পুরো রাজধানী যেন বাসস্ট্যান্ড

12

বনানী-বিমানবন্দর সড়কে দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে গণপরিবহন। গত রোববার সকাল সাড়ে ৯টা। খিলক্ষেত ফুটওভার ব্রিজের উত্তর পাশে সড়কের মাঝে হঠাৎ থামলো গাজীপুর পরিবহনের একটি বাস। ভেতর থেকে নামছেন ২ নারী ও এক শিশু যাত্রী। তখনো সড়কের মাঝে দাঁড়ানো বাসের দুই পাশ দিয়েই উত্তরার দিকে ছুটে চলেছে পেছনে থাকা গণপরিবহনগুলো। গাজীপুর পরিবহনও স্থান ত্যাগ করলো। তখনো সড়কের মধ্যবর্তীস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন বাস থেকে নামা যাত্রীরা। শিশুটিকে কোলে তুলে তারা বার বার হাত তুলে ইশারা করছেন চলন্ত বাস, কাভার্ডভ্যান, প্রাইভেটকার ও মোটরবাইক থামানোর জন্য।

তাদের উদ্দেশ্য সড়কের এক পাশে যাওয়া। শিশুটি ভয়ে কান্না করছে। আশপাশের মানুষজন সেদিকে তাকিয়ে আছেন। এভাবে কেটেছে প্রায় মিনিট খানেক। পরক্ষণে তুরাগ পরিবহনের একটি বাস তাদের সামনে এসে ব্রেক কষে। তারা সড়কের এক পাশে যান। তাদের একজন সোনিয়া আক্তার। মানবজমিনকে তিনি বলেন, অল্পের জন্য আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়েছেন। বাসের ড্রাইভার আমাদের রাস্তার ওপর নামিয়ে দিয়েছেন। তাদেরকে অনেক বার বলেছি সাইট করে নামানোর জন্য। তারা আমার কথা শুনলো না। এমন চিত্র রাজধানীতে নিত্যদিনের ঘটনা। রাজধানী ঢাকা শহরের প্রত্যেকটি সড়কেই অহরহ ঘটছে এমনটি। এতে করে ঘটছে দুর্ঘটনা। ঘটছে মৃত্যু। অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করছেন।

গত সোমবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত রাজধানীর মৌচাক এলাকা ঘুরে দেখা যায়, স্থানটিতে যাত্রী ওঠানোকে কেন্দ্র করে গণপরিবহনগুলোর চলে প্রতিযোগিতা। কার আগে কে যাত্রী তুলবেন তার জন্য অনেকটা বেপরোয়া হচ্ছেন বাস চালকরা। এ সময় দেখা যায়, ফরচুন মার্কেটের সামনে থেকে যাত্রী তুলছেন লাব্বাইক পরিবহনের একটি বাস। হঠাৎ পেছন থেকে একই কোম্পানির আরেকটি বাস সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে বাসের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা একজন আরেকজনের ওপর পড়েন। কেউ কেউ বাসে সিটের সঙ্গে মাথায় আঘাত পান। বাসে উঠন্ত যাত্রীরা ছিটকে সড়কের ওপর পড়ে যান। এ সময় কয়েকজন যাত্রী বাস চালকের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। সরজমিন করোনা মহামারির এই দুঃসময়ে গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রী পরিবহনের কোথাও কোনো অস্তিত্ব দেখা যায়নি। প্রায় প্রতিটি বাসেই ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে। বাস স্টাফরা মানছেন না কোনো নিয়ম কানুন। যাত্রীবাহী গণরিবহনগুলো নির্ধারিত স্থানে যাত্রী পরিবহন করতেও দেখা যায়নি। চালকদের ইচ্ছানুযায়ী সড়কের মধ্যবর্তী স্থানেই যাত্রী ওঠা-নামার কাজ সেরেছেন অনেকে। সড়কের মাঝে যাত্রী ওঠা-নামার সময় দুই পাশ দিয়ে গণপরিবহন ও মোটরবাইক যেতে দেখা গেছে। ফলে যাত্রীরা বাস থেকে নামতে চাইলেও পারছেন না। এতে চালক ক্ষিপ্ত হয়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নিয়ে নামান। আয়াত বাসের চালক মুজিবুর রহমান বলেন, সবাই দ্রুত যেতে চায়। যাত্রীদের যথাসময়ে পৌঁছে দিতে গিয়ে গ্যাপের মধ্যদিয়ে যেতে হয়। এতে করে অনেক সময় যাত্রীদের নির্ধারিত স্থানে নামানো যায় না। এ ছাড়া যাত্রীরা যেখানে সেখানে নামতে চান। নানা রকম কথা বলেন। এতে আমাদের মাথা ঠিক থাকে না। করোনা আছে সেটা তো আমরা যেমন জানি, যাত্রীরাও তো জানেন। তারপরেও যাত্রীরা বাসে ওঠেন। যাত্রীরা করোনার মধ্যে বাসে ঝুলে যেতে চাইলে আমরা না বলবো কেন?

মোহাম্মদপুর থেকে আসা স্বাধীন পরিবহনের যাত্রী ব্যবসায়ী নুরুন্নবী জানান, আমি মোহাম্মদপুর থেকে বাসে উঠেছি। পুরো রাস্তায় চালক বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়েছে। বাসের ভেতর দাঁড়িয়ে অনেক যাত্রী নিয়েছে। মহিলা যাত্রীরাও দাঁড়িয়ে যাতায়াত করছেন। আমি মগবাজার ওয়্যারলেসে নামবো, বাসের ড্রাইভার আমাকে সেখানে নামায়নি। যাত্রী বেশি থাকায় আমিও নামতে পারি নাই। মৌচাক এসে নামিয়েছে। তাও সড়কের মাঝে। উল্টো বাসস্টাফ আমার সঙ্গে বাজে ভাষায় গালমন্দ করেছে। তারা বলছে ২০ টাকা ভাড়া দিয়ে পুরো বাস কিনে নিয়েছি নাকি। অন্যথায় ব্যক্তিগত গাড়িতে করে চলতে বললেন।

গুলিস্তান জিরো পয়েন্টের পাশে বসে কান্না করছেন সালেকা নামের এক মধ্য বয়স্ক নারী। তিনি জানান, গুলিস্তানে বাসে ওঠার সময় একাধিক লোক এক সঙ্গে ওঠে। আমি আমার ছেলেকে বাসে ওঠালেও আমি উঠতে পারিনি। আমি ওঠার আগেই বাস ছেড়ে দিয়েছে। আমার ছোট ছেলের বয়স ১৪ বছর। উত্তরা যাবো। ছেলের সঙ্গে মোবাইল ফোন নেই। কি করে তাকে খুঁজবো। বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠা-নামার কাজ করলে এমনটি হতো না। রাজধানীর ফার্মগেটে দেখা যায়, ফুটওভার ব্রিজের নিচে বিআরটিসি বাসে যাত্রী তুলছেন হেলপার। গাবতলী থেকে আসা বিআরটি’র আরেকটি বাস সেখানে আসলে চলে দুই বাসের রেষারেষি। দুই বাসের রেষারেষিতে লুকিং গ্লাস ভেঙে পড়তেও দেখা গেছে। স্থানটিতে দেখা যায় একই কোম্পানির বাস স্টেশনে থাকলে চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়ে যায়।

বিআরটি বাসের চালক শহিদুল হক বলেন, যাত্রী ওঠানোকে কেন্দ্র করে প্রায় এমন প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। সামনে থাকা বাস আড়াআড়িভাবে রেখে যাত্রী ওঠা-নামানোর কাজ করে। এতে পেছনের বাস আর সামনে আসতে পারে না। ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে বাসের সঙ্গে বাস ধাক্কা দেয়, এবং বডিতে আঘাত করে। এতে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া করোনায় বাসে কোনো নিয়ম চলে না। বাসের সিট থেকে একজন উঠলে একজন বসে। বসার জন্য অনেকই মারামারি পর্যন্ত করে। এখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব না। দিশারী পরিবহনের কন্ডাক্টর মো. নিয়াজ বলেন, রাস্তায় যানজটের কারণে বেশি ভাড়া মারা যায় না। বাসের ভাড়া ওঠাতেই আমাদেরকে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে হয়। মালিকগণ রাত হলেই জমার টাকা চান। তাদের নির্ধারিত পরিমাণ জমাকৃত টাকা দিতে না পারলে আমাকে আর বাস দিবে না। তাই বাধ্য হয়েই করোনাকালীন সময়েও দাঁড়িয়ে যাত্রী পরিবহন করি। গত মঙ্গলবার দুপুরে বাংলামোটরে দেখা যায়, সিগন্যালে বাস থামানোর সংকেত দিচ্ছেন ট্রাফিক। শিকড় পরিবহনের একটি বাস সেই সংকেত না মেনেই ট্রাফিক পুলিশের পাশ কাটিয়ে যাত্রী নিয়ে ছেড়ে গেল। একই পরিবহনের আরেকটি বাস চলন্ত অবস্থায় যাত্রী ওঠা-নামানোর কাজ করছেন। কন্ডাক্টর বাসে ঝুলে এক হাত নেড়ে নেড়ে শাহবাগ, পল্টন, মৎস্য ভবন বলে যাত্রী ডাকছেন। কয়েকজন যাত্রী লাফিয়ে লাফিয়ে বাসে উঠছেন। এ সময় দেখা যায় প্রায় সকল বাসেই অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয়েছে। এদিন দুপুরে যাত্রাবাড়ী থেকে ছেড়ে আসা ৮ নম্বর একটি বাস পল্টন মোড়ে থামানো হয়। পুরো বাসটি যাত্রীতে ভরপুর। বাসে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারেছেন না বলে যাত্রীরা ভেতরে থেকে ডাক-চিৎকার করছেন। বাসটি থামালে সেখানে ৩ জন যাত্রী নামতে দেখা যায়। পরক্ষণে একই বাসে ডেকে ডেকে আরো ৬ জন যাত্রী তুলতে দেখা গেছে। কয়েকজন যাত্রীকে এ সময় ঝুলতে দেখা গেছে।

বাংলামোটরে পুলিশ বক্সের সামনে দায়িত্ব পালন করছেন সার্জেন্ট সাব্বির। মানবজমিনকে বলেন, আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি গণপরিবহনগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার। কিছু চালক আইন মানতে চান না। রাজধানীতে প্রায় প্রতিটি স্টেশনে বাস স্টপেজ আছে। সেখানে যাত্রী ওঠা-নামানোর কথা। আমার সেটা বাস্তবায়নে কাজ করছি। যেখানে সেখানে বাসের গেট খোলা রাখলে কিংবা খুলে যাত্রী ওঠা- নামানোর কাজ করলে আইনের আওতায় আনছি।