নোমান হাসনুরকে যেভাবে আদালতে হাজির করা হলো

91

অটোরিকশা চালক নোমান হাসনুর ব্যাংক কর্মকর্তা মওদুদকে মারধরের পর কোর্ট পয়েন্টেই ছিল । পুলিশ যখন এসে খোঁজখবর নিতে শুরু করলো তখনই সে কোর্ট পয়েন্ট থেকে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যায়। শাহপুরের গ্যারেজে গাড়ি রেখে নিজ বাড়ি টুকেরগাঁওয়ে ছিল। পরে যখন শুনলো ওই ব্যাংক কর্মকর্তা মারা গেছেন তখন রাতেই সে বাড়ি ছেড়ে পালায়। একাধিক স্বজনের বাড়িতে অবস্থানের পর সে গ্রেপ্তার এড়াতে সিলেট ছেড়ে পালিয়েছিলো। তবে-  যোগাযোগ ছিল পরিবারের সঙ্গে। অপরদিকে নোমান হাসনুর খোঁজে যতটা না সক্রিয় ছিল পুলিশ তার চেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল কোর্ট পয়েন্টের অটোরিকশা পরিবহন শ্রমিকরা। কারণ নোমান হাসনুর খোঁজ না মেলায় তারাও ছিলেন গ্রেপ্তার আতঙ্কে।

এ কারণে অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ শাখার শ্রমিক নেতারাও তার খোঁজে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যান। কিন্তু কোথাও তার হদিস মিলেনি। মঙ্গলবার রাতে খোঁজ মিলে ঢাকার কাছাকাছি এলাকায় রয়েছে নোমান হাসনুর। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের পর রাতে পরিবহন শ্রমিকদের একটি দল গিয়ে তাকে বুঝিয়ে সিলেটে নিয়ে আসে। গতকাল দুপুরের আগেই আইনজীবী মারফত তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। শ্রমিকরা জানিয়েছেন, নোমান হাসনুর ঘটনার পরপরই পালিয়ে গিয়েছিলো। সে তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনও বন্ধ করে দেয়। এ কারণে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

পরিবারের তথ্য মতে তারা আত্মীয়-স্বজনের বাসায়ও খোঁজ করেন। কিন্তু পাননি। অবশেষে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় ঢাকার কাছাকাছি এলাকায় তার খোঁজ মিলে। সেখান থেকে বুঝিয়ে তাকে সিলেটে নিয়ে আসা হয়। এরপর সকালে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত প্রাঙ্গণে অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ শাখার সাধারণ সম্পাদক শিবলী আহমদ জানিয়েছেন- ‘আমরা তাকে আদালতে নিয়ে এসেছি। সে আমাদের কথা রেখেছে। এ কারণে তার সঙ্গে আমরাও আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলাম। পুলিশ এখন তদন্ত করবে। সে দোষী হলে অবশ্যই তার বিচার হবে।’ সংগঠনের সহ-সভাপতি মো. আব্দুল হামিদ জানিয়েছেন- ‘আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আইন তার বিচার করবে। সিসিটিভি ফুটেজ আমরা দেখেছি। সেখানে দেখা গেছে, নোমান হাসনুর ছাড়া আর কোনো সিএনজি অটোরিকশা চালক তাকে মারধর করেনি। গণপিটুনির যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে সেটি মিথ্যা বলেও দাবি করেন তিনি।’ ব্যাংকার মওদুদ হত্যার আসামি হিসেবে বেলা ১১টায় সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম-১ সাইফুর রহমানের আদালতে হাজির করা হয় নোমান হাসনুরকে। এ সময় তার পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী এডভোকেট দেলোয়ার হোসেন দিলু জামিন প্রার্থনা করেন। আদালত জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। আসামি পক্ষের আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন দিলু জানান- ‘আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করেছে। এ সময় তার জামিন চাইলে আদালত নাকচ করে দিয়েছেন। পরে তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।’ এদিকে- মামলার প্রধান আসামি নোমান হাসনুর আত্মসমর্পণের খবর শুনে তার ৭ দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ।

গতকাল আদালতে রিমান্ড আবেদনের শুনানি হয়নি। আজ-কালের মধ্যে রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।  কোতোয়ালি থানার ওসি এসএম আবু ফরহাদ মানবজমিনকে জানিয়েছেন- নোমান হাসনুরকে পুলিশ খুঁজছিলো। সে আদালতে নিজে হাজির হয়েছে এটি স্বস্তির বিষয়। এখন ঘটনার আদ্যোপান্ত জানতে আদালতে তার ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। আদালত রিমান্ডে দিলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তিনি বলেন- আসামি নোমান হাসনুর আদালতে আত্মসমর্পণ করলেও ঘটনার সবকিছু জানা হয়নি। সে কেন হত্যা করলো ব্যাংক কর্মকর্তা মওদুদকে। তার সঙ্গে আর কারা কারা ছিল- এসব কিছু জানতে হবে। একই সঙ্গে শুধুমাত্র ভাড়া নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড নাকি অন্য কোনো কারণও রয়েছে সেটিও জানা প্রয়োজন। এ কারণে আদালতে তার রিমান্ড চাওয়া হয়েছে বলে জানান ওসি। গত শনিবার রাতে সিলেটের কোর্ট পয়েন্টে সিএনজি অটোরিকশার চালকরা পিটিয়ে হত্যা করে অগ্রণী ব্যাংক হরিপুর গ্যাসফিল্ড শাখার সিনিয়র অফিসার (ক্যাশ) মওদুদ আহমদকে। প্রথমে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলে প্রচার করেছিলো সিএনজি অটোরিকশার চালকরা। পরে কোতোয়ালি থানা পুলিশের সন্দেহ এবং অনুসন্ধানের পর পিটুনিতে হত্যা বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

সিসিটিভির ফুটেজেও হামলার দৃশ্য ধরা পড়ে। ঘটনার পরদিন রোববারই হত্যা মামলা দায়ের করে আসামি গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে পুলিশ। এদিকে- ব্যাংক কর্মকর্তা খুনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন সিলেটের ব্যাংকার এসোসিয়েশনের সদস্যরা। তাদের ডাকে মঙ্গলবার সিলেটের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। আসামি গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। এদিকে গতকালও সিলেটে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে মানববন্ধন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচি থেকে খুনের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করা হয়।