বাজেট বেড়েছে, তাতে আমাদের কী?

19

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট গত বৃহস্পতিবার উপস্থাপন করেন । এবার বাজেটে সংস্কৃতি খাতে ৫৮ কোটি টাকা বেশি ধরে জাতীয় সংসদে প্রস্তাব রাখা হয় ৬৩৭ কোটি টাকার। যা ব্যয় হবে সংস্কৃতি অঙ্গনের নানা কাজে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে শোবিজের তারকাদের রয়েছে নানা ক্ষোভ। এ নিয়ে ইতোমধ্যেই সাংস্কৃতি অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

এরই মধ্যে প্রস্তাবিত বাজেটের ন্যূনতম এক শতাংশ বরাদ্দের দাবিতে উদীচীর সংস্কৃতি কর্মী আজ শনিবার সমাবেশ ডেকেছে। বিকেল ৫টায় শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করবেন উদীচীর সভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমান। থাকবেন সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরাও।

তারা মনে করেন, এই প্রস্তাবিত বাজেট সংস্কৃতিবান্ধব নয়। এ বাজেট দেশের সংস্কৃতিকর্মীদের হতাশ করেছে। বর্তমান সরকার এবং সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বও বারবার তাদের বক্তব্যে নিজেদেরকে সংস্কৃতি বান্ধব হিসেবে উল্লেখ করে দেশে সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। কিন্তু সংস্কৃতিকর্মীরা অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করছেন যে, সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটাতে গেলে যে ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দরকার তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রতি বছরই বাজেটে সংস্কৃতি খাত অবহেলিত থেকে যাচ্ছে।

এদিকে, প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে অসচ্ছল শিল্পীদের আছে নানা ক্ষোভ। বেশির ভাগ শিল্পী বলেছে- বাজেট বেড়েছে, তাতে আমাদের কী? আর এমন প্রশ্ন উঠার পেছনে মূল কারণ- বিগত বছর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাজেটের যে টাকা বরাদ্দ (অসচ্ছল শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য) তার কোনো সুযোগ-সুবিধাই তারা পায়নি। আর সে কারণেই প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে তাদের ক্ষোভের শেষ নেই। যা তারা তুলে ধরেছেন দৈনিক আমাদের সময় অনলাইন’র কাছে।

শুরুতেই কথা বলেছেন, ‘দেশের লোকগানের জনপ্রিয় গায়ক কুদ্দুস বয়াতি। তার ভাষ্য, ‘বাজেটের এই টাকা আমি তো আর পাই না। যারা পাওয়ার তারা ঠিকই পায়। আমার মনে হয়, শিল্পীকলায় আমার নামই নাই। টাকা পাওয়া তো দূরের কথা। এমন আছে, সে একজন শিল্পী সে টাকা পায় আবার তার বউও টাকা পায়। অথচ তার বউ গান-বাজনার সঙ্গে জড়িত না। এটা হেরা হেরাই (তারা তারাই) ভাগ করে নিয়ে যায়।’

কাঙ্গালিনী সুফিয়ার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন তার মেয়ে পুষ্প বেগম। তিনি বলেন, ‘মাকে ওষুধ খাওয়ালে ভালো, না হলে খারাপ। আর ঘরে আয়ের পথও বন্ধ। কারণ ৭-৮ মা ধরে মা অসুস্থ, তাই কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারে না। তবে শিল্পীর ভাতার টাকা আম্মায় পায়, প্রতি বছর ৩৬ হাজার টাকা দেওয়া হয় আর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু এই টাকায় মায়ের ওষুধের খরচের পেছনেই চলে যায়। কিন্তু গত বছরের টাকা এখনো পায়নি। অন্যান্য আর কোনো সুযোগ-সুবিধা পাই না।’

প্রায় পাঁচ শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করা অভিনেত্রী নাসরিনের সময়টাও ভালো যাচ্ছে না। কাজকর্ম, স্টেজ শো কমে যাওয়াসহ নানা কারণে অর্থকষ্টে ভুগছেন এই অভিনেত্রী। পারছেন না সাহায্যের জন্য কারও কাছে হাত পাততে। একে সময়ের ব্যস্ত এই অভিনেত্রী এখন অনেকটাই কাজ শূন্য।

তার ভাষ্য, ‘করোনার সময় আমি এমন অর্থ কষ্টের মধ্যে পরেছিলাম, যে কারণে আমার মগবাজারে থাকা একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করতে হয়েছে। আমি শিল্পী সমিতি বা অন্য কোথাও থেকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পায়নি। এখন আমি ভাড়া থাকি। মাঝে দীর্ঘ সময় অসুস্থ ছিলাম। তখনো কেউ পাশে এগিয়ে আসেনি। এই বাজেট কী আমাদের জন্য? আমি যতটুকু জানি; সংস্কৃতি খাতের বাজেট শিল্প ও শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য দেওয়া হয়। কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত কোন টাকাই পাইনি। আমার মনে হয়, শিল্পী হিসেবে আমার নাম আছে কি-না সেটাও সন্দেহ। আমার মতো অনেক শিল্পীই আছে, যারা একটি টাকাও সরকারের পক্ষ থেকে পায় না। আমরা শিল্পীরা মানুষের দাঁড়ে দাঁড়ে হাত পাততেও পারি না। এখন নতুন বাজেটে বেশি টাকা প্রস্তাব রাখা হলে আমাদের কী কোনো উন্নয়ন হবে?’

বহুল আলোচিত সিনেমা ‘ঢাকা ৮৬’র চিত্রনায়িকা রঞ্জিতা কনা। ১৯৮৭ সালে সিনেমায় পা রাখা এই অভিনেত্রী নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রায় ২৯টি সিনেমাতে। অভিনয়ের পাশাপাশি করেছেন প্রযোজনাও। অথচ এই চিত্রনায়িকা বর্তমান সময় কাটছে অর্থকষ্টে। তার খোঁজও নেয় না এখন কেউ। শিল্পীর তালিকায় ভাতা তো দূরের কথা, বিপদেও তার পাশে এগিয়ে আসে না কেউ। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি থেকে নূন্যতম মূল্যায়নও করা হয় না তাকে।

এই অভিনেত্রীর ভাষ্য, ‘এখনও মরিনি, না মরে বেঁচে আছি। আগে একটা অফিসে ছিলাম, ছোট একটি পোস্টে চাকরি করতাম। এখন সেই কাজও নেই। আর সিনেমার মানুষরাও কোনো খোঁজ নেন না। নিজের বাড়ি ভাড়াও এখন ঠিকমত দিতে পারি না। আমাদের জন্য কোনো ভাতা কি সরকার রেখেছে, তা আমার জানা নেই। আমি জানি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সংস্কৃতিবান্ধব। তিনি যদি আমাদের মতো শিল্পীদের দিকে একটু নজর দিতেন। জানি তিনি খুব ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু যাদের উপর দায়িত্ব দেওয়া আছে তাদেরকে যদি বলে দিতেন; অসচ্ছল শিল্পীদের তালিকাটা যেন সঠিকভাবেই করা হয়। তাহলে হয়তো সত্যিকারের অসচ্ছল শিল্পীরা সরকারের সহযোগিতা পেত।’

প্রস্তাবিত নতুন বাজেট নিয়ে কথা বলেছেন যাত্রাশিল্পী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দে। তিনি বলেন, ‘যাত্রাশিল্পীদের নিয়ে আমি কাজ করছি বহুদিন ধরে। এই শিল্প এমনিতে অবহেলিত। এই শিল্পের মানুষজন মানবেতর জীবন-যাপন করছে। এটা নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী ভাইয়ের সঙ্গে বহুবার কথা বলেছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। আর গ্রামের প্রান্তিক বাউল, যাত্রা ও পালাগানের শিল্পীদের অবস্থা খুব খারাপ। যদি শিল্পীদের পাশে থাকার জন্যই সরকার বাজেট দিয়ে থাকে, তাহলে আমি মনে করি তাদের পাশে দাঁড়ান।’

মিলন কান্তি দে জানান, এমন অসংখ্য শিল্পী আছেন যাদের শিল্পী হিসেবে কোনো তালিকাই নেই সরকারি মহলে। যেখানে উঠে আসে অনেক শিল্পীর বর্তমান অবস্থার কথা। কিছুদিন আগে ‘যাত্রা ও পালাগান এখন ইতিহাসের পাতায়’  তিনি সেসব কথা তুলে ধরেন।