প্রমাণ করা যায়নি ৭০ শতাংশ অভিযোগই

21

বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান ও তদন্তাধীন দুর্নীতির অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়ে । প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিভিন্ন মাধ্যম থেকে পাওয়া অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে মাত্র ৪ শতাংশ অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা হয়। আবার সেই চার শতাংশ অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে তার অন্তত ৭০ শতাংশ অভিযোগই প্রমাণ করা যায়নি। নিষ্পত্তি হয়েছে। যাকে দায়মুক্তি বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ যার বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধানে ছিল তিনি নির্দোষ হিসেবে নিষ্কৃতি পেলেন। বাকি যে ৩০ ভাগ মামলা পর্যায়ে গড়ায় সেখান থেকে অর্থাৎ মামলা হওয়ার পরও ৩০ ভাগ মামলায় চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়। দুর্নীতির অনেক অভিযোগ আবার তদন্তের জন্য অন্যান্য সংস্থায় পাঠানো হয়, যার মধ্যে সম্পদের অভিযোগও রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২০-২০২১) পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি কমিশন ওই প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির হাতে হস্তান্তর করে। আংশিকভাবে ২০১৯ সালের কিছু তথ্য প্রতিবেদনে থাকলেও ২০২০ এবং ২০২১ সালের পূর্ণাঙ্গ তথ্য তাতে তুলে ধরা হয়। অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে চার্জশিট দাখিল পর্যন্ত নানা ধাপে দুদকের কর্মকাণ্ডের বিবরণ তাতে তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে দেখা যায়- ২০২০ ও ২০২১ সালে প্রতিকার চেয়ে দুদকে ৩৩ হাজার ২৭৮টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ২০২০ সালে ১৮ হাজার ৪৮৯টি এবং ২০২১ সালে ১৪ হাজার ৭৮৯টি। ২০২০ সালে দাখিল হওয়া অভিযোগের মধ্যে দেশের মানুষ লিখিতভাবে অভিযোগ করেন ১১ হাজার ৯৫টি। সরকারি দপ্তর থেকে আসে ৫৮৭টি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৭০টি, গণমাধ্যম থেকে নেওয়া হয় ১ হাজার ২২৪টি, দুদকের বিভাগীয় কার্যালয় হতে আসে ১ হাজার ৪৯৭টি, দুদক এনফোর্সমেন্ট টিমের মাধ্যমে ৯৬১টি এবং ইমেইলসহ ডিজিটাল মাধ্যমে আসে ২ হাজার ৭৭৩টি। অপরদিকে ২০২১ সালে জনসাধারণের কাছ থেকে সরাসরি ৮ হাজার ৯০৯টি অভিযোগ আসে। সরকারি সংস্থা থেকে আসে ৫৪২টি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আসে ২৯৭টি, গণমাধ্যম থেকে নেওয়া হয় ৯৪৩টি, দুদকের বিভাগীয় কার্যালয় থেকে আসে ১ হাজার ১২৭টি, দুদক এনফোর্সমেন্ট টিমের কাছ থেকে আসে ১ হাজার ৪২টি এবং ইমেইলসহ ডিজিটাল মাধ্যমে আসে ১ হাজার ৯৩০টি। এর বাইরে কিছু অভিযোগ পাওয়া যায় দুদকের হটলাইন থেকে।

এতে দেখা যায়- ২০২০ সালের অভিযোগের মধ্যে দুদকের যাচাই-বাছাই কমিটির মাধ্যমে বাছাই করা অভিযোগের অনুসন্ধান করে ফল পাওয়া যাবে এমন অভিযোগ বাছাই করা হয় মাত্র ৮২২টি। আর নথিভুক্ত করা হয় ১৫ হাজার ১৯৮টি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয় ২ হাজার ৪৬৯টি। ২০২০ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট অভিযোগের মাত্র ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য নেওয়া হয়, যার সংখ্যা ৮২২টি।

২০২০ সালে দুদকের হাতে মোট অনুসন্ধান চলমান ছিল ৫ হাজার ১৭টি। এর মধ্যে অনুসন্ধান নিষ্পত্তি হয় ১ হাজার ২৯৪টি। মামলা হয়েছে ৩৪৮টি। এ ছাড়া অন্যভাবে নিষ্পত্তিসহ বাকি ৯৬৯টি অভিযোগের পরিসমাপ্তি বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়। এই তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মামলা দায়েরের হার ২৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। আর পরিসমাপ্তি বা দায়মুক্তির হার ৭৩ দশমিক ১০ শতাংশ।

অপরদিকে অবৈধ সম্পদের মামলার বিষয়ে যে তথ্য রয়েছে তাতে দেখা যায়, ২০২০ সালে অবৈধ সম্পদসংক্রান্ত অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়, ৫১৩টি। এ ছাড়া কমিশনের হাতে বিগত বছরের সম্পদের অনুসন্ধান ছিল ১ হাজার ১৭৬টি। এ হিসাবে সম্পদের মোট অনুসন্ধান চলমান ছিল ১ হাজার ৬৮৯টি। এর মধ্যে কমিশন ২০২০ সালে অনুসন্ধান শেষ করে ৪২৪টি। নিষ্পত্তিকৃত ৪২৪টির মধ্যে মামলা হয়েছে ১০৯টি। এ হিসাবে দেখা যায়, মামলা হয়েছে ২৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। অপরদিকে ৭৪ দশমিক ৩০ ভাগই অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে ২০২১ সালে অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান ছিল ১ হাজার ৭৯৬টি। এর মধ্যে ওই বছর অনুসন্ধান সম্পন্ন হয় ৪১৮টির। আর অনুসন্ধান শেষে মামলা হয় ১৫৪৭টি। এটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৩৭ দশমিক ৫০ ভাগ মামলা হয়েছে। প্রমাণ পাওয়া যায়নি ৬২ দশমিক ৫০ শতাংশের।

একইভাবে ২০২১ সালে অভিযোগ পাওয়া যায় ১৪ হাজার ৭৮৯টি। এর মধ্যে ৫৩৩টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য নেওয়া হয়। ২ হাজার ৮৮৯টি অভিযোগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে পাঠানো হয়। বাকি ১১ হাজার ৩৬৭টি অভিযোগ সুনির্দিষ্ট ও তথ্যভিত্তিক না হওয়ায় নথিভুক্ত করা হয়। এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, মোট অভিযোগ থেকে অনুসন্ধানের জন্য নেওয়া হয় মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আর প্রাপ্ত অভিযোগের ৯৬ দশমিক ৪০ শতাংশ আমলে নেওয়া হয় না।

২০২১ সালে আগের বছরের অনুসন্ধানসহ কমিশনের হাতে মোট অনুসন্ধান ছিল ৪ হাজার ৬১৪টি। এর মধ্যে অনুসন্ধান শেষ হয় ১৪৪টি। অনুসন্ধান শেষে কমিশন মামলা দায়ের করে ৩৪৭টি। এ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট অনুসন্ধানের মধ্যে মামলা দায়েরের হার ৩৩ দশমিক ২৩ শতাংশ। আর বাকি ৬৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ নথিজাত বা নথিভুক্ত করা হয়। আর দুই বছরের পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়ে গড়ে অনুসন্ধান শেষে মামলা হয়েছে ৩০ শতাংশের মতো। আর দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে ৭০ শতাংশ অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

মামলার তদন্ত কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পূর্ববর্তী বছরে অনিষ্পন্ন তদন্তসহ ২০২০ সালে মোট তদন্ত ছিল ১ হাজার ৭৯৬টি। কমিশন থেকে ২০২০ সালে ৩২৯টি তদন্ত শেষ করা হয়। এসব তদন্তের ওপর ভিত্তি করে ২২৮টি মামলায় চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমতি দেয় কমিশন। বাকি তদন্তগুলোর মধ্যে ৮৪টি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়। আইনি বাধ্যবাধকতায় ১৭টি তদন্ত অন্য সংস্থায় পাঠানো হয়। এ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চূড়ান্ত প্রতিবেদনের হার ৩৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ। বাকি প্রায় ৬৩ শতাংশ মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে।

প্রতিবেদনে ২০২১ সালের তদন্তের ব্যাপারে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী বছরগুলোতে অনিষ্পন্ন তদন্তসহ ২০২১ সালে মোট তদন্ত সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮৭৩টি। এর মধ্যে কমিশন এ বছর ৪২৪টি তদন্ত শেষ করে। এর মধ্যে ২৬০টিতে চার্জশিট দাখিল করে। বাকি ১৩২টির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের অনুমতি দেওয়া হয়। আইনি বাধ্যবাধকতায় ৩২টি তদন্ত অন্য সংস্থায় প্রেরণ করা হয়। এ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১ সালে মোট তদন্তের মধ্যে ৩১ দশমিক ১৩ শতাংশ মামরায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে কমিশন। আর বাকি প্রায় ৬৯ শতাংশ মামলায় অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দাখিল করেছে।

এদিকে প্রতিবেদনের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত মামলার তদন্তসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সম্পদসংক্রান্ত মোট ৪২৮টি তদন্তের মধ্যে ২০২০ সালে নতুন ১২৬টি তদন্ত গৃহীত হয় এবং অবশিষ্ট ৩০২টি তদন্ত বিগত বছরসমূহের। কমিশন ২০২০ সালে সম্পদসংক্রান্ত ৭১টি তদন্ত সম্পন্ন করেছে এবং এর মধ্যে ৫৬টিতে চার্জশিট দাখিল করেছে। ১১টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় এবং বাকি ৪টি তদন্ত অন্য সংস্থায় প্রেরণ করা হয়। এ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সম্পদের মামলায় কমিশন চার্জশিট দাখিল করে ৭৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর বাকি প্রায় ২১ শতাংশ মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদসংক্রান্ত মোট ৪৮৯টি তদন্তের মধ্যে ২০২১ সালে নতুন করে গৃহীত হয় ১৩২টি তদন্ত। এ সময় কমিশন সম্পদসংক্রান্ত ৯৯টি তদন্ত শেষ করে। এর মধ্যে ৭০টিতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। আর চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয় ২২টিতে। এ ছাড়া ৭টি তদন্ত অন্যান্য সংস্থায় প্রেরণের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।

এ তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কমিশন ২০২১ সালে সম্পদের মামলায় চার্জশিট দাখিল করে ৭০ দশমিক ৭০ শতাংশ মামলায়। বাকি প্রায় ৩০ শতাংশ মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

দুদকের আইন শাখার সাবেক মহাপরিচালক মাইনুল ইসলাম এ বিষয়ে আমাদের সময়কে বলেন, সময় এবং শ্রম বৃথা গেল। ইকবাল মাহমুদের সময় নথিভুক্তের পরিবর্তে পরিসমাপ্তি হতো। অনুসন্ধানকারী ব্যস্ত ছিলেন। অনুসন্ধানে কিসের ভিত্তিতে নিলেন, যেসব ইন্ডিকেটর নিয়ে কাজ করছিলেন সেখানে সিলেকশনে ভুল ছিল। তাদের বাছাই ঠিক হয়নি। বাছাই প্রক্রিয়াকে আরও উন্নত হতে হবে। আরও নিশ্চিত হতে হবে। অনুসন্ধানকারীদের ব্যস্ত রাখা হলো। দুদকের নিজস্ব সোর্সভিত্তিক অনুসন্ধান হওয়া উচিত। বড় দুর্নীতির অনুসন্ধান দরকার। কোথাও থেকে অভিযোগ এলে ছায়া তদন্ত করে দেখে নেওয়া, কতটুকু ফসল আসবে। তদন্তের ক্ষেত্রে ৩১ শতাংশ ফাইনাল রিপোর্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই একই কারণে ২০১৯ সালে দুদকের বিধি সংশোধন করা হয়েছে। আগে তো যে কেউ থানায় গিয়ে মামলা দিয়ে আসতেন। ফলে ওই সুযোগ বন্ধে দুদক মামলা করার মতো উপাদান থাকলেই তদন্তে যাবে। ২৭ শতাংশ থেকে ৩১ শতাংশ চলে গেলে আর কী থাকে। মনে হচ্ছে তদন্ত ভালোভাবে হয়নি। কিংবা ছেড়ে দেওয়ার বিষয় থাকতে পারে। নিশ্চিত না হয়ে মামলা দিলে সময়ের অপচয়। তিনি বলেন, অন্যান্য সংস্থায় সম্পদের মামলা প্রেরণের সুযোগ নেই। এতে আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে পুরোটাই।

অনুসন্ধান পর্যায়ে ৭০ ভাগের অব্যাহতি পাওয়াসহ এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব মাহবুব হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই সাক্ষী পাওয়া যায় না। অভিযোগ থাকে বেনামি। প্রমাণ করা মুশকিল হয়ে পড়ে। যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা দরকার কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রতিরোধ শাখা এ বিষয়ে কাজ করছে।