বাংলাদেশ কোভিডকালে বিশ্বমন্দা এড়াতে পেরেছে

5

উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় লাল-সবুজের নিশান নিয়ে আওয়ামী লীগ ‘বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সিঁড়ি’- বেয়ে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন। বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতিতে অনেক দেশে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলেও বাংলাদেশ তা অনেকটাই এড়াতে পেরেছে। ২০২০ সালের সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ
অর্থনীতির দেশ। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নোত্তর পর্বে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য বেগম রওশন আরা মান্নানের প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী লিখিত জবাবে আরও জানান, ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ এর ’ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবিল-২০২১’ রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন যে ধরনের অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি। এ রিপোর্ট মূলত সামনের বছর এবং আগামী ১৫ বছরে বিশ্বে কোন দেশের অর্থনীতি কী হারে বাড়বে তারই পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এই রিপোর্ট অনুযায়ী ২০৩৫ সাল নাগাদ ১৯৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ধাপ উপরে উঠে ২৫ নম্বরে পৌঁছে যাবে। ২০২০ সালের সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ।

সংসদ নেতা বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে জনগণের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, দেশের মানুষের বর্তমান মাথাপিছু আয় বেড়ে ২ হাজার ৬৪ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। যা ২০০৬ সালে মাত্র ৫৪৩ ডলার। তিনি বলেন, কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। কৃষিজমি কমতে থাকাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। ধান, গম ও ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। খাদ্যশস্য উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান দশম। বাংলাদেশ আজ চালে উদ্বৃত্ত দেশ। ২০১৯ সালে বিশ্বে মাছের উৎপাদনে সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে। এসব সাফল্য অর্জিত হয়েছে সরকারের সঠিক ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কারণে।

বঙ্গবন্ধুর নামে আন্তর্জাতিক পুরস্কার দেবে ইউনেস্কো: সরকারি দলের সংসদ সদস্য একেএম রহমতুল্লাহর প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, জাতিসংঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ’ইউনেস্কো-বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ইন দ্য ফিল্ড অব ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’- নামে একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ২০২০ সালের ১১ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কো নির্বাহী পরিষদের শরৎকালীন ২১০তম অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা জাতিসংঘের কোনো অঙ্গসংস্থা কর্তৃক এই প্রথমবারের মতো আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রবর্তন করা হলো। সংসদ নেতা জানান, প্রতি দুই বছর অন্তর এ পুরস্কার প্রদান করা হবে, যার আর্থিক মূল্যমান ৫০ হাজার ডলার। সমসাময়িককালে বহুল আলোচিত ও চর্চিত বিষয় ’সৃজনশীল অর্থনীতি’ অঙ্গনে এই আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রবর্তিত হলো। সৃজনশীল অর্থনীতি বিষয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি জুরি বোর্ড পুরস্কার বিজয়ী মনোনয়ন করবেন। জুরি বোর্ডের সদস্য নির্বাচন করবেন ইউনেস্কো মহাপরিচালক। সৃজনশীল অর্থনীতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এ পুরস্কার প্রদান করা হবে। প্রধানমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, বিশেষ করে যুব সমাজের উন্নয়নে সংস্কৃতিকর্মী, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা কর্তৃক গৃহীত ব্যক্তিক্রমধর্মী উদ্যোগকে স্বীকৃতি প্রদান করা হবে। পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে সমাজের অনগ্রসর নারী, অভিবাসী ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রাধান্য দেয়া হবে। প্রথমবারের মতো এই পুরস্কার ২০২১ সালের নবেম্বরে অনুষ্ঠেয় ইউনেস্কোর ৪১তম সাধারণ সভা চলাকালে প্রদান করা হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে এ অর্জন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। মহাপরিচালক ম্যাডাম অড্রে আজুলেসহ ইউনেস্কো নির্বাহী পরিষদের সকল সদস্যকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
বর্তমান সরকার উন্নয়নের সরকার: বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গার প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার উন্নয়নের সরকার। দেশকে ডিজিটালাইজড এবং মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে রূপকল্প-২০২১, দেশকে উন্নত দেশের কাতারে শামিলকরণের লক্ষ্যে রূপকল্প-২০৪১ এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সম্প্রতি ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০তে উচ্চতর পর্যায়ের ৩টি জাতীয় অভীষ্ট এবং ব-দ্বীপ সংশ্লিষ্ট ৬টি নির্দিষ্ট অভীষ্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। ব-দ্বীপ সংশ্লিষ্ট অভীষ্টসমূহ উচ্চতর পর্যায়ের অভীষ্ট অর্জনে অবদান রাখবে। উচ্চতর পর্যায়ের ৩টি জাতীয় অভীষ্ট হচ্ছে- ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য দূরীকরণ, উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন এবং ২০৪১ সাল নাগাদ একটি সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদা অর্জন।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন ব্রত হিসেবে নিয়েছি: সরকারি দলের অপর সদস্য হাবিবুর রহমানের প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা বানাতে চেয়েছিলেন। আমরাও সেটাকে আমাদের ব্রত বানিয়েছি। কোন তালিকায় আমাদের কি অবস্থান তার চাইতে আমাদের কাছে মুখ্য হলো আমার দেশের মানুষের মুখের হাসি। আমরা পৃথিবীর বুকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের গর্বিত বাঙালি হিসেবে মাথা উঁচু করে থাকতে চাই। তিনি জানান, ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিআইবিআর) গত ২৫শে ডিসেম্বর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লীগ টেবিল-২০২১ এ যে অর্থনৈতিক সূচক প্রকাশ করেছে তাতে বাংলাদেশ ২০২০ সালে ৪১তম, ২০২৫ সালে ৩৪তম, ২০৩০ সালে ২৮তম এবং ২০৩৫ সালে ২৫তম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে মর্মে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রবাসী অধ্যুষিত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনুরোধ জানিয়ে কোভিডকালে চাকরিচ্যুত প্রবাসীদের সার্বিক কল্যাণে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে ফোনে যোগাযোগসহ পত্র প্রেরণ করা হয়। উক্ত পত্রে তিনটি বিষয়ের উপর জোর দেয়া হয়। এগুলো হলো- চাকরিচ্যুত প্রবাসী কর্মীদের ন্যূনতম খাদ্য ও স্বাস্থ্য-সেবা নিশ্চিতকরণ, চাকরিচ্যুত কর্মীদের যাবতীয় দেনা-পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থাসহ ছয় মাসের বেতন-ভাতা প্রদান-পূর্বক দেশে ফেরত প্রেরণ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের বিদেশে কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য ঐসব দেশগুলো কোভিড-১৯ নিকভারি অ্যান্ড রেসপন্ড ফান্ড গঠনের সুপারিশ। তিনি জানান, করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত আসা প্রবাসীদের মধ্যে যারা পুনরায় সেসব দেশে ফেরত যেতে ইচ্ছুক, তাদের পুনরায় সেসব দেশে বা অন্য দেশে প্রেরণ ও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে।