স্বাস্থ্যের নিয়ন্ত্রক পাল্টেছে

18

স্বাস্থ্যের কেনাকাটা ছিল তার কব্জায় দেশের বেশিরভাগ জেলায় । তিনি চাইলেই অন্য ঠিকাদার কাজ পেতেন, না চাইলে পেতেন না। কয়েকটি জেলায় তার একচ্ছত্র আধিপত্য। একজন সাধারণ স্কুলশিক্ষক থেকে ঠিকাদারিতে নেমে হয়েছেন হাজার কোটি টাকার মালিক। এমনকি পছন্দের কর্মকর্তাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বদলি-পদায়নেও রয়েছে তার হাত। তার বিরাগভাজন হওয়ায় অনেক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন সময়ে হয়রানির শিকারও হতে হয়েছে। এভাবেই স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রণালয়ের অদৃশ্য এক নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়েছেন ঠিকাদার নাসিমুল গনি টোটন।

সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের নথি চুরির ঘটনায় থানায় যে জিডি হয়েছে, তদন্ত শেষে সেটি মামলায় পরিণত করা হবে বলে জানা গেছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী সাঁটমুদ্রাক্ষরিক ও কম্পিউটার অপারেটর মো. জোসেফ সরদার এবং আয়েশা সিদ্দিকার পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য কর্মচারীর সঙ্গে সন্দেহভাজন আসামি হতে পারেন টোটন। গত সোমবার মধ্যরাতে সিআইডির হাতে আটকের পর মঙ্গলবার থেকে তার সম্পদের খোঁজ নিতে শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটির গোয়েন্দা বিভাগ থেকে তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ নথি চুরি হয়। এ সবের মধ্যে টোটনের এক বা একাধিক ফাইল রয়েছে। তাই ফাইল চুরির ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে- এমন সন্দেহে রাজশাহী থেকে তাকে আটক করে সিআইডি। গতকাল দিনভর সিআইডি কার্যলয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে। সিআইডির একটি সূত্র জানিয়েছে, ফাইল চুরির ঘটনায় এ পর্যন্ত ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। যাদের মধ্যে টোটনই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সরকারি কর্মী নন।এদিকে নথি চুরির ঘটনাকে অনাকাক্সিক্ষত বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। গতকাল এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় আমরা ক্ষুব্ধ। এ ব্যাপারে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার নিয়েছি। আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, পুলিশ তদন্ত করছে। তদন্ত করে যা যা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, আমরা তা নেব।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন স্বাস্থ্যের ঠিকাদার নাসিমুল গণি টোটন। তবে শিক্ষকতা তিনি ছেড়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি স্বাস্থ্য খাতের ঠিকাদারির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ সময়ে অসাধু প্রক্রিয়ায় ঠিকাদারির মাধ্যমে তিনি আয় করেছেন হাজার কোটি টাকা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরর কয়েকজন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা জানান, পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করেন টোটন। এগুলো হলো- আল হারমাইন ইন্টারন্যাশনাল, প্যারাগন, মেসার্স মাইক্রো ট্রেডার্স, মেসার্স টোটন ফার্মেসি ও মেসার্স পোলেন। প্রায় দুই দশক ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি দেশের অনেক জেলায় স্বাস্থ্যের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন জেলা হাসপাতালের এমএসআর (মেডিক্যাল সার্জিক্যাল রিকুইজিট) কাজ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। টোটন যেসব জেলায় এবং যেসব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ঠিকাদারি করেন সেখানে অন্য কোনো ঠিকাদার টেন্ডারেই অংশ নিতে পারেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি হাসপাতালের এমএসআর মালামাল সরবরাহ করেন। এমএসআরের মধ্যে মূলত গজ, ব্যান্ডেজ, তুলা, সুই, সুতা ইত্যাদি সরবরাহ করা হয়। এ ব্যবসায় সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো মালামাল সরবরাহ না করেই বিল তুলে নেওয়া যায়। এ মালামালের কোনো হিসাবও থাকে না।

জানা গেছে, ঠিকাদারির মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক হওয়া টোটন গত বছর দেশের এক সুপরিচিত রাজনীতিককে কোটি টাকা দামের একটি গাড়ি উপহার দেন। বর্তমান সরকারের একজন মন্ত্রীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। এ মন্ত্রীকেও নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকেন। কথিত আছে, অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে স্বল্প পরিমাণ বিলের টাকা তিনি অনেক সময় তোলার প্রয়োজনই মনে করেন না।

স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে জানান, বর্তমান সরকারের আগের মেয়াদে তার প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিল আটকে পড়ে। সম্প্রতি এ বিলগুলো তিনি ছাড় করাতে সক্ষম হন। অসাধু প্রক্রিয়ায় এ বিল ছাড় করানো হয়ে থাকতে পারে। তাই এ সংক্রান্ত তথ্য প্রমাণ মুছে দিতেই ফাইল চুরির ঘটনা ঘটতে পারে। তবে আরেকটি সূত্র জানায়, স্বাস্থ্যের আরেক প্রভাবশালী ঠিকাদারের সঙ্গে টোটনের এক সময় সখ্য ছিল। এমনকি বনানী ডিওএইচএস-এ তারা একই ভবনে ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। তবে বেশ কিছুদিন ধরে তাদের সম্পর্কে শীতলতা দেখা দিয়েছে। তাই ওই প্রভাবশালী ঠিকাদারেরও এ ক্ষেত্রে সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।

টোটনের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একাধিক অভিযোগ করেছেন অন্যান্য ঠিকাদার। গত ৭ সেপ্টেম্বর মমতাজ এন্টারপ্রাইজের মো. মাহবুবুর রহমান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। ২৫০ শয্যার মানিকগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের এমএসআর টেন্ডারে দরপত্র বিক্রি এবং দাখিলে অনিয়ম, অপতৎপরতা ও অরাজকতা প্রসঙ্গে এ অভিযোগ করেন তিনি। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মানিকগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে এমএসআর টেন্ডার দরপত্র কিনতে গেলে অফিস ও ঠিকাদারের সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেট বিভিন্ন অজুহাতে সিডিউল কিনতে দেয়নি। এ সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে অরাজকতা করে আসছে।

মো. নাঈম হোসেন নামের একজন দুদক চেয়ারম্যানকে অভিযোগ জানান। সেখানে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য সেক্টরে গত ১৫ বছর যাবৎ একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট নানা অনিয়মের মাধ্যমে অরাজকতা করে আসছে। এ সিন্ডকেটের কারণে এমএসআর টেন্ডার সিভিল সার্জন অফিস থেকে উপজেলায় দেওয়া হয়েছে।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর অভিযোগ জানায় মেসার্স শাহিন ফার্মেসি। সেখানে বলা হয়, ‘সোনালী ব্যাংক মহাখালী শাখা থেকে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ৬টি গ্রুপের সাড়ে ৪ হাজার টাকার চালান করি এবং চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের তত্ত্ববধায়ক বরাবর দরখাস্ত করি। কিন্তু পরপর তিন দিন সেখান থেকে বলা হয় সিডিউল পরে দেবে। এমনকি ফোন দিয়ে হুমকি-ধমকিও দেওয়া হয়। কিন্তু কোনোভাবেই সিডিউল কেনা সম্ভব হয়নি।’ একই সময় একই ধরনের অভিযোগ জানায় ‘ইএন ট্রেড ইন্টারন্যশনাল’। সংশ্লিষ্টরা জানান, এভাবেই দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জেলায় স্বাস্থ্যর ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করছেন টোটন।

বর্তমানে সিআইডি হেফাজতে থাকায় এসব অভিযোগের বিষয়ে টোটনের বক্তব্য নেওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলম আমাদের সময়েক বলেন, ‘প্রতিদিন অসংখ্য অভিযোগ আসে। এ ধরনের অভিযোগের কথা এ মুহূর্তে মনে করতে পারছি না।’

জিজ্ঞাসাবাদে একেক রকম তথ্য দিচ্ছে কর্মচারীরা

চুরি হওয়া ১৭টি নথি উদ্ধারকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত পরিচালনা করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সংস্থাটির তদন্ত কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত ফাইলের কোনো হদিস পাননি। তবে চুরির ঘটনার রহস্য উৎঘাটনে এক ঠিকাদারসহ ১০ জনকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করছেন সিআইডি কর্মকর্তারা। জিজ্ঞাসাবাদে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের কর্মচারীরা একেক সময় একেক রকম তথ্য দিচ্ছেন।

সিআইডির কর্মকর্তারা বলেছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ১৭টি নথি চুরির ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করে সিআইডি। তদন্তের শুরুতে গত রবিবার সিআইডি কর্মকর্তারা স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগ থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন এবং সন্দেহভাজন হিসেবে ৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিআইডি মালিবাগ কার্যালয়ে নিয়ে আসে। সেখানে তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন তারা। তাদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তিতে সোমবার বিকালে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের আরও ৩ কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিআইডি কার্যালয়ে আনা হয়।

সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, নথি চুরির ঘটনায় যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, তারা একেক সময় একেক কথা বলছেন। তারা সত্য কথা বলছেন না। তারা যে তথ্য দিচ্ছে সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগ থেকে নথির চুরি ঘটনাটি পরিকল্পিত। কারণ একসঙ্গে এতগুলো নথি একজনের মানুষের পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। যদি একজন ব্যক্তি একসঙ্গে নথিগুলো নিত, তা হলে সেটি কারও নজরে আসত। আবার বাইরের কোনো ব্যক্তির পক্ষে মন্ত্রণালয় কর্মচারীদের সহায়তা ছাড়া নথিগুলো নেওয়া সম্ভব নয়।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের যে কক্ষ থেকে নথি চুরি হয়েছে সেখানকার সিসিক্যামেরা সেপ্টেম্বরে অকোজো করা হয়। ওই কক্ষে কাদের যাতায়াত ছিল, তাদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। শুধু সিসি ক্যামেরা নয়, আরও অনেকগুলো ফ্যাক্টর থেকে নথি চোরচক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। নথি চুরির ঘটনায় সন্দেহভাজনদের তালিকায় আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে, যাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিআইডি কার্যালয়ে আনা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘নথি চুরির ঘটনায় অগ্রগতি হলে একটি মামলা দায়ের করা হবে। তবে মামলা সিআইডি মামলা করবে না। এ ঘটনায় শাহবাগ যে জিডি করা হয়েছে, সেটি মামলায় রূপান্তর হবে।’ যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে তাদের কেউ কেউ মামলার আসামি হতে পারে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

সিআইডির মেট্রো শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে তদন্ত শুরু হয়। এ তদন্তের সঙ্গে সংস্থাটির ফরেনসিক, এলআইসি, আইন, গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তারা যুক্ত আছেন। সিআইডির একটি টিম নথি চুরির ঘটনার তদন্তে রবিবার স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের ঘটনাস্থল পরির্দশন করে আলামত সংগ্রহ করেন। এ সময় সিআইডির ক্রাইমসিনের সদস্যরা ১৩ জনের আঙুলের ছাপ নেন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করেন।