৫ জনকে গ্রেপ্তার মূল হোতাসহ স্থায়ী বহিষ্কার ২জন

14

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-৭ (র‌্যাব) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় জড়িত ৬ জনের মধ্যে মূল হোতাসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গতকাল শনিবার এই তথ্য নিশ্চিত করে র‌্যাব-৭ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) নুরুল আফসার বলেন, শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে চবি শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় ৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। এরপর শনিবার বিকালে অভিযুক্ত দুই সাইফুল থেকে এক সাইফুলকে গ্রেপ্তার করেছি নগরীর বহদ্দারহাট থেকে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো চবির ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মো. আজিম (২৩), নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র নুরুল আবছার বাবু (২২), হাটহাজারী কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. নুর হোসেন শাওন (২২), একই কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মাসুদ রানা ও একই কলেজের সাইফুল। জড়িতরা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী বলে জানা যায়। এদের মধ্যে চবির দুই শিক্ষার্থীকে স্থায়ী বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ভুক্তভোগীদের মোবাইল সেট উদ্ধার করে র‌্যাব। এর আগে গত শুক্রবার রাত ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আমানত হলে তল্লাশি চালানো হয়। জড়িতদের একজন হলে অবস্থান করছে-এমন সংবাদের ভিত্তিতে তল্লাশি করা হলেও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। গত ১৭ জুলাই রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন সংলগ্ন এলাকায় দুর্বৃত্তদের হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হন এক ছাত্রী। ওই সময় সঙ্গে থাকা তার বন্ধুকেও মারধর করা হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় তাদের মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ। পরে এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ছাত্রী প্রক্টর বরাবর অভিযোগ দিলে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এছাড়া অজ্ঞাতনামা ৫ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেছেন ওই ছাত্রী।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ : যৌন নিপীড়নের ঘটনার জেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ছাত্রী হেনস্তা প্রতিবাদ এবং নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার দিনভর শিক্ষক, সাধারণ শিক্ষার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন। শুক্রবার রাতে চবি রেলস্টেশনে প্রতিবাদী গানের আসর করে শিক্ষার্থীরা। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করা ও বিচারের আওতায় আনায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে শিক্ষার্থীরা।
সেই রাতে যা ঘটেছিল : র‌্যাব-৭ এর তথ্য মতে, অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বলে র‌্যাব জানতে পেরেছে, সেদিন রাত দশটা থেকে সাড়ে দশটার দিকে ওই ছাত্রী তার এক ছেলে বন্ধুসহ হলের দিকে ফিরছিলেন। আজিম ও তার গ্রুপটি মোটরসাইকেল নিয়ে রাতে ঘোরাঘুরি ও আড্ডা দিতে থাকে। মোটরসাইকেল দুটি ছিল সাইফুল ও শাওনের। ঘোরাঘুরির সময় হঠাৎ তাদের নজরে আসে, একটি ছেলে ও একটি মেয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনের দিক থেকে হেঁটে আসছে। জায়গাটি একটু নির্জন। শুরুতে তারা গিয়ে ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন করেন। ছাত্রীর ছেলে বন্ধুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন না। অভিযুক্তরা তাদের কাছে গিয়ে এত রাতে বাইরে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করেন। ছেলে বন্ধুর কাছে দাবি করা হয় চাঁদা। এক পর্যায়ে তাদের মোবাইল কেড়ে নেয়া হয়। তখন তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। পরে ছয়জন তাদের ওপর চড়াও হয়। ছেলেটিকে আটকে রেখে মেয়েটিকে তারা নির্যাতন করে। প্রথমে চড় থাপ্পড় মারে, তারপর বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণের চেষ্টা করে। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, ভ্যানিটি ব্যাগ ও টাকা পয়সা নিয়ে নেয়ার পর তারা (জড়িতরা) ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
র‌্যাব আরও জানায়, তখন ভুক্তভোগীরা একটি হলে গিয়ে এক ছাত্রের মোবাইল থেকে ফোন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অভিযোগ জানায়। ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত না দাবি করে তিনি বলেন, এখানে আমরা কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা পাইনি। যার নেতৃত্বে ঘটনা ঘটেছে, আজিম, সে অকপটে বলেছে, ঘটনাটি ঘটেছে তাৎক্ষণিক। কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না বা মেয়েটিকে টার্গেট করার কোনো প্ল্যান ছিল না। এমনকি মেয়েটিও আমাদের বলেছে, সে আজিমকে আগে থেকে চিনত না।
জড়িতরা সবাই ছাত্রলীগ কর্মী : জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃত ৫ জনই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত। এর মধ্যে মো. আজিম শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেলের (সিএফসি) অনুসারী। শাওন, বাবু ও সাইফুল ভার্সিটি এঙপ্রেসের অনুসারী ও তাদের সভা-সমাবেশে যোগদান করেন বলে জানা যায়। মাসুদ রানা সিঙটি নাইনের আরেকটি উপ-গ্রুপ নাইনটি সিঙের রাজনীতিতে যুক্ত।
র‌্যাব জানায়, অভিযুক্ত সবাই বলছে তারা ছাত্রলীগ সমর্থন করে। কিন্তু তাদের কোনো পদ-পদবি নেই। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী একেকজন একেক গ্রুপ সমর্থন করে।
তবে ভার্সিটি এঙপ্রেসের নেতা প্রদীপ চক্রবর্তী দুর্জয় অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী না হলে আমাদের অনুসারী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর আমরা শুরু থেকেই এ ঘটনার বিচার চেয়ে আসছি।
শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল বলেন, এর মধ্যে একজন আমার অনুসারী। এরা কখনো ছাত্রলীগের রাজনীতিতে আসতে পারবে না।
২ জন স্থায়ী বহিষ্কার : ছাত্রী নিপীড়নের ঘটনায় জড়িত থাকায় ২ ছাত্রকে আজীবন বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব হেলথ, রেসিডেন্স অ্যান্ড ডিসিপ্লিনারি কমিটির বিশেষ সভায় তাদের বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কৃতরা হচ্ছেন ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আজিম ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নুরুল আবছার বাবু।
সহকারী প্রক্টর ড. শহীদুল ইসলাম বলেন, ডিসিপ্লিনারি কমিটির সভায় গ্রেপ্তারকৃত দুই শিক্ষার্থীকে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পলাতকদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকলে তাদের ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর হবে। তিনি বলেন, জড়িতদের মধ্যে যারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নয় তাদেরও যেন একই শাস্তি নিশ্চিত হয় সেজন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা হবে। এদের সবার চিরদিনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
উপাচার্যের বক্তব্য : চবি উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার বলেন, আমাদের ছাত্রী হেনস্তার ঘটনায় জড়িত অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। আমরা আগেও বলেছি, অপরাধী যেই হোক শাস্তি পাবেই। তিনি বলেন, আমি ঘটনার দিন ঢাকায় ছিলাম। এ ঘটনায় আমাদের প্রক্টরিয়াল বডি, তদন্ত কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করেছে।