আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইল ক্রমেই গাঁটছড়া বাঁধছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ ক্রমেই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বাহরাইনের বাদশাহ হামাদ বিন ইসা আল খলিফার ছেলে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যানজেলেসে ইসরাইল-পন্থী বলে পরিচিত একটি জাদুঘর সফর করেছেন তিন দিন আগে। এরপর এবার ওই শহরের সাইমন উইসেন্থাল সেন্টারে এক অনুষ্ঠানে খোদ বাদশাহই আরব দেশগুলোর ইসরাইল বয়কটের নিন্দা জানিয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে বাহরাইন সফর করেছিলেন ইহুদী রাবাই মার্ভিন হেয়ার। মার্ভিন হেয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রার্থনা করেছিলেন। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনিই বাহরাইনের বাদশাহর ওই অবস্থানের কথা প্রকাশ করেন।
ইসরাইলের পক্ষে এমন স্পর্শকাতর অবস্থান এমন সময় বাহরাইনের বাদশাহ প্রকাশ করলেন যখন আরব বিশ্বে দেখা দিয়েছে নতুন মেরুকরণ। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আরব জোটের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থেকেই এর সূত্রপাত। প্রতিবেশী আরব দেশ কাতারের সঙ্গে সৌদি জোটের সাম্প্রতিক বিরোধ ওই বৈরিতাকে উস্কে দিয়েছে। এমনই সংবেদনশীল সময়ে বাহরাইনের বাদশাহর এমন অবস্থান নিশ্চিতভাবেই বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের আরব বসন্তের ঝড় বাহরাইনকেও ছুঁয়ে যায়। দেশটিতে শিয়া জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শাসন করছে সুন্নি রাজবংশ। আরব বসন্তের সময় গজিয়ে উঠা আন্দোলনের মুখে তখন রাজ পরিবারের মসনদ টলে ওঠে। কিন্তু প্রতিবেশী বাহরাইনে অস্থিতিশীলতা দমনে সৈন্য পাঠিয়ে নিষ্ঠুরভাবে জনবিক্ষোভ দমনে রাজপরিবারকে সাহায্য করে সৌদি আরব। সেবার শিয়া বিক্ষোভের পেছনে স্বাভাবিকভাবেই ইরানকে দায়ী করে বাহরাইন ও সৌদি আরব। কিন্তু এর পেছনে সুন্নি কাতার ও দেশটির প্রভাবশালী টিভি চ্যানেল আল জাজিরার ভূমিকা ছিল বলেও দাবি করেছিল বাহরাইন। কাতার ওই অভিযোগ অস্বীকার করলেও, দেশে দেশে আরব বসন্ত-উদ্ভূত আন্দোলনের প্রতি আল জাজিরার সহানুভূতিশীল থাকার কথা একপ্রকার সুবিদিত।
অপরদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবানন ও ইরাকে দেশটির তুঙ্গে উঠা প্রভাব নিয়ে তীব্র অস্বস্তিতে ছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব দেশগুলো। একই সঙ্গে অস্বস্তিতে ছিল ইসরাইলও। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও লেবাননের ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ নিয়ে ইসরাইলের মাথাব্যাথা ছিল সবচেয়ে বেশি। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ইরানের ক্রমেই জড়িয়ে যাওয়া নিয়েও উদ্বিগ্ন ছিল এসব দেশ।
কিন্তু সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মার্কিন প্রশাসন ইরানের সঙ্গে সামরিক দ্বন্দ্বে না গিয়ে সমঝোতার পথ বেছে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইল, সৌদি ও আরব আমিরাতের তীব্র আপত্তি, বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও মার্কিন প্রশাসন নিরাপত্তা পরিষদের অবশিষ্ট ৪ দেশ ও জার্মানি সমেত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বাতিলের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা ছাড়ে সম্মত হয়। অপরদিকে সিরিয়ায় রাশিয়ার হস্তক্ষেপে মোটামুটি ইরান সমর্থিত আসাদ সরকার টিকে গেছে। পিছু হটেছে সৌদি ও পশ্চিমা সমর্থিত বিদ্রোহীরা।
কয়েক মাস আগে সৌদি আরবে ডনাল্ড ট্রাম্পের সফরের পর আকস্মিকভাবেই কাতারকে নিয়ে নতুন উত্তেজনা শুরু হয়। সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগ এনে দেশটির সঙ্গে সব ধরণের যোগাযোগ ছিন্ন করে দেয় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। বৈরি পরিস্থিতি কাতার সামাল দেয় ইরান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে।
কিন্তু এই পরিস্থিতিতে গোটা সমীকরণে পাকাপাকি স্থান করে নেয় ইসরাইল। কারণ হলো একাধিক। অনেকদিন ধরেই ইসরাইলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক ছিল, তবে গোপনে। আরব নেতাদের সঙ্গে ইসরাইলি কূটনীতিকদের গোপন যোগাযোগের কথা অনেকবারই জানা গেছে। কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ইস্যুতে এই দেশগুলো ইসরাইলের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্কও বজায় রাখে। তবে ফিলিস্তিন ইস্যুতে জনরোষ এড়াতে আরব দেশগুলো এই সম্পর্কের কথা প্রকাশ করা থেকে বিরত ছিল।
অপরদিকে ফিলিস্তিনের গাজা পুনর্গঠনে বিপুল অঙ্কের অর্থ ও সহযোগিতা দিয়ে হামাসের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করে কাতার। এ নিয়েও কাতারকে নিয়ে অসন্তুষ্ট ইসরাইল। এছাড়া ইরানের সঙ্গে কাতারের ঘনিষ্ঠতাও স্বাভাবিকভাবেই ভালো চোখে নেয়নি দেশটি।
অপরদিকে তুরস্কে মুসলিম ব্রাদারহুড ঘরানার রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান এমনিতেই ছিলেন আরব বিশ্বের চোখের কাটা। এরদোগানের সরকারকে হটাতে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি ক্রমেই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন। ব্রাদারহুডের প্রতি সহানুভূতিশীল কাতারের সঙ্গে আগে থেকেই দেশটির সম্পর্ক ভালো। চলমান সংকটে এই সম্পর্ক আরও জোরদার হয়। সম্ভবত, এ কারণেই ইরাকে স্বাধীন কুর্দিস্তানের দাবিতে হতে যাওয়া গণভোটের একমাত্র সমর্থক ইসরাইল। কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তুরস্কের বিরোধ অনেকদিনের। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই গণভোটের তীব্র বিরোধী তুরস্ক। কিন্তু ইসরাইলই এখন পর্যন্ত এই গণভোটকে সমর্থন করার কথা বলছে।
এমন সময়কেই ইসরাইলের পক্ষালম্বন করার জন্য বেছে নিয়েছেন বাহরাইনের বাদশাহ। ধারণা করা হচ্ছে, ইসরাইলের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক স্থাপনের প্রথম পদক্ষেপ এটি। সাইমন উইসেন্থাল সেন্টারের প্রধান রাবাই আব্রাহাম কুপারকে বাহরাইনি বাদশাহ বলেছেন, ইসরাইল বয়কটের ডাক নিয়ে তিনি বিরক্ত। জেরুজালেম পোস্টের এক খবরে বলা হয়েছে, বাদশাহ এমনও বলেছেন যে, তার নাগরিকদের ইসরাইল সফর করতে কোনো বাধা নেই।
আব্রাহাম কুপার বলেন, ‘যদি আমাকে পূর্বাভাষ দিতে বলা হয়, আমি বলবো আরব বিশ্বের সঙ্গে ইসরাইল রাষ্ট্রের সম্পর্কে নাটকীয় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। আজকে রাতে (বাহরাইনি প্রতিনিধিদলের সম্মানে) ইহুদী সংগঠনের আয়োজিত ডিনারকে কেউই ইসরাইল-পন্থী নয় বলতে পারবে না।’ ফলে বলাই যায়, প্রথম উপসাগরীয় আরব দেশ হিসেবে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথে এগোচ্ছে বাহরাইন। এর পেছনে সৌদি জোটের সায় থাকার সম্ভাবনা শতভাগ। হয়তো বাহরাইন সফল হলেই সামনের দিকে এগোবে অবশিষ্ট আরব দেশগুলো।
গত সপ্তাহে ‘ভয়েস অব ইসরাইল’ রেডিও জানিয়েছে, সৌদি রাজপরিবারের একজন শীর্ষস্থানীয় সদস্য সম্প্রতি রীতিমতো ইসরাইলের তেল আবিব সফরে গেছেন দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য। তার আগে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইউসেফ আল-ওতাইবার ফাঁস হওয়া ইমেইল থেকে দেখা গেছে, তিনি ইসরাইলের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ বজায় রাখছেন। এমনকি ইসরাইল-পন্থী বলে পরিচিত ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস নামে একটি থিংকট্যাংকের সঙ্গে কাতারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সরাসরি বিষয়টি স্বীকার না করলেও, আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা নিয়ে রাখঢাক করছে না ইসরাইল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ফিলিস্তিন ইস্যুতে কোনো রফাদফা না হওয়া সত্ত্বেও, আরব বিশ্বের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো।
ফলে আরব বিশ্বে সম্ভবত পাকাপাকি স্বীকৃতি আদায় করে নেওয়ার পথেই এগোচ্ছে ইসরাইল। আর এক্ষেত্রে ‘ভাতৃপ্রতীম’ ফিলিস্তিনি আরবদের স্বার্থও গোনায় ধরছে না আরব দেশগুলো। তাই, অবধারিতভাবেই, ফিলিস্তিনি আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কী হবে- এটি একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে গেল।

Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031