Home / খবর / গাজীপুরের নির্বাচন দলের ভবিষ্যৎ বিজয়ের পথ দেখাচ্ছে

গাজীপুরের নির্বাচন দলের ভবিষ্যৎ বিজয়ের পথ দেখাচ্ছে

আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘরে ঘরে গিয়ে সরকারের উন্নয়ন ও অর্জন দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। বলেছেন, আওয়ামী লীগ তৃণমূলের দল। এই দলের উচ্চপর্যায়ের নেতারা মাঝে মধ্যে ভুল করলেও তৃণমূলের নেতারা কখনো ভুল করেনি। সরকারের উন্নয়ন ও অর্জন তুলে ধরে তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগই একমাত্র মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারে। গতকাল গণভবনে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের উপস্থিতিতে বিশেষ বর্ধিত সভায় এসব কথা বলেন তিনি। এর আগে গণভবনে গাজীপুরের নবনির্বাচিত মেয়র জাহাঙ্গীর আলম ও দলীয় কাউন্সিলররা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচন দলের ভবিষ্যৎ বিজয়ের পথ দেখাচ্ছে।

সভায় রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের অধীন প্রতিটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত দলীয় চেয়ারম্যান, মহানগরের অধীন সংগঠনের প্রতিটি ওয়ার্ডের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও দলীয় কাউন্সিলর এবং জেলা পরিষদের নির্বাচিত দলীয় সদস্যরা অংশ নেন। এর আগে গত ২৩শে জুন প্রথম দফায় আওয়ামী লীগের জেলা ও থানার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে গণভবনে বর্ধিত সভার আয়োজন করা হয়। আগামী ৭ই জুলাই গণভবনে তৃতীয় পর্যায়ে ঢাকা, ময়মনসিংহ, রংপুর ও খুলনা বিভাগের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বর্ধিত সভা আহ্বান করা হয়েছে। গতকালের সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুর কাদেরসহ দলের উপদেষ্টা পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আওয়ামী লীগকে একটি পরিবার হিসেবে আখ্যায়িত করে তৃণমূলের নেতাদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বলেন, আমার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলাই আমার একমাত্র স্বপ্ন। আর আপনারা হচ্ছেন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক একজন কারিগর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করার জন্য নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা এ দেশের মানুষের জন্য আজীবন কাজ করেছেন। দেশের মানুষের কল্যাণে অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন। মানুষ দল ত্যাগ করে মন্ত্রিত্বের জন্য, কিন্তু জাতির পিতা মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দলকে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করেছিলেন মানুষকে ভালোবেসে। তার আদর্শে গড়ে ওঠে দেশের কল্যাণে আপনাদেরও কাজ করতে হবে। তবেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। নেতাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ পড়তে বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে বিজয়ী জাতি হয়েছি। এই দেশের জনগণ যা পেয়েছে রক্ত দিয়ে পেয়েছে। কেন আমরা অন্যের কাছে হাত পাতবো? জাতির পিতা বলেছিলেন ভিক্ষুক জাতির কোনো সম্মান ও ইজ্জত থাকে না।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ওই সময়ই ঋণখেলাপি সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে তারা। বিভিন্ন সময় ১৯টি ক্যু হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কারাগারে নিক্ষেপ করে নানা ধরনের নির্যাতন করা হয়েছে। পুরো রাজনীতিকে কলুষিত করে দিয়েছে তারা। ২১ বছর এদেশের মানুষের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে। আমরা বাংলাদেশের মানুষকে গণতন্ত্র এনে দিয়েছি। ১৯৮১ সালে নিজের দেশে ফেরার বিষয়টি উল্লেখ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সব হারিয়ে আমি রিক্ত নিঃস্ব হয়েছি। কিন্তু পেয়েছি আওয়ামী লীগের মতো একটি বিশাল পরিবার। আর বাংলার মানুষের ভালোবাসা। বাংলাদেশের যেখানেই গিয়েছি, সেখানেই মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। তিনি বলেন, কখনো নিজের ভাগ্যের জন্য কাজ করিনি। যেটুকু করেছি বাংলাদেশের জনগণের উন্নয়নে, জনগণের কল্যাণে বাংলাদেশটাকে একেবারে গ্রামের মানুষ, তৃণমূলের মানুষকে দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের জীবনমান উন্নত করবো- এটাই হচ্ছে আমাদের রাজনীতি। এটাই আমাদের লক্ষ্য, একমাত্র আদর্শ।

তৃণমূলই আওয়ামী লীগের শক্তি- উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের দলের উচ্চপর্যায়ের নেতারা মাঝেমধ্যে ভুল করলেও তৃণমূল নেতারা কখনও ভুল করে না। বঙ্গবন্ধু যখন ৬ দফা দিয়েছিলেন তখন কেউ কেউ ৮ দফা নিয়ে তাদের পেছনে ছুটেছেন। তিনি বলেন, তৃণমূলের নেতা কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন বলেই আমরা ক্ষমতায় আসতে পেরেছি। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় কোন্দল যেন না হয় সে বিষয়ে দলের নেতাদের সতর্ক করেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগকে আরো সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতে হবে। জনসমর্থনও বাড়ানো দরকার। কোনোরকম দলীয় কোন্দল যেন না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যেখানে যেখানে সমস্যা আছে, তা দ্রুত মিটিয়ে ফেলতে হবে। তিনি বলেন, নিজেদের গ্রুপ করতে যেয়ে যারা আমাদের মানুষ হত্যা করেছে, নির্যাতন করেছে তাদের টানাটানি না করে আপনারা নতুন নতুন কর্মী সৃষ্টি করুন। আমি বিভিন্ন জরিপ সংগ্রহ করছি। আপনারা আগেও মতামত দিয়েছেন। আপনাদের মতামত নিয়েই মনোনয়ন দেয়া হবে।

সরকারের উন্নয়ন ও অর্জন ঘরে ঘরে মানুষের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তৃণমূলের নেতাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, নৌকা ভাষার অধিকার দিয়েছে, স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। নৌকার কারণে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হয়েছে। তাই নৌকার কথা মানুষকে বলতে হবে। মানুষ সুখে থাকলে দুঃখের কথা ভুলে যায়। দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণের জন্য যে সব উদ্যোগ নিয়েছি তা মানুষের কাছে তুলে ধরবেন। তাদেরকে বলতে হবে কিভাবে উন্নয়ন হয়েছে। আমরা কি করেছি এবং কি করতে চাচ্ছি তা জনগণের সামনে তুলে ধরে নৌকা প্রতীকে ভোট চাইতে হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগই মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারে। কাজেই এই দলকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। তৃণমূলের মানুষের কাছে দলের কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে হবে।

সভায় বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও অর্জন তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার ৯০ ভাগ আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করেছি। কারো কাছে হাত পাততে হয়নি। আমাদের কারো কাছে সাহায্যের জন্য বসে থাকলে চলবে না। আমরা আমাদের সীমিত সম্পদের মাধ্যমে দেশকে গড়ে তুলবো। আমরা জনগণের স্বার্থে কাজ করি, ব্যক্তি স্বার্থে নয়। বক্তব্যে মাদকবিরোধী অভিযানের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাদক শুধু একটি জীবন নয়, পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। গ্রামে-গঞ্জে সবার কাছে মাদকের কুফল সম্পর্কে তুলে ধরতে হবে। তিনি বলেন, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে বলেই জঙ্গিবাদটাকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। এখন মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযানে সবার সহযোগিতা চাই। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ইউনিয়ন পরিষদের উন্নয়নে এবার ব্যাপক টাকা বরাদ্দ রেখেছি। আমরা চাই, প্রতিটি টাকা যথাযথভাবে কার্যকর করে, আপনাদের যার যার এলাকার উন্নয়ন আপনারা নিশ্চিত করবেন। আজকে আমাদের বাংলাদেশটা যেমন এগিয়ে যাচ্ছে এর গতিটা যেন ঠিক থাকে, সেটাই আপনারা দেখবেন।

বর্ধিত সভায় স্বাগত বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত গ্রামে গ্রামে গিয়ে উন্নয়নের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জয়লাভ দলটির উন্নয়ন ও অর্জনের ফসল বলে উল্লেখ করেন ওবায়দুল কাদের। তিনি আরো বলেন, উন্নয়নের পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে যদি ভালো আচরণ হয় তাহলে ব্যাটে বলে সংযোগ হবে এবং স্কোর হবে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নির্বাচনে মনোনয়নের জন্য ‘অসুস্থ’ প্রতিযোগিতা সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, মনোনয়নের খায়েশ থাকতে পারে। কিন্তু মনোনয়নের অসুস্থ প্রতিযোগিতা সহ্য করা হবে না। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করলে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন সঙ্গে সঙ্গে বহিষ্কার করা হবে।

গাজীপুর নির্বাচনে বিজয় ভবিষ্যতে বিজয়ের পথ দেখাচ্ছে: শেখ হাসিনা
এদিকে খুলনা ও গাজীপুর- এ দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল ভবিষ্যতে বিজয়ের পথ দেখাবে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এই নির্বাচনের ফলাফল আমাদের বিজয় দেখাচ্ছে, আর বিজয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়লাভ করা আওয়ামী লীগ দলীয় মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এবং কাউন্সিলররা গতকাল সকালে গণভবনে দেখা করতে গেলে তাদের উদ্দেশে একথা বলেন তিনি। শেখ হাসিনা বক্তব্যের শুরুতে গাজীপুর সিটির নতুন মেয়র ও কাউন্সিলরদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, এই জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি যেটা কাজ করেছে, সেটা হলো- একতা। সকলে ঐক্যবদ্ধ ছিল বলেই বিজয় আনতে পেরেছে। খুলনায় রাগ-ক্ষোভ ভুলে সবাই এক হয়েছিল বলেই বিজয় এসেছিল। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থাকলে যা চায়, তা আনতে পারে। আওয়ামী লীগ যখনই ঐক্যবদ্ধ থেকেছে, তখনই সকল বাধা অতিক্রম করতে পেরেছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনে বিএনপি’র মেয়র প্রার্থীকে বিশাল ভোটের ব্যবধানে হারানোর প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, এই বিজয় প্রমাণ করে, আওয়ামী লীগ যখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে, তখনই বিজয় অর্জন করে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিজয়কে প্রতিটি নেতা-কর্মীর বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।

গাজীপুরের নতুন মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রবীণের চিন্তা আর নবীণের শক্তি হলো আওয়ামী লীগ। প্রবীণের কাছ থেকে শিখতে হবে, দেশের ইতিহাস জানতে হবে। সকলের সম্মিলিত কাজের ফলেই যে এই জয় এসেছে তা মনে করিয়ে দেন দলীয় প্রধান। একই সঙ্গে প্রবীণ নেতাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করতে জাহাঙ্গীর আলমকে উপদেশ দেন শেখ হাসিনা। এ সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকও বক্তব্য রাখেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: