লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভাগ্য পেন্ডুলামে দুলছে

17

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৪৮০ দিন ধরে বন্ধ । শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরতে দীর্ঘ এই অপেক্ষার প্রহর কাটছেই না। বরং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সমস্যা। দেশে অধ্যয়নরত প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী নানা সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছেন। তাদের জীবন পেণ্ডুলামের মতো এদিক-ওদিক শুধুই ঘুরছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সব থেকে বেশি সমস্যার মুখে পড়েছেন চলতি বছরের এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা। এই দুই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার কথা ৪৪ লাখ শিক্ষার্থীর। ১লা ফেব্রুয়ারি এসএসসি ও ১লা এপ্রিল এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনার থাবায় স্থগিত হয়ে যায় সব পরীক্ষা।
এরপর সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এসএসসি ৬০ ও এইচএসসি ৮৪ দিনের ক্লাসযোগ্য সিলেবাস প্রকাশ করা হয়। কিন্তু তাদের ক্লাসে ফেরানো সম্ভব না হওয়ায় নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ৩ বিষয়ে পরীক্ষার নেয়ার কথা বলা হয়। সময়, নম্বর কমিয়ে নৈর্বাচিক তিন বিষয়ে এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়া হবে। বাকি বিষয়গুলো সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে মার্কিং করা হবে। আর তাও সম্ভব না হলে সাবজেক্ট ম্যাপিং ও অ্যাসাইন্টমেন্টের মাধ্যমে ফলাফল দেয়া হবে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষায় অংশ না নিতে পেরে চরম হতাশায় ভুগছেন ছাত্রছাত্রীরা।

এরই সঙ্গে চলতি বছরের পিইসি, জেএসসি পরীক্ষার্থীরাও আছে দ্বিধায়। হাতে কয়েক মাস সময় থাকলেও পরীক্ষা হবে কি-না, হলে কীভাবে- এই চিন্তা সর্বক্ষণ কুরে কুরে খাচ্ছে তাদের। বার্ষিক পরীক্ষার্থীরাও আছেন এই তালিকায়। ২০২০ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছিলেন ১৭ লাখ শিক্ষার্থী। তাদের কলেজে না গিয়েই কেটেছে দেড় বছর।

দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসাগুলোর সংকট আরও বেশি। বিভিন্ন ধরনের মাদ্রাসা বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা আছেন চরম দুর্ভোগে। এসব মাদ্রাসার সিংহভাগ শিক্ষার্থী দরিদ্র, এতিম। এসব মাদ্রাসা সাধারণ দানের অর্থে পরিচালিত হয়। মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীরা যেতে না পারায় সটকে যাচ্ছে শিক্ষা থেকে। দরিদ্র পরিবারের এই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন আয়মুখী কাজে জড়িয়ে পড়ায় বাড়ছে মাদ্রাসায় না ফেরার সম্ভাবনা। যদিও নির্দেশনা অমান্য করে চলছে কিছু মাদ্রাসা।

এদিকে ভর্তির আগেই দেড় বছরের সেশনজটে পতিত হয়েছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুরা। ২০২০ সালে পরীক্ষা না নিয়েই পাস করিয়ে দেয়া হয় সবাইকে। এই বছরের পরীক্ষার্থীদের এখনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। সাধারণত ডিসেম্বর মাস থেকে নতুন বছরের শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হয়। জুলাই থেকে ধরা হয় শিক্ষাবর্ষ। দু’এক মাসের মধ্যেও যদি ভর্তি পরীক্ষা হলে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ক্লাস করানো সম্ভব হবে। সেই হিসেবে ২০২০ সালে ‘অটোপাস’ পাওয়া ১৭ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার আগেই পতিত হয়েছেন দেড় বছরের সেশনজটে। আর চলতি বছরের পরীক্ষার্থীরাও স্বভাবতই সেশনজটের কবলে পড়বেন।

এ বছর দেশে ৩ গুচ্ছে ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ২০ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা, কৃষি গুচ্ছের সাত বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকৌশল গুচ্ছের তিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা বারবার সম্ভাব্য তারিখ দিয়েও পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার তারিখ দিয়েও পিছিয়ে দেয়। পিছিয়ে যায় সাত কলেজে ভর্তি পরীক্ষাও।

আর দেশের বৃহৎ শিক্ষার্থীর একটি অংশ ভর্তি হন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। এতে ফলাফলের মাধ্যমে ভর্তি করানো হলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা না হওয়ায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েরও ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও পরীক্ষা নেয়া হয়েছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। কিন্তু পরবর্তীতে সেই পরীক্ষাও থমকে যায়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরাও শিক্ষা জীবন শেষ করতে পারছেন না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীদের টিকা প্রদানের পরই ফেরানো হবে ক্যাম্পাসে। ৩৮ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২০টি আবাসিক হলের ১ লাখ ৩ হাজার ১৫২ জন শিক্ষার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এর বাইরে প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষার্থী আছেন যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। শতভাগ আবাসিক শিক্ষার্থীর টিকা প্রদান নিয়েও আছে জটিলতা।

করোনার ছোবলে পায়ের নিচের মাটি যেন ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে সরকারি চাকরি প্রত্যাশীদের। দেড় বছর চাকরির পরীক্ষা বন্ধ থাকা ও চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত পরীক্ষা না হওয়াতে এই সংকট দেখা দিয়েছে। আটকে আছে তিতাস গ্যাস, সিলেট গ্যাস ফিল্ড, সেতু বিভাগ, পল্লী বিদ্যুৎ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি সরকারি পরীক্ষা। তবে দীর্ঘ জটিলতা কাটিয়ে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ ৫৪ হাজার শিক্ষকের নিয়োগের ফল প্রকাশ করেছে। বৃহস্পতিবারে প্রকাশিত এই ফলে স্বস্তি মিলেছে প্রত্যাশীদের। করোনার বিস্তর মোকাবিলায় সরকারি বিধিনিষেধের কবলে আটকে আছে একাধিক সরকারি চাকরি পরীক্ষা। জট লেগেছে বিসিএস’র একাধিক পরীক্ষায়।

করোনায় সময় চলে গেলেও সরকারি চাকরি প্রত্যাশীদের বয়স থেমে নেই। করোনার নষ্ট সময় ফিরে পেতে আন্দোলনও করেছেন চাকরি প্রত্যাশীরা। ‘চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩২ চাই’- ব্যানারে সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। এছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করার দাবিতে আন্দোলন করছে ‘চাকরিতে বয়সসীমা ৩৫ চাই’ নামে একটি প্ল্যাটফরম।
বিপদের শেষ নেই কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকদের। বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, আমরা ১০ লাখ শিক্ষক মানবেতর জীবনযাপন করছি। সেইসঙ্গে মানবেতর জীবনযাপন করছে ১০ লাখ পরিবার। দেশে ৬০ হাজার কিন্ডারগার্টেনে প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থীকে আমরা পড়াতাম। কিন্তু বর্তমানে আমাদের প্রায় শতভাগ শিক্ষক চাকরি, বেতন হারিয়ে জীবনের সঙ্গে লড়াই করছেন। অনেক শিক্ষক ভিন্ন পেশায় গিয়ে কোনো মতে জীবনযাপন করছেন।

সামগ্রিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। সিংহভাগ শহুরে শিক্ষার্থী ভুগছেন মানসিক সমস্যায়। গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের ছোবলে ছাত্রীরা। ছাত্ররা জড়িয়ে পড়ছেন আয়মুখী কাজে। শহুরে শিক্ষার্থীরা এই মানসিক চাপ হয়তো বয়ে বেড়াবেন আজীবন। গ্রামের অনেক শিক্ষার্থীর আর হয়তো ফেরা হবে না বই-খাতা হাতে প্রিয় শিক্ষাঙ্গনে। আর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে মাদকসহ অনলাইন গেমের ছোবল।