মানসম্পন্ন চিকিৎসা সেবার বিরাট বাধা স্বাস্থ্যখাতে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারের অভাব

412

দেশে স্বাস্থ্যসেবা বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার ছাড়াই চলছে । কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি ও চিকিৎসা ব্যবস্থার মেলবন্ধনের কাজটি করেন বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়াররা। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র পরীক্ষাগার ও অস্ত্রোপচার কক্ষে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্র থেকে শুরু করে কৃত্রিম অঙ্গ, যান্ত্রিক প্রত্যঙ্গ এবং পেসমেকার ও ডায়াফ্রামের মতো শরীরে স্থাপনযোগ্য স্বাস্থ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার। অথচ দেশের স্বাস্থ্যখাতে তাদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে এই বিপজ্জনক খবরটি প্রকাশিত হয়েছে।

খবরে বলা হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও চিকিৎসা প্রক্রিয়ার জটিল জীবনীচক্র বুঝতে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা যে অন্তর্দৃষ্টি জোগাতে পারেন, তার অনুপস্থিতিতে বিভিন্ন দেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতে অপ্রয়োজনীয় যন্ত্র কেনা হচ্ছে। আবার প্রয়োজনীয় যন্ত্র থাকলেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে। নিম্ন ও মাঝারি আয়ের দেশগুলোর এসমস্যা প্রকট বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগে। রেডিও থেরাপি মেশিন প্রায় অকেজো। একই অবস্থা মিডফোর্ড হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে সেখানে ১০ কোটি টাকা দিয়ে কেনা ল্যাসিক মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো পড়ে আছে। এ দুটি হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অকেজো অব্যবহৃত পড়ে আছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে কেনা এসব যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল নেই। ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিম্ন ও মাঝারি আয়ের দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কাঠামো বিস্তার করেছে উলম্ব জ্ঞান (চিকিৎসক, নার্স, প্রশাসক ইত্যাদি পেশাজীবী দক্ষতা) ও বার্ষিক পরিকল্পনাকে ঘিরে। বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়াররা স্বাস্থ্যসেবায় যে আনুভূমিক দক্ষতা সংযোজন করতে পারেন তার অভাব রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি নির্বাচন ও চিকৎসাযন্ত্র ক্রয়ে দক্ষ বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শের অভাবে অনেক দেশে সীমিত বাজেট বরাদ্দের এক বড় অংশ অপচয় হচ্ছে।

চিকিৎসাসেবার গোড়ার কথা হলো রোগ নিরূপণ ও সে রোগের প্রতিকার নির্ধারণ বা নির্বাচন। আজকের এ আধুনিক সময়ে রোগব্যাধি প্রতিরোধ নিরূপণ, চিকিৎসা ও সেরে ওঠার ক্ষেত্রে বিরাট আশীর্বাদ হয়ে এসেছে বিভিন্ন ধরনের মেডিকেল ডিভাইস। জীবনযাত্রার অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো স্বাস্থ্যসেবায় ও প্রযুক্তির ভুল প্রয়োগ অপব্যবহার এ আশীর্বাদকে নিমেষেই অভিযোগে পরিণত করতে পারে। মেডিকেল যন্ত্রপাতির অপপ্রয়োগে স্বাস্থ্যগত সমস্যা জটিল হওয়ার পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে এবং যন্ত্রের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হতে পারে সংক্রমণ। আনতে পারে মৃত্যুঝুঁকি। ল্যানসেট মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত সর্বসাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে শল্যচিকিৎসায় শরণাপন্ন রোগীদের মধ্যে দশমিক ৫ শতাংশ মারা যায় অস্ত্রোপচার কক্ষে সৃষ্টি সংক্রমণের কারণে। কাজেই চিকিৎসার যন্ত্রপাতির সুষ্ঠু ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করায় বিষয়টিকে যেমন–তেমনভাবে দেখার ও নেয়ার সুযোগ নেই। জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও যন্ত্রের সঙ্গে চিকিৎসা ব্যবস্থার মেলবন্ধনের কাজটি করেন মূলত বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়াররা। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, পরীক্ষাগার ও অস্ত্রোপচার কক্ষে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে কৃত্রিম অঙ্গ, যান্ত্রিক প্রত্যঙ্গ এবং পেস মেকার ও ডায়ফ্রামের মতো শরীরে স্থাপন যোগ্য স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাদেরই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের স্বাস্থ্যখাতে চলছে পর্যাপ্ত সংখ্যক বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছাড়াই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুয়ায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য প্রয়োজন একজন বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। সে হিসাবে বাংলাদেশে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারের চাহিদা ১৬ হাজারের ওপর। অথচ বাংলাদেশ এ পদে সনদধারী রয়েছেন মাত্র একজন। এটি অবশ্যই হতাশাজনক। তাছাড়া এটি গুণগতমানের স্বাস্থ্যসেবা দান নিশ্চিত করার পথে বড় বাধা বিদ্যমান এই হতশ্রী অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হলে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিতে হবে এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা আমরা আশা করি। লক্ষনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী ল্যাব এম আর আই সিটিস্ক্যানসহ অত্যাধুনিক যন্ত্রগুলো বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার ও ক্লিনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের অনুপস্থিতিতে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশে অত্যাধুনিক মেশিনপত্র আনা হলেও বায়োমেডিকেল বা ক্লিনিকেল ইঞ্জিনিয়ার নেই। দেশের বেশির ভাগ হাসপাতালে এ সংক্রান্ত কোন পদও নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও মিডফোর্ড হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে রেডিও থ্যারাপি মেশিন ও ল্যাসিক মেশিনের মতো শত শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অকেজো ও অব্যবহৃত হয়ে পড়ে আছে। ফলে একদিকে যন্ত্রপাতি কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থের অপচয় হচ্ছে। এ অবস্থা আর চলতে দেওয়া যায়না। কাজেই চিকিৎসা যন্ত্রপাতির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রচুর বায়োমেডিকেল বা ক্লিনিকেল ইঞ্জিনিয়ারের পদ সৃষ্টি জরুরি হয়ে পড়েছে। আশার কথা সরকার চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারের গুরুত্ব বিবেচনা করে ন্যাশনাল ইলেকট্রো– মেডিকেল ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারে ৫৪৯ টি পদ সৃষ্টির জন্য কাজ করছে। এটি ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে শুধু পদ সৃষ্টি করলে হবে না, এ ধরনের ইঞ্জিনিয়ার গড়ে তোলার সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিতে হবে। এখনও বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পঠন–পাঠন সীমিত পরিসরে রয়ে গেছে। বর্তমানে বুয়েট, চুয়েট, এম আই এসটি গণবিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে কেবল বায়োইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স চালু আছে। পর্যাপ্ত বয়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারকে গড়ে তুলতে হলে এ ধরনের শিক্ষার প্রসারও অপরিহার্য। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার, তথা শিক্ষামন্ত্রণালয় বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দেবে।