ব্রেকিং নিউজ
Home / আর্ন্তজাতিক / সিংহাসন নিশ্চিত করলেন এমবিএস :সৌদি রাজপরিবারের গেম অব থ্রোনস

সিংহাসন নিশ্চিত করলেন এমবিএস :সৌদি রাজপরিবারের গেম অব থ্রোনস

গত শনিবার তার নির্দেশে মুখোশপরা পুলিশ সদস্যরা সৌদি আরবের সব থেকে প্রভাবশালী প্রিন্সদের মধ্যে তিনজনের বাসায় প্রবেশ করে। সৌদি আরবের ক্ষমতা নিশ্চিতে সর্বশেষ পথের কাঁটা সরিয়ে ফেললেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। আটক করে সৌদি বাদশাহ সালমানের একমাত্র আপন ভাই প্রিন্স আহমেদ বিন আবদুল আজিজকে। আরো আটক করা হয়, এমবিএসের স্বপ্নের সিংহাসনের আরেক দাবিদার সাবেক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফকে। এর মধ্যদিয়ে ভবিষ্যৎ বাদশাহ হওয়ার পথ একদম মসৃণ করে ফেললেন চতুর এমবিএস।

সৌদি রাজপরিবারে সিংহাসন নিয়ে যে দ্বন্দ্ব তা সপষ্ট করতে চলে যেতে হবে অতীতে। আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছে এই আল-সৌদ পরিবার। সাবেক বাদশাহ কিং আবদুল আজিজের হাতেই এই রাষ্ট্রের সূচনা।

আবদুল আজিজের স্ত্রীদের মধ্যে সব থেকে প্রিয় ছিলেন হুসসা বিনতে আহমেদ আল-সুদাইরি। তাদের সাত ছেলে পরবর্তীতে পরিচিত হয় সৌদি আরবের ক্ষমতাধারী ‘সুদাইরি সেভেন’ নামে। সুদাইরি ভ্রাতাদের মধ্যে বর্তমানে বেঁচে আছেন শুধু দুইজন। যার মধ্যে একজন হচ্ছেন সৌদির বর্তমান শাসক কিং সালমান ও আরেকজন হচ্ছেন সমপ্রতি আটক হওয়া তার ভাই প্রিন্স আহমেদ। রাজপরিবারের আইন অনুযায়ী প্রিন্স আহমেদ সৌদি আরবের বাদশাহ হতে পারতেন। ফলে তাকে সপষ্ট হুমকি মনে করছেন বাদশাহ’র সন্তান মোহাম্মদ বিন সালমান।

প্রিন্স আহমদ জন্ম নেন ১৯৪০-এর দশকে। তিনি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে তিনি ১৯৬৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক রেডল্যান্ডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ক্ষমতা ভাগাভাগির অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন সৌদি আরবের সহকারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১২ সালে তিনি সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পদ পান। কিন্তু এর মাত্র ৫ মাসের মাথায় তাকে এই পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। তার জায়গায় বসানো হয় সাবেক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফকে। সমপ্রতি প্রিন্স আহমেদের সঙ্গে এই মোহাম্মদ বিন নায়েফকেও আটক করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব হারানোর পর কয়েক বছর মক্কা ও মদিনার দায়িত্ব পান প্রিন্স আহমেদ। সুদাইরি ভ্রাতাদের সব থেকে ছোট হিসেবে তাকে দেখা হতো সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ প্রধান হিসেবে। কিন্তু তাকে অন্তত দুইবার এ সুযোগ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

২০১৭ সালে ঊর্ধ্বতন প্রিন্সদের সরিয়ে সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ বাদশাহ হিসেবে উঠে আসেন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। এ সময় তার বিরোধিতা করেছিলেন প্রিন্স আহমেদ ও প্রিন্স বিন নায়েফ। এমবিএস ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর রাজপরিবারে বড় ধরনের আটক অভিযান চালান। এতে আল-সৌদ পরিবারের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যকে কথিত দুর্নীতির দায়ে বেশ কয়েক সপ্তাহ আটক করে রাখা হয়েছিল। তবে নভেম্বরে এই ঘটনার পূর্বেই বৃটেনে পালিয়ে যান প্রিন্স আহমেদ। পরে তাকে আশ্বাস দেয়া হয় যে, দেশে ফিরে এলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে না। সেই বিশ্বাস নিয়ে ২০১৮ সালের অক্টোবরে দেশে ফিরে আসেন প্রিন্স আহমেদ।

তবে লন্ডনে বসে তিনি সৌদি সরকারের সমালোচক হয়ে উঠেছিলেন। বিন সালমানের ইয়েমেনে যুদ্ধ চালানোর সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচক ছিলেন প্রিন্স আহমেদ। ২০১৫ সালে শিয়া যোদ্ধাগোষ্ঠী হুতিকে পরাজিত করতে ইয়েমেনে যুদ্ধ শুরু করে সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন আরব জোট। এরপর থেকে ইয়েমেনে ইতিহাসের ভয়াবহতম মানবিক সংকট চলছে। এর পেছনে সৌদির ভূমিকার সমালোচনা করে প্রায় দুই মিনিটের একটি ভিডিও তিনি অনলাইনে প্রচার করেছিলেন ২০১৮ সালে। এর জন্য তিনি তার ভাই ও ভাইয়ের ছেলেকে দায়ী করেছিলেন তখন। বলেছিলেন, ইয়েমেনে যা হচ্ছে তার জন্য আল-সৌদ পরিবারের অন্যরা নয় বরং নির্দিষ্ট দু’-একজনই দায়ী। আর তারা হচ্ছেন, বাদশাহ ও ক্রাউন প্রিন্স এবং রাষ্ট্রের আরো কিছু কর্মকর্তা। এরপরেও গ্রেপ্তার করা হবে না- এমন আশ্বাস পেয়ে সৌদি আরবে ফিরে গিয়েছিলেন প্রিন্স আহমেদ। তবে সমপ্রতি বাদশাহ’র বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের অভিযোগে আটক হলেন তিনি।

অপরদিকে, বাদশাহ সালমানের ভাইয়ের ছেলে মোহাম্মদ বিন নায়েফ সিংহাসনের আরেক দাবিদার। তিনি ছিলেন দেশটির সাবেক ক্রাউন প্রিন্স। ২০১৭ সালে তাকে সরিয়ে দিয়েই ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয় বাদশাহ’র ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানের। বিন সালমান ক্রাউন প্রিন্স হয়েই বিন নায়েফকে গৃহবন্দি করে রাখেন। আটকের আগ পর্যন্ত তিনি গৃহবন্দিই ছিলেন। তাই সিংহাসন দখলে তার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের যে অভিযোগ এসেছে তা নিয়ে রয়েছে নানা অসপষ্টতা।

সৌদি রাজপরিবারে যা চলছে তা নিয়ে পূর্ব থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব চলছিল। আগে হোক পরে হোক সিংহাসনের দাবিদাররা এমবিএসের শিকারে পরিণত হবেন- এমনটা একরকম নিশ্চিতই ছিল। তাদেরকে আটক করে প্রথমত নিজের পথ পরিষ্কার করেছেন বিন সালমান। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন এর পেছনে আরো একটি উদ্দেশ্য রয়েছে তার। তিনি ভবিষ্যতেও তার যাত্রা মসৃণ হবে এমনটা নিশ্চিত করতে চাচ্ছেন। এই ধরপাকড়ের মধ্যদিয়ে তিনি একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, কেউ যদি ভবিষ্যতে তার পথের কাঁটা হতে চায় তাহলে তার কী পরিণতি হতে পারে।

বিন সালমান কি সৌদি আরবে জনপ্রিয়?
ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে মোহাম্মদ বিন সালমানের নাম ঘোষণার পর থেকে তিনি সৌদি আরবে ব্যাপক সংস্কার শুরু করেন। তেলভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনীতিতে বৈচিত্র্যতা আনার চেষ্টা করছেন তিনি। ঘোষণা করেছেন ভিশন ২০৩০। তার সময়ে দেশের মধ্যে চলছে ব্যাপক উদারীকরণ। কট্টোর রক্ষণশীল দেশ হিসেবে পরিচিত সৌদি আরবকে তিনি করে তুলেছেন অনেকখানি উদার। চালু করেছেন বিনোদনের নানান সুযোগ- সুবিধা। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে চালু হয়েছে সিনেমা হল, বিনোদন কেন্দ্র। নারীদের ওপর থাকা নানা বৈষম্যমূলক আইন বাতিল করেছেন। পুরুষ অভিভাবকত্ব বাতিল করে তাদেরকে দিয়েছেন বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ। গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘ কয়েক যুগের যে নিষেধাজ্ঞা ছিল নারীদের ওপর তাও উঠিয়ে নিয়েছেন তিনি। এখন পশ্চিমা জনপ্রিয় তারকারা নিয়মিত আসছেন দেশটিতে। চলছে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন, কনসার্ট। ফলে দ্রুতই সৌদি তরুণদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন এমবিএস।

তবে দেশটিতে থাকা রক্ষণশীলদের মধ্যে রয়েছে তার বিরুদ্ধে চাপা ক্ষোভ। আল-জাজিরাসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক গণমাধ্যমেই উঠে এসেছে সেই ক্ষোভের কথা। মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বেড়েছে তার সময়ে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিনোদনের নানা আয়োজনে যে ব্যাপক ব্যয় হচ্ছে তা সৌদি নাগরিকদের জীবনযাপনের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। সমপ্রতি তেলের দাম নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছে সৌদি আরব। এর ফলে দেশটির ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরো বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এতে কমে আসতে পারে তার জনপ্রিয়তা। রয়েছে আরো কিছু ইস্যুও। করোনা ভাইরাস আতঙ্কে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে মুসলিমদের নিকট পবিত্র মক্কার ক্বাবা ঘর। কিন্তু বিনোদন কেন্দ্রগুলো চলছে সেই আগের মতোই। রক্ষণশীল নাগরিকরা বিষয়টি পছন্দ করছেন না। পাশাপাশি কাতার ও ইরানের সঙ্গে তার সময়ে যে রেষারেষি চলছে তা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব রয়েছেন অনেকে। ইয়েমেনে সৌদি আরবের ভূমিকা নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছেন এমবিএস। এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজপরিবারের সমালোচক সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে হত্যা। এই হত্যাকাণ্ডও বিশ্বজুড়ে বিতর্কিত করে তুলেছে সৌদি আরবের এই ভবিষ্যৎ বাদশাহ’র ভাবমূর্তিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this:
Skip to toolbar