বিএনপি মেয়াদোত্তীর্ণ সব কমিটি ভেঙে দিচ্ছে

25

বিএনপি মেয়াদোত্তীর্ণ সব কমিটি ভেঙে কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে । আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন করতে হবে। দল পুনর্গঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতাদের এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী পুনর্গঠন কাজ শুরু হয়েছে বলে দায়িত্বশীল নেতারা জানান।

বিএনপির পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতা আমাদের সময়কে জানান, তারা প্রথম দফায় নভেম্বরের মধ্যে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, থানা, উপজেলা ও পৌর কমিটি পুনর্গঠন কাজ শেষ করবেন। এর পর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জেলা ও মহানগর কমিটিতে সম্মেলনের মাধ্যমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করবেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী পুনর্গঠনের এই কাজ চলছে বলে জানান তারা।

গত ১২ অক্টোবর দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে যুক্তরাজ্য থেকে ভার্চুয়ালি বৈঠক করেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তৃণমূল পর্যায়ের সব কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত দেন তিনি। বৈঠকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও

জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও ছিলেন। রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছিল। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় আবারও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব এই পুনর্গঠন কাজ শুরু হয়েছে।

পুনর্গঠনের সঙ্গে যুক্ত নেতারা জানান, তৃণমূল বিএনপিতে আর পকেট কমিটি দেখতে চান না দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। কাউন্সিলের মাধ্যমেই নেতা নির্বাচন করতে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রতিকূল পরিবেশেও কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠনের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্র নয়, মাঠপর্যায় থেকেই সব কমিটি ঘোষণা করতে হবে। কমিটি গঠনে আন্দোলনমুখী কমিটি বাছাই করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যারা আন্দোলন-সংগ্রামে আপস করবেন না, ত্যাগী, বিশ্বস্ত এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতনÑ এমন ছাত্র, যুব, স্বেচ্ছাসেবক ও মহিলা দল করা সাবেক ও বর্তমান সক্রিয় নেতাদের কমিটিতে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।

বিএনপি নেতারা জানান, ওই বৈঠকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের এক দফা দাবিতে আন্দোলন করার বিষয়ে মত দেন সাংগঠনিক ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকরা। এজন্য তৃণমূলের কমিটি গঠনের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ করার ব্যাপারে অঙ্গীকার করেন তারা।

ওই বৈঠকের পর দায়িত্বশীল নেতারা সাংগঠনিক বিভাগ ঢাকা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, খুলনা, সিলেট, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ বিভাগের জেলা ও মহানগরের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

সাংগঠনিক সম্পাদক (রাজশাহী বিভাগ) রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু আমাদের সময়কে বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী পুনর্গঠনের কাজ চলছে। আশা করি ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ইউনিয়ন থেকে জেলা ও মহানগর পর্যন্ত সব কমিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে করা সম্ভব হবে। সম্মেলনের মাধ্যমে যোগ্য ও ত্যাগীরা নেতৃত্বে আসবেনÑ এটিই আমরা চাই।

জানা গেছে, পুনর্গঠন করতে গিয়ে নতুন সমস্যায় পড়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। তা হচ্ছে ৮১টি সাংগঠনিক জেলা কমিটির মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩৯টি জেলা ও মহানগর কমিটি ভেঙে আহ্বায়ক কমিটি করা সম্ভব হয়েছে; কিন্তু যেসব জেলা ও মহানগর (সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আছেন) কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ তাদের অধীনে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, থানা, উপজেলা ও পৌর কমিটি হবে, নাকি নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পর করা হবেÑ এ নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। দলের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা আমাদের সময়কে বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাংগঠনিক টিম দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত দেবে। যেমনÑ বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী ও ঝালকাঠিতে আহ্বায়ক কমিটি থাকায় সেখানে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে; কিন্তু সাংগঠনিক জেলা বরিশাল মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ, পিরোজপুর এবং বরগুনা জেলার পুনর্গঠন কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে।

সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক নান্নু বলেন, যেসব জেলা ও মহানগরের পুনর্গঠন কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে, সেখানে নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা দেওয়ার পর সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করা হবে। যে কোনো সময় ওই ছয় সাংগঠনিক জেলা কমিটি ঘোষণা করা হবে।

দলীয় সূত্র জানায়, পুনর্গঠনে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাসহ সংশ্লিষ্ট কারও কোনো গাফিলতি বা বাধা দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রুদ্ধদ্বার বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কমিটি গঠনে ‘এক নেতা এক পদ’ কার্যকরেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই বার্তা দেওয়া হয়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনেও। দলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এক নেতার এক পদ প্রতিটি কমিটিতে কার্যকর হচ্ছে। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

তারেক রহমানের এই বার্তার পর গত ১৯ অক্টোবর পটুয়াখালী জেলা আহ্বায়ক কমিটি থেকে পটুয়াখালী সদরের আহ্বায়ক কাজী মাহবুব আলম, মির্জাগঞ্জ উপজেলার আহ্বায়ক আশরাফ আলী হাওলাদার, দুমকি উপজেলা আহ্বায়ককে অব্যাহতি দেওয়া হয়। জেলা কমিটির ওই শূন্যপদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ বাহাউদ্দিন বাহার ছাড়াও ফখরুদ্দিন খান ও ছিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিককে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পুনর্গঠনের দায়িত্বে থাকা নেতারা জানান, সাংগঠনিক ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যন্ত কাউন্সিল করার একটি ক্যালেন্ডার তৈরি করতে বলা হয়েছিল বৈঠকে। এ জন্য ২০ অক্টোবর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এই ক্যালেন্ডার তৈরি করতে আরও বেশ কিছুদিন সময় লাগবে বলে জানান নেতারা।

বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, আমাদের পুনর্গঠনের মূল বাধা হচ্ছে সরকার। কর্মিসভা করার জন্য কোনো স্থান দেওয়া হয় না। নানাভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বাধা দেন। তবে এবার আমাদের সিদ্ধান্ত, যে কোনো উপায়ে নির্ধারিত ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পুনর্গঠন কাজ শেষ করতে হবে।