‘সর্বোপরি সড়ক আইন–২০১৮ কার্যকর করতে হবে’

51

সড়ক দুর্ঘটনা রোধ সড়ক-মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশে নজরদারি বাড়াতে হবে নানা রকম উদ্যোগ ও শত প্রচারণার পরও সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা যাচ্ছে না। ট্রাফিক সপ্তাহ, ট্রাফিক পক্ষ, র‌্যাব–পুলিশের নানা তৎপরতা – এসবের মধ্যেও ঘটে চলেছে দুর্ঘটনা। মনে হচ্ছে, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাস, মিনিবাস, ট্রাক, ট্রাক্টরের মতো ভারী গাড়িগুলো মারাত্মক দুর্ঘটনার জন্য অধিকতর দায়ী। বুয়েটের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ওইসব গাড়ির মধ্যে মিনিবাসই বেশি দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। তবে সবচেয়ে আলোচনার বিষয় হলো ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে। এতে বলা হয়েছে, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশে বাড়ছে দুর্ঘটনা। একই সঙ্গে উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই মহাসড়কের পাশে হওয়ায় চলাচলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল বন্ধে নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিভিন্ন সময় কর্মসূচি পালন করা হলেও সড়কগুলো আরও বেশি অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।

মহাসড়কের এই অংশে দুর্ঘটনার বেশকিছু কারণ চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এসবের মধ্যে ট্রাফিক আইন অমান্য করে মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক (অধিকাংশ ক্ষেত্রে সহকারীর হাতে গাড়ি থাকা), নিয়ম ভঙ্গ করে ওভার লোডিং, ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা, চালকদের দীর্ঘক্ষণ বিরামহীন গতিতে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, উল্টোপথে গাড়ি চালানো, সংযোগ সড়ক থেকে দ্রুতগতিতে মহাসড়কে ওঠা, ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও চলাচলের অনুপযোগী সড়ক অন্যতম। এ ছাড়াও সময় বাঁচাতে পথচারীদের ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করা ও ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত মহাসড়ক পারাপার করতে গিয়ে অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে। মহাসড়কে যানবাহন দুর্ঘটনায় পড়ে যত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, তার ৬০ শতাংশ হারাচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সড়ক পার হতে গিয়ে। পথচারী ও সাধারণ মানুষ সড়ক পারাপারে একটু সতর্ক হলেই অনেক প্রাণ বেঁচে যাবে।

এভাবে অবজ্ঞাজনিত সড়ক দুর্ঘটনায় কত মানুষ মারা যাচ্ছে, কত শতজন চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করছে, তার হিসাব কেউ রাখে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা স্টাডি সেন্টারের গবেষণায় দেখা গেছে, নব্বই দশকের মাঝামাঝি অবধি যেখানে বছরে এ ধরনের অবজ্ঞাজনিত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ছিল প্রায় এক হাজার, এখন তা প্রায় ২৫ গুণ; ২৫ হাজার। একই ধরনের দুর্ঘটনায় আহত যেখানে বছরে ছিল সাত–আট হাজার, সেখানে এখন আহতের সংখ্যা ৭০–৮০ হাজার কমপক্ষে। এদের বিশাল অংশই চিরতরে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে।

এভাবে দিনদিন সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে বৈ কমছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম একটি কারণ অতিরিক্ত গতিসীমা। একটি অতিরিক্ত গতিসম্পন্ন গাড়ি অন্য আরেকটি গতিসম্পন্ন গাড়িকে ওভারটেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ছে। এ ছাড়া রয়েছে লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক, সচেতনতার অভাব, অন্যমনস্ক হয়ে গাড়ি চালানো, যান্ত্রিক ত্রুটিসম্পন্ন গাড়ি রাস্তায় নামানো, অপ্রশস্ত রাস্তা, ট্রাফিক আইন অমান্য করা ইত্যাদি।

পথচারী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে গাড়ি চালানো, মাত্রাতিরিক্ত গতি ও ওভারটেকের প্রতিযোগিতা, মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালালেও কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ফলে দুর্ঘটনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দুর্ঘটনার কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি পাশাপাশি রয়েছে এগুলো প্রতিরোধের উপায়ও। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজন নির্দিষ্ট গতিসীমা বা নিয়ন্ত্রিত গতি, যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ চালক নিয়োগ, নিরাপদ ও প্রশস্ত রাস্তা, জনসচেতনতা, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ ও জনসাধারণ যাতে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করে, এ ব্যাপারে তাদের উৎসাহিত করা। লাইসেন্স প্রদানে দুর্নীতি বন্ধ করা, চালকের বেতন ও কাজের সময় নির্দিষ্ট করা, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবহণ মালিক–শ্রমিক ও যাত্রী–পথচারীদের ক্ষেত্রেও ট্রাফিক আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ড অংশে যেহেতু দুর্ঘটনা বাড়ছে।

সেহেতু এখানে কর্তৃপক্ষের বেশি করে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। আমরা আশা করবো, যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে দুর্ঘটনার মাত্রা হ্রাস করতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।সর্বোপরি সড়ক আইন–২০১৮ কার্যকর করতে হবে।