পথে পথে বিপুল যানবাহন ও জনসমাগম ঢিলেঢালা লকডাউন

66

কোথাও কোথাও যানজট। পথে পথে যানবাহন।  পথে-ফুটপাথে বিপুল মানুষ। রয়েছে পুলিশের চেকপোস্ট। গণপরিবহন না চললেও বাধাহীনভাবে ছুটে যাচ্ছে প্রাইভেট গাড়ি, সিএনজি অটোরিকশা, রিকশা। অন্যান্য দিনের চেয়ে গতকাল পুলিশের ভূমিকা ছিল দায়সারা। বিপুল মানুষ ও যানবাহন চলাচল করলেও তল্লাশি বা কোনো ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেখা যায়নি তাদের। সম্প্রতি সরকার ঘোষিত প্রথম দফা লকাউনের শেষদিন ছিল গতকাল।

এইদিনে রাজধানীজুড়ে দেখা গেছে এই দৃশ্য। যেনো দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ছে সরকার ঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধ। সরজমিন রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, কাকরাইল, পল্টন, গুলিস্তান, কাওরানবাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গণপরিবহন চলাচল না করলেও সড়কজুড়ে বিপুল যানবাহন। দুপুরে রামপুরা, কাকরাইল ও পল্টন এলাকায় যানজট সৃষ্টি হতেও দেখা গেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবন সংলগ্ন রামপুরা এলাকায় চেকপোস্টে দুপুরে বিপুল পুলিশ সদস্যকে বসে ও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। কিন্তু যানবাহন, যাত্রী বা পথচারীদের কোনো ধরনের জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেখা যায়নি তাদের। অন্যান্য দিনের চেয়ে সড়কে রিকশার সংখ্যাও ছিল বেশি। মোড়ে মোড়ে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন রাইড শেয়ারকারীরা। রামপুরা থেকে হাজীপাড়া পর্যন্ত দুপুরে যানজট ছিল বেশকিছু সময়। রামপুরা ডিআইটি রোডে ছিল চেক পোস্ট। চেকপোস্টের কারণে চলাচলের রাস্তা সরু হলেও যানবহন ও জনসমাগম ছিল বেশি। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা জানান, লোকজনকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু বেশিরভাগ লোকজনই নানা অজুহাত দেখান। ওষুধ, ডাক্তার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার অজুহাত দেন। একই অবস্থা ছিল কাকরাইল, বিজয় নগর এলাকায়।

কাকরাইল থেকে পুরানা পল্টন যাওয়ার পথে ছিল পুলিশের একটি চেকপোস্ট। ওই চেকপোস্টে মাঝে-মধ্যে যানবাহন থামিয়ে বাসার বাইরে আসার কারণ  জানতে চাওয়া হচ্ছিল। তবে মুভমেন্ট পাস চাইতে দেখা যায়নি পুলিশ সদস্যদের। বিভিন্ন অলিগলিতে কাপড়ের দোকান খুলতে দেখা গেছে। রামপুরা এলাকার এক ব্যবসায়ী বলেন, লকডাউন ঘোষণা করা হলেও সবকিছুই ঢিলেঢালাভাবে চলছে। শুধু কাপড়ের দোকানে আর গণপরিবহনে আপত্তি। কিন্তু লোকজনতো ঠিকই বাসার বাইরে বের হচ্ছে। তাহলে এই লকডাউন দিয়ে কী হবে।

সামনে ঈদ, এই মুহূর্তে বেচাবিক্রি না হলেও সারা বছর অর্থকষ্টে যাবে। তাই সুযোগ পেলে দোকান খোলার চেষ্টা করেন তিনি। খিলগাঁও তালতলা এলাকায় রাত ৮টার দিকে পিকআপযোগে মাইকিং করছিল থানা পুলিশ। দোকান বন্ধ করতে ও বিনা প্রয়োজনে মানুষকে বাসার বাইরে না থেকে বাসায় চলে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছিল। এ সময় আশপাশের দোকানগুলো বন্ধ করলেও জনসমাগম কমেনি মোটেও। খিলগাঁও থানার পাশেই শতাধিক যুবক মার্কেট ও বিভিন্ন বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়ে, সিঁড়িতে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। কেউ কেউ সিগারেট, চা পান করছিল। একই অবস্থা দেখা গেছে, শহীদ মিনার ও টিএসসি এলাকায়। তরুণ-তরুণীরা সেখানে বসে আড্ডা দিচ্ছিল।

অনেককে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়েও হাঁটতে দেখা গেছে ধানমণ্ডি ও ঝিগাতলা এলাকায়। এমনকি বন্ধু-বান্ধবীরা আড্ডা দিচ্ছিলেন। ধানমণ্ডি ১৫ নম্বর রোডে কথা হয় দুর্জয় হাসানের সঙ্গে। তেজগাঁও এলাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওই কর্মকর্তা জানান, লকডাউন শুরুর পর হোম অফিস করছেন। সারাদিন বাসায় থাকতে অসহ্য লাগে। তাই বিকাল বেলা সবাইকে নিয়ে বের হন। ওই কর্মকর্তা ও তার পরিবারের সদস্যরা মাস্ক ব্যবহার করলেও অনেকের মুখেই মাস্ক ছিল না। কারো কারো মাস্ক ছিল থুতনিতে ঝুলানো।

লকডাউনে পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি সোহেল রানা বলেন, পুলিশ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছে। নিজেদের অবস্থান থেকে লকডাউন সফল করতে পুলিশ সক্রিয়। তবে এক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষকে দেশ, দেশের মানুষ ও নিজেদের স্বার্থে সচেতন হতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। উল্লেখ্য, সরকারের ঘোষণা অনুসারে গত ১৪ই এপ্রিল থেকে শুরু হয় সর্বাত্মক লকডাউন। গতকাল ছিল প্রথম দফা সর্বাত্মক লকডাউনের শেষদিন। এরমধ্যেই সর্বাত্মক লকডাউনের মেয়াদ ২৮শে এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। গত মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘করোনাভাইরাস জনিত রোগ (কোভিড-১৯) সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আন্তর্জাতিক বিশেষ ফ্লাইট চলাচল, ব্যাংকিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখাসহ পূর্বের সকল বিধি-নিষেধ আরোপের সময়সীমা ২১শে এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ২৮শে এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত বর্ধিত করা হল। এর আগে গত ১৪ই এপ্রিল থেকে দেশে চলছে ‘সর্বাত্মক লকডাউন্থ শুরু হয় পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ২১শে এপ্রিল পর্যন্ত এসব বিধিনিষেধ কার্যকরের কথা বলা হয়েছিল। তার আগে করোনাভাইরাসের সংক্রমণরোধে সরকার ঘোষিত ১৮ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে গত ৫ই এপ্রিল থেকে সারা দেশে বিধিনিষেধ জারি করা হয়।

নির্দেশনা অনুসারে জরুরি পণ্যবাহী পরিবহন ছাড়া রাস্তাঘাটে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়ারও নির্দেশনা ছিল। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিষেধাজ্ঞার দ্বিতীয় দিন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘোষণা দেন, দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬ই এপ্রিল থেকে সকাল সন্ধ্যা গণপরিবহন চলবে। তবে আন্তঃজেলা বাস চলাচল বন্ধ থাকবে। পরবর্তীতে করোনার সংক্রমণ রোধে সরকার ঘোষিত এক সপ্তাহের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ১১ই এপ্রিল শেষ হলেও এর মেয়াদ বাড়িয়ে ১২ ও ১৩ই এপ্রিল পর্যন্ত করা হয়। নিষেধাজ্ঞা শেষে ১৪ই এপ্রিল থেকে সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করে সরকার।