সংস্কারের চাপে ক্যাস্ত্রো পরবর্তী কিউবার নয়া প্রেসিডেন্ট

45

নতুন প্রধান মিগেল দিয়াজ কানেল (৬০) কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির । দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি তিনি। কাস্ত্রো পরিবারের প্রতি অনুগত হিসেবে পরিচিত দিয়াজ-কানেল কিউবার একদলীয় ব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তন আনবেন না বলেই ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এখন পর্যন্ত কেবল বাজার-ঘরানার অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকেই জোর দিয়েছেন তিনি। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমনটা বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়, ২০১৮ সালে রাউল কাস্ত্রো (৮৯) প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পর পদটিতে আসীন হন দিয়াজ-কানেল। তখন থেকেই সংস্কারের বদলে বিদ্যমান নীতিমালা বহাল রাখার পক্ষে জোর দিয়ে আসছেন তিনি।

সম্প্রতি কমিউনিস্ট পার্টির ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত সোমবার দলীয় কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে দিয়াজ-কানেল জানান, পূর্বসূরীদের সঙ্গে আলোচনা করেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি। তার এই অবস্থান দলের জ্যেষ্ঠদের মনজয়ের কৌশল হলেও কিউবার পরিবর্তন-প্রত্যাশী তরুণদের হতাশ করেছে।

মিগেল-দিয়াজ একজন প্রশিক্ষিত ইলেকট্রনিক্স প্রকৌশলী। তার মধ্যে ফিদেল কাস্ত্রোর ক্যারিশমা বা রাউল কাস্ত্রোর কর্তৃত্ব কোনোটাই ফুটে উঠে না।

লোক দেখানো কাজকর্ম থেকেও দূরেই থাকেন তিনি।

তবে পূর্বসূরীদের চেয়ে আপাতদৃষ্টিতে অনেকটা আধুনিক হিসেবেই নিজেকে তুলে ধরেছেন তিনি। দুটি প্রদেশে কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান থাকাকালে ওই অঞ্চলগুলোয় সমকামিতার পক্ষে কাজ করেছেন, গড়ে তুলেছেন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। তিনি রক সঙ্গীত শোনেন, রাখেন লম্বা চুলও।

জাতীয় পর্যায়ে, শিক্ষামন্ত্রী ও ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ইন্টারনেট সেবা বাড়ানো নিয়ে কাজ করেছেন। সেসময়ে কাজে যাওয়ার সময় সাথে ট্যাব নিয়ে যেতেন তিনি। এখন নিয়মিত টুইটও করেন।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাকে তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা যেতো। দেশটির প্রথম ফার্স্ট লেডি তিনি। এর আগে এমন কোনো পদ ছিল না। নীরবে বেসরকারি খাতেও প্রভাব বৃদ্ধি করছেন তিনি।

ধারাবাহিকতায় জোর

আরো উন্মুক্ত কিউবার প্রতি তরুণদের সমর্থন থাকলেও দিয়াজ-কানেল ধারাবাহিকতা অনুসরণের প্রতিই জোর দিয়েছেন। তিনি জানান, সৃজনশীল ও অর্থনৈতিক খাতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বহাল রাখার নীতি মেনে চলবে তার সরকার।

পূর্বসূরীদের মতো কমিউনিস্ট পার্টির বিরোধীদের মার্কিন অর্থায়ন পাওয়া সংখ্যালঘু একটি গোষ্ঠী হিসেবে বর্ণনা করেছেন দিয়াজ-কানেল। দলীয় কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে তাদের ‘দুর্বৃত্ত’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেন তিনি। বলেন, ধৈর্য্যের সীমা রয়েছে।

উল্লেখ্য, দিয়াজ-কানেল প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হওয়ার পরপরই কিউবার উপর পুরনো বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ফের জোরদার করেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।

এরপর অবশেষে চলতি বছর, এক দশক পুরনো কাস্ত্রো-প্রবর্তিত বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাজার-ঘরানার সংস্কার চালু করে তার সরকার। তারল্য সংকটে নগদ অর্থ প্রবাহে চরম ঘাটতিতে সৃষ্ট চাপের মুখে এসব সংস্কার আনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, বেসরকারি খাতের সাময়িক প্রসারণ, আমদানি কমিয়ে আনা, রপ্তানি বৃদ্ধি করা, রাষ্ট্র-পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া ভর্তুকির পরিমাণ কমানো, ইত্যাদি।

সংস্কারবাদী?

কিউবার ভিলা ক্লারা প্রদেশে সাধারণ পরিবারে বড় হয়ে উঠেছেন দিয়াজ-কানেল। জনগণের কাছে তিনি কঠোর-পরিশ্রমী হিসেবে পরিচিত। নব্বইয়ের দশকে কিউবার প্রধান পৃষ্ঠপোষক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর তার সহকর্মীরা গাড়িতে করে অফিসে গেলেও মিগেল যেতেন শর্টস পরে, সাইকেল চালিয়ে।

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারি দেশটিতে আঘাত হানার আগে এক বছর আগে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন মিগেল। ওই এক বছর  কিউবানদের জীবনযাপন সম্পর্কে আরো জানার জন্য প্রায়ই তাকে বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শন করতে দেখা গেছে। তার সেসব পরিদর্শন রাষ্ট্র পরিচালিত টেলিভিশনে প্রচার হতো।

কিউবান সঙ্গীতশিল্পী জাভিয়ার মেনেন্দেজ (৩২) বলেন, মিগেল রাস্তায় নেমে এসেছেন। তিনি কাস্ত্রোর মতো না। কিন্তু তাকে তরুণ প্রজন্মের সমর্থন অর্জন করতে হবে। কিউবার বর্তমান গতিপথ নিয়ে দেশে অনেক অসন্তুষ্ট তরুণ আছে।

ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির লাতিন আমেরিকান ইতিহাস বিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক মাইক্যাল বুস্তামান্তে বলেন, ক্ষমতায় আসার পর থেকে ঘূর্ণিঝড়, বিমান ধস, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও করোনা মহামারিসহ একের পর এক সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন দিয়াজ-কানেল।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের এখন উচিৎ হবে বিচক্ষণ একটি ভিশন অনুসরণ করে এই সংকট থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি করা। একইসঙ্গে দিয়াজ-কানেলের নিজের নিজস্ব অবস্থান সুস্পষ্ট করা।

বিশ্লেষকদের বলছেন, মিগেল-দিয়াজের জন্য এমনটা করা আরো বেশি প্রয়োজনীয়। কেননা পূর্বসূরীদের মতো কিউবা বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়ার খ্যাতি নেই তার। এ কারণে, নেতৃত্বে কাস্ত্রোদের মতো বৈধতা থাকবে না তার। একইসঙ্গে ইন্টারনেটে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়ছে। এতে বিরোধীদেরও শক্তি জোরদার হচ্ছে।

রাষ্ট্র-পরিচালিত একটি দোকানের বিক্রয়কর্মী ইয়ামিল গনজালেজ (৪১)। মাসে ৮০ ডলার বেতন পান তিনি। এ দিয়ে মাস পার করতে হিমশিম ক্ষেতে হয় তাকে।

গনজালেজ বলেন, আমরা এখনো দিয়াজ-ক্যানেলের শাসন দেখিনি। এমন কঠিন সময়ে কিউবানদের দৈনিক প্রয়োজন আংশিকভাবে মেটাতে হলেও তাকে কঠোর পরিশ্রম করোতে হবে।

(রয়টার্স থেকে অনূদিত)