Home / স্বাস্থ্য / স্বাস্থ্যকর্মীরা কেন এত বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ?

স্বাস্থ্যকর্মীরা কেন এত বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ?

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন দেশে ৭১ জন চিকিৎসকসহ অন্তত পৌনে দু’শ স্বাস্থ্যকর্মী ৷ ইতিমধ্যে একজন চিকিৎসক মারা গেছেন৷ এর বাইরে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী কোয়ারান্টিনে আছেন৷ করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের ৭১ চিকিৎসক ও ৬২ জন নার্স ইতিমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন। সে হিসেবে আক্রান্তদের শতকরা প্রায় আট ভাগ স্বাস্থ্যকর্মী৷

বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী অন্তত মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিনভাবে কোভিড-১৯ আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে ইতালিতে প্রায় ৮.৫%, স্পেনে ১৫% এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও ও মিনেসোটা রাজ্যে আক্রান্তদের প্রায় ২০% স্বাস্থ্যকর্মী৷

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, তুলনা করলে বাংলাদেশে আক্রান্তের হার নেহায়েত কম নয়৷ কারণ চীনে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আক্রান্তের মাত্র ৪% ছিলেন স্বাস্থ্যকর্মী৷ তাছাড়া এসব দেশে করোনার প্রকোপ বেড়েছে বাংলাদেশের আগে থেকে৷ পর্যাপ্ত পিপিইর অভাব, নিম্নমানের মাস্ক ও সার্বিক অব্যবস্থাপনার কারণে এ অবস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে৷

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বার্তা সংস্থা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘প্রথমত, যথাযথ নিরাপত্তা সামগ্রী ছাড়াই প্রথম দিকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সেবা দিতে বাধ্য করা হয়েছে৷ তারপর তাদের কাছে যেসব সামগ্রী গেছে তা ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের।’

‘দ্বিতীয়ত, এন-৯৫ মাস্কের নামে তাদের যেটা দেওয়া হচ্ছে সেটা অত্যন্ত নিম্নমানের৷ তৃতীয়ত, কুর্মিটোলা বা কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে যারা এই চিকিৎসা দিচ্ছেন তাদের নানা ধরনের সংকট রয়েছে৷ এমনকি তারা ঠিকমতো খাবারও পাচ্ছেন না৷ ফলে তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন৷ যখন কেউ মানসিকভাবে দুর্বল থাকেন তখন তিনি নিরাপত্তা সামগ্রী ব্যবহারে অত বেশি মনোযোগী থাকেন না৷ আর চতুর্থত, এদের কোনো প্রশিক্ষণই নেই৷ মিডিয়ার মাধ্যমে দেখে যা শিখেছেন তাই প্রয়োগ করে রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন৷ ফলে তাদের জানায় ঘাটতি রয়েছে৷’

চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হওয়ার কারণে, অনেক হাসপাতাল ইতিমধ্যে লকডাউন করা হয়েছে৷ করোনা রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়েই সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈনউদ্দিন আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন৷ উন্নত চিকিৎসা দিতে ঢাকায় আনতে তার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চেয়েও পাওয়া যায়নি৷ এমনকি সরকারি অ্যাম্বুলেন্সও পাননি তিনি৷ এখনো হাসপাতালগুলোতে যারা সরাসরি চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন তাদের কাছে উপযুক্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম পৌঁছানো হয়নি৷ হাসপাতালগুলোতে নেয়া হয়নি ‘ট্রায়জের’ (বিশেষ ব্যবস্থা যেখানে সব রোগীকে পৃথক করে চিকিৎসা দেয়া হয়) ব্যবস্থাও৷

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, ‘(স্বাস্থ্যকর্মীরা) বাংলাদেশে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন কারণ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ভালো সেবা দিচ্ছেন৷ তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানুষের চিকিৎসা দিচ্ছেন৷’

পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম কি তারা পাচ্ছেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘আগে পাইনি তবে এখন পাচ্ছি৷ এখন তো প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিষয়টি দেখভাল করছেন৷ ফলে আর সমস্যা হবে না৷’

এন-৯৫ মাস্কের নামে যা দেওয়া হচ্ছে তা নিম্নমানের স্বীকার করে ডা. মহিউদ্দিন বলেন, ‘ডাক্তাররাও এমন অভিযোগ করছেন৷ খাবার দাবার নিয়েও সমস্যা হচ্ছে৷ এগুলোর দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে বলেছি৷’

বেশ কয়েকজন চিকিৎসক বলছেন, অনেক রোগী তথ্য গোপন করে চিকিৎসা নিচ্ছেন৷ এ কারণেও ভয়াবহ রোগটি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে৷ এভাবে চলতে থাকলে স্বল্প সময়ে দেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি বড় অংশ আক্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন৷ সেটি হলে রোগীরা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন৷

সরকারপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সেনাল বলেন, ‘আমাদের যারা এগুলো ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে আছেন তারা মনে করেছিলেন, ডেঙ্গুর মতো পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ফেলব৷ ফলে যে দুই মাস তারা সুযোগ পেয়েছিলেন তখন কিছুই করা হয়নি৷ শুধু ফাঁকা বুলি দিয়ে গেছেন৷ যখন আক্রান্ত ধরা পড়ল তখনও শুধু মনোবল দিয়েই চিকিৎসকদের মাঠে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ ফলে তারা অনেক বেশি আক্রান্ত হয়েছেন৷ এখন কিছু কাজ শুরু হয়েছে, কিন্তু ব্যবস্থাপনায় অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি রয়েছে৷’

বাংলাদেশ টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব সেলিম মোল্লা বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমাদের অন্তত ২০ জন টেকনোলজিস্ট আক্রান্ত হয়েছেন৷ আমরা সিস্টেমটা পরিবর্তন করতে বলেছি৷ আমাদের সবাইকে আগে অফিসে হাজির করানো হচ্ছে৷ তারপর কাজ ভাগ করা হচ্ছে৷ আমরা বলেছি, আগে কাজ ভাগ করে দেন৷ যাদের প্রয়োজন নেই তারা কেন অফিসে আসবে? এতে আমাদের লোকজন বেশি করে আক্রান্ত শুরু হলে কিন্তু কাজ করার লোক থাকবে না৷’ সূত্র: ডয়চে ভেলে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: