পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনীতিকদের আনুষ্ঠানিক ব্রিফ করেছে। মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় রোববার বিকাল চারটার দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কূটনীতিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। প্রথমে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে এবং পরে মুসলিম দেশের কূটনীতিকদের আলাদাভাবে ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ায় বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ে এখন যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে কীভাবে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করা যায়, এ নিয়ে ব্রিফিংয়ে আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় এ সমস্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা প্রবেশ বন্ধে সরকার কি পদক্ষেপ নিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আমরা কি করব? আমরা তো যুদ্ধ করব না। যুদ্ধ করলে আমাদের উন্নয়ন ধ্বংস হয়ে যাবে। যুদ্ধ তো এর সমাধান নয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে আগামী ১৭ই সেপ্টেম্বর। সেখানে কথা হবে। সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটি অর্থাৎ মানবাধিকার কমিটির সঙ্গে কাজ করছি। তখন আপনারা দেখবেন। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদস্বরূপ বাংলাদেশ কঠোরভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে বলে দাবি করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের অব্যাহত চাপে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, আমরা ওখানে যেতে পারছি না। কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রবেশের হার কমেছে।
কূটনীতিকদের সঙ্গে ব্রিফিংয়ে সবাই বাংলাদেশের সমর্থন দিয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অন্যান্য দেশের মতো আমরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। কারণ সন্ত্রাসী কার্যক্রম আমরা সমর্থন করি না। নিরীহ মানুষকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে এটার সবাই নিন্দা করেছেন। তারা বলেছেন- এটা গ্রহণযোগ্য না। এটা থামাতে হবে। বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশের জনগণ যেভাবে তাদের আশ্রয় দিয়েছে এটা সবাই এক বাক্যে প্রশংসা করেছে। বিভিন্ন দেশের বিবৃতি পড়ে শোনান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এসময় তিনি বলেন, গোটা পৃথিবী তো আমাদের সঙ্গে আছে। আমাদের পক্ষে আছেন এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পক্ষে। সবাই বলেছেন যে, এটা বন্ধ করতে হবে। এই অত্যাচার এবং তাদেরকে এভাবে হত্যা করা হচ্ছে। অনেকেই বলেছে- এটা গণহত্যা। এটা বন্ধ করতে হবে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে রোহিঙ্গাদের সহায়তা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম জানান, কক্সবাজারের একটা বনাঞ্চলের গাছ কেটে জমি তৈরি করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর কাছে ওই জমি বুঝিয়ে দেয়া হবে। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা তাঁবু দিয়ে সেখানে আশ্রয়ণ তৈরি করা হবে। ওয়ার্ল্ড ফুড গ্রাম নতুন আসা এক লাখ রোহিঙ্গাকে তাদের আওতায় নিয়েছে।
কূটনীতিকদের কাছে ব্রিফিংকালে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের গৃহীত পদক্ষেপের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনীতিকদের জানান, বাংলাদেশে সম্প্রতি তিন লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। এর আগে গত তিন দশক ধরে চার লাখ রোহিঙ্গা এই দেশে অবস্থান করছে। এই পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এর আগে ১৯৯২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। কূটনীতিকদের কাছে ব্রিফিংকালে প্রস্তাবিত মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত নিরাপত্তা চুক্তির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। ২০১৪ সালে প্রস্তাবিত এ চুক্তিতে সীমান্তে যৌথ সমীক্ষা, যৌথ টহল সমন্বয়, যৌথ অভিযানের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে মিয়ানমার এই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। বরঞ্চ তারা তাদের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীদের চেক পোস্টে হামলাকারীদের ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ এবং রোহিঙ্গাদের ‘বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বলে বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা চালিয়েছে। ব্রিফিংয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত আনান কমিশনের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে যে সুপারিশগুলো এসেছে সেগুলোর উদ্ধৃতি দিয়ে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মহলকে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানানো হয়। এসময় আন্তর্জাতিক মহলের কাছে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সাহায্যের আবেদন করা হয়। রোহিঙ্গা ভাসান চরে স্থানান্তর এবং সর্বোপরি তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে স্থায়ীভাবে ফেরত পাঠানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রাজনৈতিক সমর্থন চাওয়া হয়। ব্রিফিংয়ে কূটনীতিকরা সহিংসতার কারণে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেন। তারা বেসামরিক লোকজনের নিরাপত্তা প্রদান এবং সামরিক অভিযানকালে সামঞ্জস্যহীন বলপ্রয়োগ বন্ধের আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় অনুষ্ঠিত দুই দফায় কূটনীতিকদের কাছে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়। প্রথম দফায় অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, তুরস্ক, রাশিয়া, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, স্পেন, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতগণ এবং জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী, ইউএনএইচসিআর, ডব্লিউএফপি, ইউনিসেফ, আইওএম, আইসিআরসি’র প্রতিনিধিগণ ব্রিফিংয়ে অংশ নেন। পরবর্তীতে মিশর, ইরান, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, মরক্কো, ওমান, ফিলিস্তিন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কূটনীতিকগণের কাছে ব্রিফ করা হয়।
| M | T | W | T | F | S | S |
|---|---|---|---|---|---|---|
| 1 | ||||||
| 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 |
| 9 | 10 | 11 | 12 | 13 | 14 | 15 |
| 16 | 17 | 18 | 19 | 20 | 21 | 22 |
| 23 | 24 | 25 | 26 | 27 | 28 | |
