বাদশাহ হতে চান সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান তার পিতা বাদশাহ সালমান বেঁচে থাকতেই । নভেম্বরে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অনুষ্ঠেয় জি-২০ সম্মেলনের পূর্বেই তিনি বাদশাহ হিসেবে আসীন হতে চান। কিন্তু তার চাচা প্রিন্স আহমেদ বিন আবদেল আজিজ এতে সায় দেননি। সে কারণেই চাচাকে গ্রেপ্তার করেছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদ মাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর সম্পাদক ডেভিড হার্স্ট এক প্রতিবেদনে এসব জানিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, পিতার মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান না মোহাম্মদ বিন সালমান। কেননা, পিতা যতদিন বেঁচে আছেন, ততদিন ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে তার বাদশাহীর দাবির গোড়া শক্ত থাকবে। এ কারণেই নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনের আগে আগেই সিংহাসনে বসতে চান এমবিএস হিসেবে পরিচিত এই ক্রাউন প্রিন্স।

বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, বাদশাহ’র স্মৃতিভ্রম বা ডিমনেশিয়া রোগ আছে। এছাড়া তিনি সুস্থ। ক্রাউন প্রিন্স তার পিতাকে সিংহাসন ছেড়ে দিতে বাধ্য করবেন।
হার্স্ট লিখেছেন, নিজের চাচাতো ভাই প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ক্রাউন প্রিন্স পদ থেকে অপসারণ করে যে কাজ শুরু করেছিলেন এমবিএস, পিতাকে অপসারণ করে সিংহাসনে বসে সেই কাজ শেষ করবেন তিনি। একটি সূত্র তাকে বলেছে, ‘এমবিএস নিশ্চিত হতে চান যে, তিনি যখন বাদশাহ হবেন তখন তার পিতা জীবিত থাকবেন।’
শুক্রবার বাদশাহ সালমানের একমাত্র জীবিত ভাই প্রিন্স আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পূর্বে তাকে শেষবারের মতো এমবিএস’র পক্ষাবলম্বন করার প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। মূলত, নতুন বাদশাহ নিয়োগ দেয়ার জন্য যে অ্যালিজিয়েন্স কাউন্সিল রয়েছে, তার সদস্য প্রিন্স আহমেদ। এ কারণেই তার সমর্থন অত্যন্ত জরুরি এমবিএস’র।
দ্বিতীয় একটি সূত্র জানায়, এমবিএসকে পূর্ণ সমর্থন দেয়ার জন্য প্রিন্স আহমেদের ওপর চাপ ছিল। তিনি সম্প্রতি নিজের বড় ভাই অর্থাৎ বাদশাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে সালমান ও অন্যরা ভদ্রোচিতভাবে তাকে বলেন এমবিএসকে পূর্ণ সমর্থন দেয়ার জন্য। কিন্তু আহমেদ স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি এ প্রকল্পে সায় দেবেন না। তিনি কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি বাদশাহকে বলেন, তিনি নিজে বাদশাহ হতে চান না। কিন্তু কেউ এগিয়ে এলে তাকে সমর্থন দেবেন।
এদিকে প্রিন্স আহমেদের গ্রেপ্তার নিয়ে বিস্তারিত তথ্য আসতে শুরু করেছে। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, প্রিন্স আহমেদের বিরুদ্ধে যে অভ্যুত্থান চেষ্টার অভিযোগ করা হয়েছে, তা সঠিক নয়। শুক্রবার সকালে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি এ ধরণের কোনো কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন না। কেননা, তার এই ধরণের ক্ষমতাই ছিল না। তারা জানান, ‘বাদশাহ সালমান মারা গেলে প্রিন্স আহমেদ অ্যালিজিয়েন্স কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে প্রকাশ্যেই এমবিএস’র সিংহাসনে আরোহনের বিরোধিতা করতেন। তিনি প্রকাশ্যেই না বলতেন। অভ্যুত্থান চেষ্টার কিছু ছিল না এখানে।’
একটি সূত্র জানিয়েছে, বিদেশ থেকে বাজপাখি শিকার করে মাত্রই দেশে ফিরেছিলেন প্রিন্স আহমেদ। বৃহস্পতিবার রাতে তিনি নিজের ঘনিষ্ঠজনদের জন্য বিশেষ আয়োজন করেছিলেন। তখনই তার কাছে বার্তা যায় যে, শুক্রবার সকালে তাকে ডেকেছেন বাদশাহ সালমান। তখন বলা হয়েছিল, বাদশাহ আগেই গ্রেপ্তার হওয়া আরেক প্রিন্স ফয়সাল বিন আবদেল রহমানের বিষয়ে কথা বলতে তাকে ডেকেছেন। প্রিন্স ফয়সালের বিষয়টি কয়েক সপ্তাহ আগে বাদশাহকে বলেছিলেন তিনি।
সে অনুযায়ী, শুক্রবার সকালে প্রিন্স আহমেদ রাজ প্রাসাদে নিজের নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে প্রবেশ করেন। কিন্তু বাদশাহ’র কক্ষে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সূত্রগুলো জানায়, ‘তিনি বাদশাহকে দেখতেই পাননি। তার সঙ্গে পুরোপুরি বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে।’ ওই সূত্র জানিয়েছে, অ্যালিজিয়েন্স কাউন্সিলের আরেক সদস্যও একই সঙ্গে আটক হয়েছেন।
ট্রাম্পও ইস্যু
কেন এই ধরপাকড় এই মুহূর্তেই শুরু হয়েছে? সূত্রগুলো এক্ষেত্রে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন যে, এমবিএস উদ্বিগ্ন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হয়তো দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসবেন না। আর ডেমোক্রেটিক দলের প্রত্যেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থীই এমবিএস’র কড়া সমালোচক। তারা প্রকাশ্যেই সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকা-ের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু ট্রাম্প বা তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ওই হত্যাকা-ের জন্য কিছুতেই এমবিএসকে জবাবদিহিতার আওতায় আনেননি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই অনুসিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, হত্যার নির্দেশদাতা এমবিএস ছিলেন। কিন্তু তারপরও এফবিআই বা জাতিসংঘকে এই হত্যা তদন্তের অনুমতি দিতে রাজি হয়নি ট্রাম্পের প্রশাসন।
দ্বিতীয়ত, কিছু সূত্র দাবি করেছে যে, আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ বা এমবিজেড, যিনি এমবিএস’র দীক্ষাগুরু হিসেবে পরিচিত এবং যার কারণে এমবিএস ট্রাম্প শিবিরে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন, তিনিও এই সাম্প্রতিক ধরপাকড়ে সম্পৃক্ত।
এমবিজেড-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্লগার হামেদ আল-মাজরুয়ি ২০১৭ সালে রিটজ কার্লটন হোটেলে এমবিএস’র হাতে সৌদি রাজ পরিবারের একাধিক সদস্য ও শ’ শ’ ব্যবসায়ী আটক হওয়ার খবর সর্বপ্রথমে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি এর আগে কাতারের সঙ্গে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক বিচ্ছেদের খবরও সবার আগে প্রকাশ করেন। এবারের ধরপাকড় জনসম্মুখে আসার আগেই তিনি টুইটারে শুধু দুই শব্দে লিখেছেন: চেক মেট। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি এ ব্যাপারে জানতেন।
একটি সূত্র বলেছে, ‘এমবিএস’র প্রত্যেকটি পদক্ষেপে কলকাঠি নাড়েন এমবিজেড। এমবিএস যত ভুল করেন, ততই অস্থিতিশীলতা শুরু হয়। আর ততই এমবিজেড-এর হাতে সৌদি ইস্যুতে ক্ষমতা বাড়ে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, এছাড়াও সম্প্রতি তেলের পড়তি দর, সংস্কার কার্যক্রমে ভাটা, করোনাভাইরাস আতঙ্ক- সব মিলিয়ে এবারই পরিস্থিতি নিজের জন্য মোক্ষম মনে করেছেন এমবিএস।

Share Now
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031