বৃটিশ বিজ্ঞানী করোনা সংক্রমণের ৫ বছর আগে মহামারির সতর্কতা দিয়েছিলেন

69

সতর্কতা দিয়েছিলেন বৃটিশ বিজ্ঞানী ড. ইডি হোমস চীনে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার কমপক্ষে ৫ বছর আগে । তিনি উহানের ওয়েটমার্কেট বা সামুদ্রিকখাদ্যের বাজার থেকে মহামারি ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে জানিয়েছিলেন। ড. ইডি হোমস বিবর্তনবাদ বিষয়ক জীববিজ্ঞানী এবং ভাইরাস বিশেষজ্ঞ। এ ছাড়া তিনি গ্লোবাল আউটব্রেক এলার্ট অ্যান্ড রেসপন্স নেটওয়ার্কের চেয়ার। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব সিডনিতে কর্মরত।

২০১৪ সালে তাকে উহান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) সদস্যরা নিয়ে গিয়েছিলেন হুনান প্রদেশের সামুদ্রিক খাদ্যের বাজারে। সেখানকার পরিস্থিতি দেখে তিনি বলেছিলেন, ওই স্থানের প্রাণী থেকে মানবশরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। চীনে মহামারি সৃষ্টির মতো কোনো নতুন প্যাথোজেন আছে কিনা সেটার বিস্তৃত একটি প্রকল্পের অধীনে তিনি ওই সফরে গিয়েছিলেন।  ড. ইডি বলেন, উহান সিডিসি আমাদেরকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল।

সেখানেই মূল কারণ ছিল। কারণ, আলোচনা হয়েছিল কোথা থেকে একটি রোগের উৎপত্তি হতে পারে? তাই ওটা ছিল সেই জায়গা, সেখানে এ জন্যই আমি গিয়েছিলাম। বৃটেনের অনলাইন দ্য টেলিগ্রাফকে দেযা এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেছেন।

সফরে তিনি ওই মার্কেটের কিছু ছবিও ধারণ করেছিলেন। এ ছাড়া তিনি স্মরণ করতে পারেন যে, ওই সামুদ্রিক খাদ্যের বাজারটি ছিল সংকীর্ণ এলাকায়, উহানের প্রাণকেন্দ্রে, রাস্তার পাশে। তিনি সফরে গিয়েছিলেন এক পড়ন্ত বিকেলে। তখন ওই বাজারে তেমন ভিড় ছিল না। সেখানে খাঁচার মধ্যে একটির ওপরে আরেকটি পশু, প্রাণিকে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল মাছ, সাপ, ইঁদুর, কুকুর, খেয়াকশিয়ালের মতো একটি প্রাণী- যাকে বলা হয় রেকুন ডগ। এসব প্রাণিকে কোভিড-১৯ এর সন্দেহজনক বাহক হিসেবে দেখা হয়।

ডা. ইডি বলেন, এসব প্রাণির বেশির ভাগই ছিল জীবিত। তার সামনে একটি প্রাণিকে সেখানে বেদম প্রহার করা হয়। ডা. ইডি বলেন, ওই প্রাণিটি বেরিয়ে পড়েছিল অথবা অন্য কিছু। কেউ তাকে প্রহার করছিল। আমার মনে হলো এটা একটা রেকুন ডগ, যদিও আমি পুরোপুরি দেখতে পাইনি। এটা ছিল একটি বাজে অবস্থা।

ড. ইডি বলেন, উহানের সিডিসি ওই মার্কেটগুলোতে রোগ ছড়িয়ে পড়া নিয়ে নজরদারি বৃদ্ধি করেছিল কিনা অথবা করোনা মহামারির আগের বছরগুলোতে নতুন কোনো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা চালু করেছিল কিনা সে সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন। এ বিষয়ে লন্ডনের দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকা থেকে যোগাযোগ করা হয় চায়না সিডিসি’র সাথে। কিন্তু তারা এ বিষয়ে কোনো উত্তর দেয়নি। কিন্তু ২০১৯ সালে প্রথম ওই মার্কেটে কাজ করা এবং সেখানে কেনাকাটা করা ব্যক্তিদের মধ্যে কোভিড সংক্রমণ দেখা দেয়। এতে সারাবিশ্বে দৃষ্টি আকর্ষণ করে ওই বাজার। প্রথমদিকে যে ৪১ জন ব্যক্তিকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তাদেরকে সরকারিভাবে কোভিড আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে দুই তৃতীয়াংশই ওই মার্কেটে গিয়েছিলেন অথবা সেখানে কাজ করতেন। ২০২০ সালের ১লা জানুয়ারি উহান কর্তৃপক্ষ ওই মার্কেটটি বন্ধ করে সিল করে দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি রিপোর্টে করোনা ভাইরাসের উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়া হয়। যদিও এতে যথার্থ উপসংহার দেয়া হয়নি, তবে এর সঙ্গে হুনান প্রদেশের ওই মার্কেটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে বলে মনে করা হয়। ধারণা করা হয় বাঁদুরের দেহ থেকে এই ভাইরাস মানবশরীরে স্থানান্তরিত হয়েছে অজ্ঞাত কোনো প্রাণির মাধ্যমে। সাধারণত বন্যপ্রাণির ব্যবসা এবং সামুদ্রিকখাদ্যের বাজারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে নতুন রোগ ছড়িয়ে পড়ার সম্পর্ক রয়েছে। ২০০২ সালে চীনের গুয়াংডং মার্কেট থেকে সার্স ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছিল বলে তথ্যপ্রমাণ আছে। সেই একই ধরণের ঘটনা ২০১৯ সালেও ঘটেছে বলে ডাটা ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২০ সালের শুরুর দিকে চীনের গবেষকরা হুনানের মার্কেট থেকে প্রায় ১০০০ নমুনা সংগ্রহ করেন। ময়লা ফেলার পাত্র, দরজা, বিড়াল এবং ইঁদুর বিক্রি হয় এমন দোকান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

প্রথমে যে ১৬৮ জনের দেহে কোভিড-১৯ ধরা পড়ে তাদের এক তৃতীয়াংশের সঙ্গে হুনান মার্কেটের সম্পর্ক পাওয়া যায়। হুনানের ওই মার্কেটের সঙ্গে যুক্ত এমন প্রথম যে ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয় তিনি ১২ই ডিসেম্বর অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রথম করোনা সংক্রমণ হওয়ার চারদিন পরে এ ঘটনা ঘটে।