বাণিজ্য ঘাটতি সাড়ে ৬০০ কোটি ডলার ৬ মাসে

32

দেশের মোট রপ্তানি আয় আমদানি ব্যয় কমলেও হোঁচট খেয়েছে । ফলে বাড়ছে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ৬৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বাণিজ্য ঘাটতিতে পড়েছে বাংলাদেশ। তবে ঘাটতির এ অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৭৫ কোটি ডলার কম। গত বছরের এই সময়ে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৮২২ কোটি ডলার।
এদিকে, বাণিজ্যে ঘাটতি বাড়লেও বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের লেনদেন পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় আগের অর্থবছরের তুলনায় চাপ অনেকটা কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বরে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবে ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যালেন্স অব পেমেন্টের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ইপিজেডসহ রপ্তানি খাতে বাংলাদেশ আয় করেছে ১ হাজার ৮৭৬ কোটি ১০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় করেছে ২ হাজার ৫২২ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সেই হিসাবে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

দেশীয় মুদ্রায় ঘাটতির এ পরিমাণ ৫৪ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্যের ওপর বাণিজ্য ঘাটতি নির্ভর করে। মহামারির কারণে গত ছয় মাসে আমদানি-রপ্তানি তেমন গতি ছিল না। কিন্তু রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে আবার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামও নিম্নমুখী ছিল। এসব কারণে বাণিজ্য ঘাটতি কম হয়েছে আবার লেনদেনের ভারসাম্যেও উদ্বৃত্ত রয়েছে। এটা বর্তমান পরিস্থিতিতে ইতিবাচক। তবে বিশ্ববাজার এখনো স্বাভাবিক হয়নি। ইউরোপে নতুন করে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার কারণে ভবিষ্যৎ শঙ্কা কাটছে না বলে মনে করেন তিনি।
সালেহউদ্দিন বলেন, আগামীতে রপ্তানি বাড়ানো চ্যালেঞ্জ হবে। কারণ, নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে না। অনেক শিল্প-কারখানার উৎপাদন কমে গেছে। কিছু বন্ধও হয়ে গেছে। ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামালসহ অন্যান্য পণ্যের আমদানি অনেক কমে গেছে। এটা খুবই উদ্বেগজনক। এজন্য করোনার ক্ষতি পুনরুদ্ধারে প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা বাড়াতে হবে।
উল্লিখিত সময়ে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ তার আগের বছরের তুলনায় ০.৪৪ শতাংশ কম আয় করেছে। বিপরীতে পণ্য আমদানির ব্যয় আগের বছরের চেয়ে ৬.৮০ শতাংশ কমে গেছে। দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের চাহিদা কম থাকায় আমদানিজনিত চাহিদাও কম ছিল। তাই আমদানি ব্যয় তেমন বাড়েনি। তবে দেশের প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ চাঙ্গা থাকায় বাণিজ্য ঘাটতি কমে গেছে। প্রথম ছয় মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ।
বীমা, ভ্রমণ ইত্যাদি খাতের আয়-ব্যয় হিসাব করে সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতি পরিমাপ করা হয়। করোনাকালীন সময়ে মানুষ ভ্রমণ কম করেছে। অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানি কম হওয়ায় বীমার খরচও কমে গেছে। ফলে সেবা খাতের বাণিজ্য ঘাটতিও কমেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এ খাতের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৮৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। গত অর্থবছর একই সময়ে তা ছিল ১৬৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
মহামারিতে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার প্রভাব সরাসরি পড়েছে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ওপর। গত অর্থছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ১৬৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারের এফডিআই পেয়েছিল বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে ১৫৫ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
মহামারির মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতির অবস্থা যখন নাজুক তখনো দেশের অর্থনীতির অন্যতম সূচক বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট) উদ্বৃত্ত বাড়ছে। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে চলতি হিসাবে ৪৩২ কোটি ২০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত রয়েছে। যা আগের অর্থবছরে একই সময়ে ঋণাত্মক ছিল প্রায় ১৬৭ কোটি ডলার। এদিকে সার্বিক রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার কারণে ভারসাম্যেও (ওভার অল ব্যালেন্স) ৬১৫ কোটি ডলারের বেশি উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগে (পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট) প্রবাহের গতি নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বিনিয়োগ ছিল তিন কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ বছর একই সময়ে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ (নিট) যা এসেছিল তার চেয়ে ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার বেশি চলে গেছে।