বক্তাদের গোয়েন্দা নজরদারির পরামর্শ

38

একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে শীত মৌসুমে ওয়াজ মাহফিলে কোথায় কোন বক্তা যাচ্ছেন তা নজরদারি করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে । মধ্য ডিসেম্বরে এই প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটি জমা দেয়ার পর সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেয়া। নির্দেশনা অনুযায়ী জেলায় জেলায় অনুষ্ঠিত ওয়াজ মাহফিলে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নজরদারি শুরু করেছে। বিশেষ করে  যেসব বক্তা কৌশলে রাজনৈতিক বক্তব্য দেন বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার মতো উস্কানি দেন তাদের বিষয়ে মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক। এমন বক্তাদের মাহফিলে উপস্থিতি আগে থেকে আটকে দেয়া হচ্ছে।

মাহফিল অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের মাহফিলের বক্তা কারা, তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আছে কি-না বা এর আগে কোনো জেলায় বক্তব্য দিতে গিয়ে ওই এলাকায় হট্টগোল সৃষ্টি হয়েছে কি-না তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাহফিল হওয়ার আগেই খতিয়ে দেখছে। এ ছাড়াও বিতর্কিত বক্তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইউটিউবে আপলোড হওয়া বক্তব্যগুলোও নজরদারি করা হচ্ছে।

বগুড়া জেলার এসপি আলী আশরাফ ভূঞা গতকাল বিকালে জানান, ‘জেলায় অনুষ্ঠিত হওয়া মাহফিলগুলোতে সাদা পোশাকে পুলিশ নজরদারি করে।’ নোয়াখালীর এসপি মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন জানান, ‘বহু সতর্ক আছি। মাহফিলে কোনো বক্তাকে রাজনৈতিক এবং উগ্রবাদী বক্তব্য দিতে দিই না।  এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তরের সাধারণ নির্দেশনা রয়েছে।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে শীত মৌসুমে সারা দেশে মাহফিলের বিষয়ে অবগতকরণ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৌষ ও মাঘ মাসে শীতের মৌসুম থাকে। এ সময়ে গরম না থাকার কারণে দেশব্যাপী ইসলামী জলসা বা মাহফিলগুলো হয়। বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিম খানার উন্নয়নকল্পে, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন এসব মাহফিলের আয়োজন করে। এলাকার সর্বস্তরের জনগণ ওই মাহফিলে যোগ দেয়। মাহফিলগুলোতে ওই এলাকার জনপ্রতিনিধিরাও বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন। এসব মাহফিলগুলো স্ব-স্ব এলাকায় রীতিনীতিতে পরিণত হয়েছে। মাহফিলে অন্য জেলা থেকে আগত মাওলানারা বক্তব্য দেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওয়াজ শোনার জন্য এলাকার লোকজন ভিড় করছেন। দিনাজপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, পঞ্চগড়, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, সিলেট, নাটোর, সাতক্ষীরা, খুলনা, ঝিনাইদহ, বাগেরহাট, শেরপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনাসহ ২৮টি জেলায় মাহফিল বেশি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এতে বলা হয়, ৯০ এর দশকে ওইসব এলাকায় মাহফিলগুলোতে শুধু ধর্মীয় ইস্যুতে বক্তব্য দিতেন বক্তারা। কিন্তু, ওইসব এলাকায় সালাফিদের প্রভাব দিন দিন বিস্তার লাভ করার পর মাহফিলগুলোর বক্তারা বিভিন্ন বক্তব্যে দেশের ইস্যু টেনে নিয়ে আসেন। এতে এলাকাগুলোতে সরকারবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা হয়। মাহফিল শ্রবণকারীদের মধ্যে তীব্র ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। এতে ওইসব এলাকায় সাম্প্রদায়িক ও উগ্রবাদী  গোষ্ঠী দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বক্তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং তাদের ইউটিউব চ্যানেলে বক্তব্যগুলো আপলোড করার কারণে বক্তব্যগুলো সারা দেশসহ বিশ্বের বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে।

এতে বিদেশে থাকা বাঙালিদের মধ্যেও নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। চলমান ভাস্কর্য ইস্যুতে সারা দেশে ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে সালাফি মতবাদের বিশ্বাসী মাওলানারা উগ্রবাদী বক্তব্য দিয়ে তারা তাদের লোকজনকে উস্কে দিয়েছেন। এতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, হেফাজতে ইসলামের কওমি ধারার কিছু মাওলানাও ইদানীং দেশের বিভিন্নস্থানে ওয়াজে রাজনীতি এবং সরকারের নানা ইস্যুকে টেনে নিয়ে আসছেন। তবে তরিকত ও মারেফতে বিশ্বাসী বক্তারা তাদের বক্তব্যে রাজনীতি এবং দেশের চলমান ইস্যু টানেন না। এসব বক্তারা সিলেট এবং ময়মনসিংহ বিভাগে বেশি ওয়াজ করে থাকেন।

প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর করণীয় ও সুপারিশে বলা হয়েছে, যেসব জেলার এলাকাগুলোতে মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে সেসব এলাকার মাহফিলগুলোতে পুলিশসহ সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। মাহফিল অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের মাহফিলের বক্তা কারা, তার কোনো রাজনৈতিক পরিচয় আছে কি-না বা এর আগে কোনো জেলায় বক্তব্য দিতে গিয়ে ওই এলাকায় হট্টগোল সৃষ্টি হয়েছে কি-না তা কঠোরভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।

সুপারিশে আরো বলা হয়েছে, এসব তথ্যের সত্যতা থাকলে সঙ্গে সঙ্গে মাহফিল করতে নিষেধ করতে হবে মাহফিল কমিটিকে। যদি মাহফিলে কোনো জনপ্রতিনিধি উপস্থিত থাকার কথা থাকে তাহলে তাকে না আসার জন্য অবহিত করতে হবে। যদি মাহফিল কমিটি মাহফিল বন্ধ করতে রাজি না হয় তাহলে আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের মাধ্যমে তা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে হবে।