অবরুদ্ধ জীবন কাটাচ্ছেন করোনার ভয়াল ছোবল থেকে প্রাণে বাঁচতে মালয়েশিয়ায় থাকা লাখ লাখ বাংলাদেশি এক মাসের বেশি সময় ধরে । রাষ্ট্র নির্ধারিত মুভমেন্ট কন্ট্রোল অর্ডার বা এমসিও’র কারণে তারা কাজকর্মহীন- বেকার। অর্থ ও খাদ্য সঙ্কটে অছেন অনেকে। কিন্তু তারা নিজ নিজ আবাসস্থলে অবস্থান করছে অনেকটা বাধ্য হয়ে। খাবার আর ওষুধ কেনা ছাড়া তাদের বাইরে বের হওয়া সম্পূর্ণভাবে নিষেধ। দেশটির আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এতোটাই কঠোর যে একদিনে ৪ হাজার লোককে এমসিও ভঙ্গের দায়ে কাঠগড়ায় তুলেছে তারা।  শাস্তি হিসাবে তাদের কাছ  থেকে  আদায় করা হয়েছে মোটা অঙ্কের জরিমানা। অবশ্য শুরু থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সংক্রান্ত ‘মুভমেন্ট কন্ট্রোল অর্ডার’ বাস্তবায়নে সরকারের কঠোর মনোভাব এবং মানুষকে ঘরে থাকতে বাধ্য করায় দেশটি  সুফল পেতে যাচ্ছে। করোনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না এলেও তারা সফলতার খানিকটা কাছাকাছি।

আগামী ২৮শে এপ্রিল বিদ্যমান এমসিও’র ডেটলাইন, মানে লকডাউন শিথিল হওয়ার কথা।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, মালয়েশিয়ায় ৪ঠা ফেব্রুয়ারি প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। একজন বিদেশি প্রতিবেশি দেশে আন্তর্জাতিক সম্মলনে অংশ নিয়েছিলেন, সেখানে তিনি চীনের  প্রতিনিধির সংস্পর্শ পেয়েছিলেন। সেই সময়ে মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে ছিল টালমাটাল অবস্থা। নানা নাটকীয়তার পর ২৪ শে ফেব্রুয়ারি তুন ডাঃ মাহাথির মোহাম্মদ আচমকা পদত্যাগ করেন। ১ লা মার্চ নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন মুহিদ্দীন বিন হাজী মুহাম্মদ ইয়াসিন। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ওই কঠিন সময়েও বৈশ্বিক মহামারি করোনা প্রতিরোধে সদা সতর্ক ছিল মালয়েশিয়ার সিভিল প্রশাসন। পরিস্থিতি প্রতিকূলতার দিকে যাত্রা শুরু করলে দেশটির নতুন সরকার আরও কঠোর কর্মসূচী গ্রহণ করে। ১৮ই মার্চ  মালয়েশিয়ার সরকার করোনা যুদ্ধে দেশটির তেরটি রাজ্য এবং তিনটি ঐক্যবদ্ধ প্রদেশসহ দেশজুড়ে প্রায় লকডাউন ঘোষণা করে। একই সঙ্গে ব্যাপক করোনা টেস্ট কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। করোনা কেস সংক্রান্ত বৈশ্বিক মনিটরিং প্রতিষ্ঠানের হিসাব মতে, ১৮ই এপ্রিল পর্যন্ত মালয়েশিয়া মোট ১ লাখ ৮০০ র বেশি মানুষের করোনা পরীক্ষা করেছে। যার মধ্যে এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৪ শ ২৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। বাকী ৯৫ হাজারের ফল এসেছে নেগেটিভ। পরিসংখ্যান বলছে, বিভিন্ন দেশের মানুষের অবাধ যাতায়াত থাকা মালয়েশিয়াতে করোনা আক্রান্ত বিদেশি নাগরিকদের তালিকায় প্রথম অবস্থানে অর্থাৎ মালয়েশিয়াদের পরেই ইন্দােনেশিয়ার অবস্থান। ১০৮ জন ইন্দােনিয়ানের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এরপরেই আছেন ফিলিপিনো, ১০৪ জন। বাংলাদেশিদের অবস্থান হোস্ট কান্ট্রিসহ হিসাব করলে চতুর্থ, আর কেবল বিদেশিদের  মধ্যে তৃতীয়। মোট ৬৩ জন বাংলাদেশি করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন বলে নিশ্চিত করেছে কুয়ালালামপুরস্থ বাংলাদেশ মিশন।
মালয়েশিয়ায় এ পর্যন্ত ৮৯ জন করোনায় মারা গেছেন। বেশির ভাগই মালয়েশিয়ান। এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ইতালি, সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা ৩ শতাধিক বাংলাদেশির প্রাণ কেড়েছে। হাজার হাজার আক্রান্ত রয়েছেন। প্রতিদিনই মৃতের তালিকায় নতুন নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে!   

পুত্রজায়ায় বাংলাদেশ মিশনের ত্রাণের তালিকা এবং…:

করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ ঠেকাতে মালয়েশিয়া সরকারের ঘরে থাকা কর্মসূচী মুভমেন্ট কন্ট্রোল অর্ডারের কারণে কর্মহীন বাংলাদেশিদের একটি তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল পুত্রজায়ার বাংলাদেশ হাইকমিশন। সে মতে, মালয়েশিয়ায় অবস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনলাইনে  ‘খাদ্য চাহিদা ফরম’ পূরণের আহ্বান জানানো হয়। মিশন বলছে, প্রাপ্ত আবেদনসমূহ যাচাই বাছাই কালে দেখা যায় অনেকে একাধিক ফরম পূরণ করেছেন। অনেকে পরীক্ষা করার জন্য ফরম পূরণ করেছেন, অনেকে প্রয়োজন নাই জানাতেও ফরম পূরণ করেছেন। বাংলাদেশ মিশন সব ফরম যাচাই-বাছাই করে ৬৫০০ জনকে খাবার সহায়তা প্রদানের তালিকা প্রস্তুত করে। মিশনের দাবি মতে, ইতোমধ্যে ১৮ শ’র অধিক বাংলাদেশির নিকট খাদ্য সামগ্রী পৌঁছেছে। এ পর্যন্ত কুয়ালালামপুর, পুত্রজায়া এবং সেলাঙ্গর-এর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত ‘খাদ্য চাহিদা ফরম’ পূরণ করা বাংলাদেশি নাগরিকের আবাসস্থলে (বাসা-বাড়িতে) সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে  দাবি করে মিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়- অন্যদের নিকট পর্যায়ক্রমে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। মিশন জানায়, সরকারের কঠোর নিয়ম কানুন পালন করে এবং করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হবার আশঙ্কা মাথায় নিয়ে সহায়তা পৌঁছাতে খানিকটা বিলম্ব হচ্ছে। হাইকমিশন প্রদত্ত খাদ্য সহায়তা মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশি নাগরিকদের দোর গোড়ায় তা পৌঁছে দিচ্ছে। করোনা শনাক্তের কারণে কুয়ালালামপুরে লক ডাউন করা তিনটি ভবনে (সিটি ওয়ান প্লাজা, সেলাংগর ম্যানসন ও মালয়েশিয়ান ম্যানসন) অবস্থিত  বাংলাদেশি নাগরিকদের নিকটও খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে এবং করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের  চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। ঊল্লেখ্য, ত্রাণ সামগ্রীর বন্টন প্রশ্নে বাংলাদেশ মিশনের প্রতি নেটিজেনদের ক্ষোভ অাছে। তবে মিশন বলছে, মহা-দুর্যোগে যখন বাংলাদেশিদের সহযোগিতা তারা ক্ষুদ্র প্রয়াস চালাচ্ছেন তখনও বিভিন্ন কর্ণার থেকে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চলছে, যা খুবই দু:খজনক।

Share Now
September 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930