নারীর ভোগান্তি কমেনি গণপরিবহনে

22

নারীরা বেশি কর্মমুখী আগের চেয়ে বর্তমানে। তারা বেশিরভাগই এখন আর শুধু ঘরের কাজ করেন না। তাদের পথঘাটে চলাফেরা করতে হয়। আর ওই চলাচলেই বাধছে বিপত্তি। গণপরিবহনে নিত্য নারীদের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করতে হচ্ছে। অথচ এই গণপরিবহনের সেবা দেওয়ার কথা। সেবা মানে উপভোগ আর এ উপভোগেরই উল্টোপিঠ হলো দুর্ভোগ। গণপরিবহন আর দুর্ভোগ যেন অঙ্গাঅঙ্গি। বতর্মান বিশ্বে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর পদচারণা অনেক বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে নারীদের প্রতি সহমমির্তা ও সহযোগিতাও। এর পরও নগরীতে বসবাসরত কয়েক লাখ নারীকে প্রতিদিন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কমস্থলে যাতায়াতে গণপরিবহনে পথে পড়তে হয় নানা প্রকার ভোগান্তিতে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নারীযাত্রীর সংখ্যাও বাড়ছে। কিন্তু গণপরিবহনে বাড়ছে না নারীদের জন্য আসনসংখ্যা। নারীযাত্রীর জন্য বিআরটিসি কিছুদিন আগেও ৮টি বাস চালু রেখেছিল। কিন্তু করোনা ও করোনা-পরবর্তী এখন বাসের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫টিতে। ব্যস্ত কমর্ঘণ্টাগুলোয় কমজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য গণপরিবহনে জায়গা করে নিতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। পুরুষদের পাশাপাশি ধাক্কাধাক্কি করে, দাঁড়িয়ে বা বাসের পাদানিতে ঝুঁকি নিয়ে ঝুলে যাতায়াত করতে হচ্ছে নারীদের। পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যানবাহনে উঠতে গিয়ে প্রতিনিয়ত যৌন হয়রানিসহ নানা রকম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন নারীরা। বাসে ওঠানামার সময় শরীরের বিভিন্ন অংশে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃতভাবে লাগছে চালক-সহকারীর হাত। কতিপয় পুরুষযাত্রী ইচ্ছা করে নারীযাত্রীদের গায়ের ওপর পড়ে যান কিংবা অপ্রয়োজনে গায়ে হাত দেন। বাসের পেছনে ফাঁকা থাকলেও সামনের দিকে নারী আসনগুলোর পাশে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং চালক-সহকারীরা পেছনে যেতে বললে তাদের বাজে ভাষায় আক্রমণ করেন। আর গণপরিবহনে ধর্ষণের ঘটনাও রয়েছে অনেক।

কথা হয় কাকরাইল থেকে টঙ্গী যাতায়াতকারী নারীযাত্রী কানিজের সঙ্গে। তিনি জানান, এই ঝড়-বৃষ্টির আবহাওয়াতেও আধা ঘণ্ডার ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন। মহিলা সিট নেই এই অজুহাতে তাকে বাসে উঠতে দিচ্ছে না। দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা বললে উল্টো বাসের হেলপার অপমানসূচক বিভিন্ন মন্তব্য করে। প্রায় নিত্যদিনই এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। এক হেলপার বাসে উঠতে না দেওয়ায় বললেন, ‘ভাই আমাদেরও তো যেতে হবে।’ সে বাসের দরজা বন্ধ করতে করতে ভেংচি কেটে বলে- ‘রিকশায় যান, রিকশায়।’ এমনতর অপমান সহ্য করি আর দিন বদলালোর কথা ভাবতে ভাবতে রাস্তা পাড়ি দেন তিনি।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রাজধানীর ৭৩টি মোড়ে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় ভিড় থাকে। এ ভিড়ের মধ্যে নারীযাত্রীদের পোহাতে হয় এসব সমস্যা। অপরাধী অপরিচিত হওয়া এবং আমাদের সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি না পাওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীদের এসব ভোগান্তি মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। এ ছাড়া শুধু পুরুষযাত্রী নন, বাসের চালক ও হেলপারদের আচরণও নারীদের জন্য যথেষ্ট অসম্মানজনক এবং বিব্রতকর। বেশিরভাগ লোকাল বাসের ড্রাইভার ও হেলপাররা নারীদের উদ্দেশ করে বা তাদের সামনে অশ্লীল শব্দ, বাক্য এবং অঙ্গভঙ্গি করায় অভ্যস্ত। এ ছাড়া কতিপিয় কুরুচিপূর্ণ মানুষও গায়ে পড়ে নোংরামি করে।

আঁচলের তথ্য বলছে, গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হন ৬৪ দশমিক ৯২ শতাংশ নারী। এ সংখ্যাটি অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর হয়রানির মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। শিক্ষা, চাকরিসহ নানা প্রয়োজনে নারীরা গণপরিবহন ব্যবহার করে থাকেন। সমীক্ষা বলছে, গণপরিবহন হিসেবে সর্বাধিক ব্যবহৃত হয় বাস। তবে হয়রানির স্থান হিসেবে বাস ও বাসস্টেশন- এ দুটিকে উল্লেখ করেছেন সমীক্ষায় অংশ নেওয়া নারীরা। দুই জায়গা মিলিয়ে হয়রানির হারটা অবশ্য অনেক বড় ৮৪ দশমিক ১০ শতাংশ। রেল ও রেলস্টেশনে এই হার ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আর রাইড শেয়ারিং সেবায় ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ নারী হয়রানির শিকার হন।

সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা জানান, গণপরিবহনে যৌন হয়রানির মধ্যে আপত্তিকর স্পর্শের শিকার হন ৬৪ দশমিক ৯২ শতাংশ। ২০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ কুদৃষ্টি ও অনুসরণের শিকার হয়েছেন বলে জানান। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নারীরা সবচেয়ে বেশি নিপীড়নের শিকার হন একাকী চলার সময়। সংখ্যায় তা ৭৫ দশমিক ৬০ শতাংশ।

গণপরিবহনে নারীযাত্রীদের ভোগান্তি লাঘবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সাহসী ও দায়িত্বশীল হতে হবে। নিজেদের মানসিকতা বদলাতে হবে। জেন্ডার নয়, নারীযাত্রীকে মানুষ হিসেবে গণ্য করলেই সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে।তবেই বদলে যাবে সমাজ।