Home / আর্ন্তজাতিক / ব্যারিস্টার হবার গল্প যুক্তরাজ্যে রোহিঙ্গা ইসমাইল মোহাম্মদের

ব্যারিস্টার হবার গল্প যুক্তরাজ্যে রোহিঙ্গা ইসমাইল মোহাম্মদের

বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড শহরের বাসিন্দা ইসমাইল মোহাম্মদ জাতীয়তা, মৌলিক মানবধিকার, শিক্ষা ছাড়াই বড় হয়েছে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেয়া এবং বেড়ে ওঠা, । ইসমাইল এখন ব্যারিস্টার হতে চায় এবং প্রতিকূল পরিবেশে থাকা অন্যদেরও ভালো কিছু অর্জনের স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করে। সম্প্রতি টেলিগ্রাফ এন্ড আর্গাস পত্রিকার এক প্রতিবেদনে সেই ইসমাইলের মুখে উঠে এসেছে তার নিজের এবং ব্র্যাডফোর্ডে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের গল্পঃ

রোহিঙ্গা নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ২২ বছর বয়সী ইসমাইল মোহাম্মদের মতে তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিয়ানমারের আদিবাসী। তবে তাদের নির্যাতন এবং রাষ্ট্রহীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে, যাদের জাতিসংঘ কর্তৃক “বিশ্বের অন্যতম অত্যাচারিত সংখ্যালঘু” বলা হচ্ছে।

২০১৬ সাল থেকে রোহিঙ্গারা গণহত্যার শিকার, যে কারণে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ছেড়ে পালাতে হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর এশিয়ায় এটিই বৃহত্তম দলবদ্ধভাবে প্রস্থান।

ইসমাইল যখন ব্র্যাডফোর্ডে পৌঁছে তখন তার বয়স মাত্র ১০। বাংলাদেশের গুন্ডাম শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গা পিতা-মাতার ঘরে তার জন্ম। সে বলছে, সেখানে তার স্কুলে যাওয়ার কোন সুযোগ ছিল না এবং মৌলিক মানবধিকার থেকেও সে ছিল বঞ্চিত।

বর্তমানে ম্যানিংহামের বাসিন্দা ইসমাইল যুক্তরাজ্যে আসার সময় ইংরেজিতে একটি কথাও বলতে পারতো না৷ এখন সে ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স (এলএলবি) করছে। একজন চৌকস ব্যারিস্টার এবং বৃটিশ সেনাবাহিনীর আইন কর্মকর্তা হওয়া তার লক্ষ্য।

“কেউ শরণার্থী হতে চায় না – শরণার্থীরা চূড়ান্ত কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েই শরণার্থী হয়ে ওঠে।

তবে, মন থেকে চাইলে কোন কিছুই অসম্ভব না। আমি শরণার্থী শিবিরে জন্মগ্রহণ করেছি যেখানে আমার পড়াশোনার অধিকার ছিল না, ব্যক্তিগত জীবন বলতে কিছু ছিল না, নাগরিকত্বের অধিকার ছিল না – তবে এখন আমি যত দূর এসেছি তা নিয়ে আমি খুব গর্বিত”, ইসমাইলের বক্তব্য।

“আমার বাবা-মা ১৯৮১ সালে মিয়ানমারে নির্যাতিত হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়েছিল। ইউএন গেটওয়ে প্রোটেকশন প্রোগ্রাম এর আওতায় ২০০৯ সালে সিটি অফ স্যাংচারি স্কিম এর অধীন প্রথম ১৯৯ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্র্যাডফোর্ড এ স্বাগত জানানো হয়েছিল, যাদের মধ্যে আমরাও ছিলাম।”

“আমি ডিক্সনস অ্যালারটন একাডেমিতে অংশ নিয়েছি এবং ম্যানিংহামে থাকি। আমাদের অধিকার এবং ‘নিজের বাড়ি বলে ডাকার মতো’ জায়গা দেওয়ার জন্য ব্র্যাডফোর্ডের জনগণের কাছে আমি খুব কৃতজ্ঞ। ব্র্যাডফোর্ডের রোহিঙ্গা সম্প্রদায় ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম। শুধু মৌলিক অধিকার থাকাটাই আমাদের জন্য বিশাল ব্যাপার, কারণ আমাদের কখনো সেটা ছিল না।”

“পড়াশোনা না করে বেড়ে উঠাটা ছিল হৃদয়বিদারক যা আমার আত্মবিশ্বাসেও প্রভাব ফেলেছিল। আমার শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত সমর্থন আমাকে ইংরেজি শেখায়, ১৪ বছর বয়সে পড়ালেখাও শেখায়।”

কেবল আট বছর আগে ইংরেজি শিখলেও ইসমাইল লক্ষণীয়ভাবে ভালো ইংরেজি বলছিল। সুন্দরভাবে সে ব্যাখ্যা করছিল তার ব্যক্তিগত কাহিনী – তার সে যাত্রায় অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও তার সেই জীবনই তাকে অনুপ্রাণিত করেছে অন্যদের সাহায্য করতে যারা একই রকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।

“আমার বাবা-মা গণহত্যা এবং বৈষম্যের সম্মুখীন  হয়েছিল৷ সে কারণে আমি সবসময় ব্যারিস্টার হতে চেয়েছিলাম, যাতে আমি সবাইকে ন্যায়বিচার অর্জনে সহায়তা করতে পারি”, বলছিল ইসমাইল ।

“রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এখনও ন্যায়বিচার লাভের প্রত্যাশায়। মৃত্যু, রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিতে বহু শরণার্থী। ক্যাম্পগুলোতে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সুবিধা রয়েছে, তবে যুক্তরাজ্যে আমরা যা ভোগ করি তেমন কিছুই নেই। তাছাড়া প্রাণঘাতী জরুরি অবস্থা না হলে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরেও যেতে দেয়া হয় না।”

তবে ইসমাইল আশাবাদী যে, অন্তত যুক্তরাজ্যে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হতে পারে।

ইসমাইল বলতে থাকে, “আমার বোন উম্মে কুলসুমের বয়স ২০ বছর। সে নার্সিং বিষয়ে পড়ছে। সে একজন ভালো নার্স হতে চায়। এছাড়া আমার চাচাতো ভাইয়েরাও আছে যারা এখানে যুক্তরাজ্যে ব্যারিস্টার এবং আইনজীবী হতে চায়। ব্র্যাডফোর্ডের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে জেসমিন আক্তার নামে একটি মেয়ে আছে, যে ছোটদের ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিল এবং ২০২০ সালের ‘ব্র্যাডফোর্ড স্পোর্টসওম্যান’ নির্বাচিত হয়েছে। আমরা আসলে একটি সম্প্রদায় হিসেবে এদেশে বড় অবদান রাখতে এবং এই দেশের মূল্যবান সম্পদ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে চেষ্টা করছি। যুক্তরাজ্যে পুনর্বাসনের পর আমাদের সুযোগ, আকাঙ্ক্ষা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষাও বেড়ে গেছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: