল ব্যবসায়। সালমান খান, অমির খান, ঐশ্বরিয়া রাইয়ের মতো সেলিব্রিটি। বড় মাপের রাজনীতিক, খেলোয়াড়, ব্যবসায়ী, সেনা কর্মকর্তা, আমলারা তার খদ্দের। মূল পেশার পাশাপাশি ১৯৯৩ সালে রমেশ শুরু করেন রেন্ট এ কার ব্যবসায়। তার রয়েছে তিন কোটি রুপি মূল্যের রোলস রয়েস সহ চার শতাধিক দামী গাড়ি। নরসুন্দরদের জীবন কাহিনী নিয়েও বিভিন্ন ভাষায় রচিত হয়েছে সাহিত্য। নির্মিত হয়েছে দর্শক নন্দিত অনেক ছায়াছবি। একজন নরসুন্দরের জীবন থেকে নেয়া বলিউডের ছায়াছবি ‘বিল্লু’। ২০০৯ সালে নির্মিত এ ছবিতে অভিনয় করেন ইরফান খান, লরা দত্ত, ওম পুরী প্রমুখ। মফস্বল শহরের অভাবী ক্ষৌরকার বিল্লুর ভাগ্য বদলে যায়। এলাকাবাসী যখন জানতে পারে একজন সুপারহিট হিরো আসছেন তার দোকানে। এছাড়া ‘বারবার শপ’ নামে আছে শিকাগো ভিত্তিক আমেরিকান কমেডি সিনেমা। ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিন পর্বে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি বক্স অফিস হিট করে।
নিউইয়র্ক সিটির বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকায় আছে বেশক’টি সেলুন। যার সবগুলোর মালিক, কর্মচারী এবং কাষ্টমার সবাই স্বদেশী। দূর দূরান্ত থেকে অনেকে এসব সেলুনে আসেন চুল দাড়ি ছাটাতে। লকডাউনে এখন সবাই বিচ্ছিন্ন। দু’যুগেরও অধিক সময় ধরে নিউইয়র্কে বসবাস করছি। এসময়ে বিভিন্ন ভাষাভাষী নরসুন্দরের শরনাপন্ন হয়েছি চুল কাটাতে। লিবিয়ার বেনগাজিতে থাকাকালীন মিশরীয় এবং লেবানীজদের সেলুনে যেতাম। চমৎকার চুল কাটেন তারা।
এর আগে দেশে যখন যেখানে ছিলাম সেখানে সাধারণত চুল কাটাতাম একই কারিগরের কাছে। তবে বাল্যকালে চুল কাটানোর একটি ঘটনা এখনো খুব মনে পড়ে। আমার বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায়। আমাদের গ্রামের পশ্চিম পাড়ায় মুসলমান। আর পূর্ব পাড়ায় ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের বাস। ঠাকুর, ভাদুড়ীদের মতো বনেদি হিন্দু ছাড়াও পূর্ব পাড়ায় ছিল নাপিত বাড়ি। শরৎশীল ও মেঘাশীলের পরিবার বাস করতো এ বাড়িতে। আমাদের বাড়ির সবার চুল কাটতেন শরৎশীলের ছেলে মতিলাল শীল। ষাটের দশকের গোড়ার দিকের কথা। ঈদের ছুটিতে সবাই গ্রামের বাড়িতে একত্র হতাম। এসময়টাতে মতিলাল শীলের সাথে দেখা হতো। বাহির বাড়িতে গাছ তলায় টুল পেতে বসতেন তিনি। পাশে রাখতেন ছোট একটি কাঠের বাক্স। তার ভেতরে থাকতো কাঁচি, ক্ষুর, চিরুনি, ছোট একটি আয়না ও পানি রাখার জন্য পিতলের ছোট একটি বাটি। এক এক করে আমরা মতিলাল শীলের সামনে কাঠের পিড়িতে বসতাম। তাকে জানাতে হতো পছন্দের ছাঁটের কথা। তখন বোম্বের নায়ক দীলিপ কুমারের চুলের স্টাইল দীলিপ ছাঁটের জনপ্রিয়তা ছিল শীর্ষে। আমিও অনুরোধ করলাম দীলিপ ছাঁট দিতে। কিন্তু চুল কাটা শেষে আয়নাতে যখন দেখলাম দীলিপ নয় আমাকে দেয়া হয়েছে স্কয়ার ছাঁট। আর যায় কোথায়। ক্ষেপে গিয়ে নাপিতের বাক্সটি বাড়ির পুকুরে ফেলে দেই। বড় হওয়ার পর যতবার মতিলালের সাথে দেখা হয়েছে ততবার তিনি জিগ্যেস করেছেন ‘কাহা তোমার মনে আছে তো?’ মতিলাল শীল বেঁচে নেই। কিন্তু তাকে যন্ত্রণা দেয়ার ঘটনা এখনো মনকে পীড়া দেয়। আসলেই তখন আমাদের সেই সম্পর্ক ছিল অকৃত্রিম। আর সময় ছিল অনন্য অসাধারণ।
লেখক: ডা: ওয়াজেদ খান, সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ, নিউইয়র্ক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: