২০১৪ সালের মার্চ।  বেশিদিন আগের কথা নয়।এ সময়ে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে ইউকিপ দলের সদস্য নিকি সিনক্লেয়ার ‘বোমা’ ফাটালেন। তিনি প্রকাশ্যে দাবি করে বসলেন, আনাবেলে ফুলার হলো ‘ফারাজের রক্ষিতা’। এমন অভিযোগের তাৎক্ষণিক জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানান ফারাজে। এ নিয়ে নিক্কি সিনক্লেয়ারের সঙ্গে তীব্র বাদানুবাদ হয় ফারাজের।

 এরপর পাশেই একটি পাব ‘দ্য ফেদারস’-এ যান আনাবেলে ফুলার। সেখানে তিনি মুখোমুখি হন নাইজেল ফারাজের স্ত্রী কিরস্টেন মেহর-এর মধ্যে। দ্বিতীয় দফায় এ নিয়ে তাদের মধ্যে উত্তপ্ত তর্কবিতর্কের পর আনাবেলে ফিরে যান উত্তর লন্ডনে তার বাসায়। সেখানে গিয়ে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এ সময়ে তার বন্ধুবান্ধবরা তাকে ফোন করেন। কিন্তু তাকে পাওয়া না যাওয়ায় তারা তার বাসায় গিয়ে হাজির হন। অ্যাম্বুলেন্স ডাকেন। তখনও ফারাজের সঙ্গে গোপন যৌন সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে যাচ্ছিলেন আনাবেলে ফুলার। তিনি বন্ধুদের বলেছিলেন, আত্মহত্যা করতে চেয়েছেন তিনি। হাসপাতালে নেয়ার পর সেখানে আমার জ্ঞান ফেরে। কিন্তু আমার বাহু দেখে আমি বিস্মিত হই। মনে করি এটা একটা কাটার চিহ্ন। এমন দিনের পর আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছিলো না। আমার নিজেকে কোনোভাবেই সুখী মনে হচ্ছিল না। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর আমার মনে হচ্ছিল এটা একটি আদর্শ হতে পারে না। আমার মনে হলো কাউকে বললে, মনে করবে আমি মিথ্যে কথা বলছি।
এ ঘটনা নিয়ে তোলপাড় হয় ওই সময়ের রাজনীতি। ২০১৪ সালের মে মাসে ইউরোপিয়ান নির্বাচনে লেবার ও কনজারভেটিভ দলকে  পেছনে ফেলে ২৪ আসনে বিজয়ী হয় ফারাজের দল ইউকিপ। এ বিজয়ের পর লন্ডনের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সেন্ট জেমস পার্কের কাছে বিজয় সেলিব্রেট করার অনুষ্ঠান হয়। সে সময় ওই অনুষ্ঠান থেকে বের হয়ে যেতে বলা হয় আনাবেলে ফুলারকে। লন্ডনের দ্য টেলিগ্রাফ ২০১৪ সালের ৯ই জুন একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এর শিরোনাম ‘অনুষ্ঠান থেকে নাইজেল ফারাজের রক্ষিতাকে বের করে দিলেন তার স্ত্রী’। ওই রিপোর্টে বলা হয়, ইউকিপ দলের বিজয়ের পর প্রচণ্ড ঝগড়া হয় আনাবেলে ফুলার ও নাইজেল ফারাজের স্ত্রী কিরস্টেন মেহর-এর মধ্যে। এরপর ফারাজের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক থাকা আনাবেলে ফুলার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। ওই সময়ে তার বয়স ৩২ বছর। তিনি বলেন, অতিমাত্রায় মাদক সেবন করেছিলেন। হাত কেটে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু হাসপাতালে নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছেন। ওয়েস্টমিনস্টারে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে দলীয় উদযাপন অনুষ্ঠান থেকে আনাবেলে ফুলারকে বের করে দেন কিরস্টেন মেহর। এরপরই তিনি এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ওই সময় আনাবেলে ফুলার বলেন, মেহর তাকে বলেছিলেন- আমাকে বলা কিরস্টেন মেহরের নির্দেশে নাইজেলের নিরাপত্তা রক্ষীদের একজনকে দিয়ে বলা হলো অনুষ্ঠান থেকে চলে যেতে। বলা হলো- তুমি যদি নিজের ইচ্ছায় এখান থেকে বের হয়ে না যাও তাহলে সিকিউরিটি ডাকা হবে। তারা আমার চুল ধরে টেনে বের করে দেবে।  কোনো ‘সিন’ ক্রিয়েট না করে আমি বের হয়ে যাই। আমাকে আমার সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধব, যাদেরকে আমি অনেক বছর ধরে চিনি, তাদের সামনে এভাবে অপমান করা হয়। আমি জানতাম বাইরে অবস্থান করছে অনেক টেলিভিশন ক্যামেরা ও সাংবাদিক। আমাকে অপমান করা হলো। লজ্জায় আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছিল। এ কারণেই আমি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলাম। আমি জানতাম এতে নাইজেলের কোনো হাত ছিল না। তাই আমি তাকে ফোন করলাম। জানতে চাইলাম- এসব কি হচ্ছে?
আমার ফোন পেয়ে নাইজেল ফারাজে উপস্থিত হলেন। তিনি আমাকে আলিঙ্গন করছেন। তখন অঝোরে কাঁদছি আমি। এমনভাবে কাঁদলাম, যা আমি আগে কখনো কাঁদি নি।
সব শুনে ফারাজে বললেন- ‘আই অ্যাম সরি’।
আনাবেলে ফারাজে ওই অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে বাসায় গিয়ে নিজের হাত কেটে ফেলেন। সিগারেট দিয়ে হাতের বিভিন্ন স্থান পুড়িয়ে ফেলেন। তারপরও নাইজেল ফারাজে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক অব্যাহত রাখেন। আনাবেলে ফুলার বলেন, ২০১৫ সালের কথা। তখন উইল্টশায়ারে আমার বাসা। এখানেই একদিন উঠে এলেন নাইজেল ফারাজে। তার মাথায় বেসবল ক্যাপ। তাতে চোখ ঢেকে ছিল। তিনি আমার কাছে এসে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের আবেদন জানালেন। আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই নি। সাফ বলে দিলাম- না। এটা হবে না। কিন্তু যথারীতি নাইজেল ছিল নাছোড়বান্দা। তিনি পূর্ণাঙ্গ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে তবেই চলে গেলেন। চলে যাওয়ার পর আমার মনে হতে থাকলো যেন আমি এক ইতর নারী। এরপর ব্রাসেলসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্যদের অফিসে তিনি আমার সঙ্গে আবার যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন ২০১৬ সালে। নাইজেল ফারাজে ভেতরে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দিলেন। শুয়ে পড়লেন একটি সোফার ওপর। আমরা কথা বলতে শুরু করলাম। এমন এক পর্যায়ে তিনি নিজের আবেদন প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, ‘হি ওয়াজ হর্নি’। ফারাজে বেশির ভাগ সময়ই বলতেন- আমি বিষাদ বোধ করছি। এ জন্য তিনি আমাকে বলতেন হাত দিয়ে তাকে ম্যাসাজ করে দিতে। আমাদের শারীরিক সম্পর্কের পর সব সময়ই এটা করতে হতো আমাকে। তবে সর্বশেষ আমাদের শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন হয় ২০১৬ সালের ৪ঠা অক্টোবর স্ট্রাসবুর্গে। তখন আমি অফিসে একা। এ সময় তিনি ভেতরে প্রবেশ করলেন। আমাকে চুমু দিলেন। আমি আসলে তার ভালোবাসা চেয়েছিলাম সেদিন। তিনি যেমনটা বলেছিলেন ওইদিন আমি তেমনটাই করেছি। আমার ভেতর পরে খুব খারাপ লাগতে শুরু হলো। পরের দিন শুনতে পেলাম ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন তদন্তে নামছে। আমি সরে গেলাম। আমার মনে হলো জীবন অর্থহীন। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে লেডিস টয়লেটে গিয়ে আমি হাতের কব্জি কেটে ফেললাম। তারপর যেতে হলো ফ্রান্সের হাসপাতালে।
এরপর এ কাহিনী চাপিয়ে রাখতে তার ওপর চাপ ছিল। এ চাপ আরো তীব্র হয় যখন অভিযোগ ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে ছড়িয়ে পড়ে। এ বিষয়ে আনাবেলে ফুলার বলেন, আমরা দু’জনেই যদি আমাদের সম্পর্কের কথা গোপন করে যাই, অস্বীকার করি তাহলে মিডিয়ায় আসবে না। এতে মিডিয়াকে বাইরে রাখা যাবে। ওয়েস্ট কান্ট্রিতে আমার বাগানে দাঁড়িয়ে এ নিয়ে ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে অনেকবার আমরা আলোচনা করেছি। এ সময়ে নাইজেল আমাকে বার বার বলতে থাকেন, ব্রেক্সিট শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদেরকে যেকোনো বিতর্ক থেকে দূরে থাকতে হবে। একবার একজন আমাকে ফোন করে বললেন, তুমি তো শেষ হয়ে গেছো। আমিও তো তাই মনে করি। মনে করি আমি একটা স্টুপিড মেয়ে। আমার মনে হতে থাকে একটি টিস্যু পেপারের মতো। প্রয়োজনের  সময় ব্যবহার করে তারপর যা ফেলে দেয়া হয়। তাই আমি এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি সত্য বলার, যাতে আমি আমার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাই। আগের জীবন নিয়ে আমি বিরক্ত। আমি কে- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি নিজেই লজ্জিত হই। ক্লান্ত হই।
আনাবেলে ফুলারের এমন সব অভিযোগের বিষয়ে নাইজেল ফারাজের কাছে ২০১৭ সালের ১০ই নভেম্বর জানতে চান দ্য ডেইলি মেইলের সাংবাদিক। তিনি আনাবেলে ফুলারের সঙ্গে এমন সম্পর্কের কথা এ সময় স্বীকারও করেন নি। আবার প্রত্যাখ্যানও করেন নি। তিনি একটি বিবৃতি দেন। এতে বলা হয়, মিস ফুলার যখন দলীয় কাজে নিয়োজিত ছিলেন তখন দলে কোনো মানসিক সমস্যাগ্রস্ত বা অন্যান্য মারাত্মক কোনো সমস্যাগ্রস্ত কোনো ব্যক্তি ছিলেন কিনা তা জানা ছিল না। ‘আমি সব সময়ই তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। তার সক্ষমতা আছে এটা বোঝাতে চেয়েছি। অনেক সময় তাকে বরখাস্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছি’।
Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031