এই সময়টা খুব অমানবিক। মৃত ব্যক্তির সবচেয়ে প্রিয়জনরা তাদের প্রিয় মানুষটির মুখটা শেষবারের মত দেখতে পারেনা। ছেলে হাত দিয়ে স্পর্শ করতে পারেনা বাবার লাশ, বাবা স্পর্শ করতে পারেনা তার সন্তানের লাশ। একই ছাদের নিচে যাদের সাথে জীবনের পুরাটা সময় কেটে গেছে, সেই প্রিয়জনকে বিদায় দেয়ার রেওয়াজ ওঠে গিয়েছে কোভিডের এই পৃথীবিতে। অতি নিষ্ঠুর আর হৃদয়বিদারক এই ধরণীর অতি করুণ সব নিয়মাবলী।
এই নিষ্ঠুর আর কঠিন সময়ে একজন রাজনীতিবিদের মৃত্যুটা আরোও বেশি বেদনাদায়ক। একজন রাজনীতিবিদের লক্ষ কোটি ভক্ত থাকে। জানা, অজানা, নিরবে নিভৃতে, স্বার্থযুক্ত, স্বার্থহীন অনেক ভক্ত থাকে। সেই ভক্তরা তার শেষ বিদায়ের সময় ফুল নিয়ে তার মরদেহে শ্রদ্ধা জানাতে যাবে, শহীদ মিনারে তার লাশ রাখা হবে, অগণিত মানুষের চোখের জলে বিদায় নিবে।
এ এক পরম সম্মানের বিষয়। শুধু এই সম্মানটুকুর জন্য অনেকে
রাজনীতিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। যদিও বর্তমান সময়ে অনেকেই এ নীতিতে
বিশ্বাসী নন। টাকা উপার্জন এখন রাজনীতি করার মূল প্রেরণাশক্তি।
এই যে
সিলেটের প্রাক্তন মেয়র কামরান সাহেব, উনি সিলেটের লক্ষ কোটি মানুষের
প্রাণের মানুষ। অথচ আজকে উনাকে বিদায় নিতে হবে ভক্তদের ভালবাসা, ও চোখের
জলবিহীন । আমি নিজেও একজন কামরান সাহেবের ভক্ত। এই কোভিড পরিস্থিতি না
থাকলে উনার লাশকে শেষ সম্মান জানানোর জন্য শহীদ মিনারে জড়ো হতাম। আমার
বাড়ি সিলেটে নয়, আমার সাথে উনার কখনো কথা হয়নি, দেখাও হয়নি। কিন্তু আমি
উনার একজন ভক্ত।
বড় নেতা যারা আছে তাদের ভক্ত হওয়া খুবই সহজ, ।
আওয়ামীলীগের গত সম্মেলনের আগের সম্মেলনটা ছিল একটি ঐতিহাসিক সম্মেলন।সেই
সম্মেলনে সৈয়দ আশরাফ ভাইয়ের সেই ব্যক্তব্য সকল আওয়ামীলীগারদের হৃদয় ছুঁয়ে
যায়। সেই সম্মেলনে আমি চিকিৎসা টিমে ছিলাম, এবং সেই সুবাধে সেখানে উপস্থিত
ছিলাম। সেই সম্মেলনের কার্যকরী পরিষদের মানে যেদিন কমিটি ঘোষনা হল
তারপূর্বে অনেক বড় নেতারা বক্তব্য দিচ্ছিলেন। আমি সবার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে
শুনছিলাম, একসময় কামরান সাহেব বক্তব্য দিতে আসলেন। তিনি ব্যক্তব্যের
শুরুতেই বললেন আমি একটা গান দিয়ে ব্যক্তব্য শুরু করব, তিনি “যদি রাত
পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরেনি” এই গানটা দিয়ে শুরু করলেন। এত মমতা নিয়ে
গাইলেন, ঐ সভায় হাজার হাজার মানুষের মধ্যে অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে
পারিনি।দলের সভানেত্রীকেও আমি চোখ মুছতে দেখেছি। মনে হচ্ছিল সত্যিই যদি
বঙ্গবন্ধু ফিরে আসত। সত্যিই যদি আমরা জাতির পিতাকে ফিরে পেতাম । বঙ্গবন্ধুর
প্রতি কত ভালবাসা, কত মায়া, কত আস্থা আর বিশ্বাস জড়ায় ছিল উনার কন্ঠে।
তারপর থেকেই উনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা অনেকগুণ বেড়ে যায়। এককথায় উনার ভক্ত
হয়ে যাই। উনি যখন শেষবার সিলেট মেয়র নির্বাচনে হেরে যান তখন আমার খুব খারাপ
লাগে। উনি সিলেট বাসীর কাছে অনুরোধ করেছিলেন, এটা উনার শেষবার ইলেকশন, উনি
আর কখনো নির্বাচন করবেন না, দয়া করে শেষবার সিলেটবাসীর সেবা করার সুযোগ
দিন, কিন্তু সিলেটের জনগণ দেয়নি বা অনেকে নোংরা রাজনীতি করে ফলাফল চেঞ্জ
করেছেন। আমার মনে হয় সিলেটের জনগণ সারাজীবন এটা নিয়ে আফসোস করবে। শ্রদ্ধা ও
সম্মানের প্রিয় মানুষ বদর উদ্দীন আহমদ কামরান । ওপারে ভাল থাকুন। আমার
মত স্বার্থহীন লক্ষ লক্ষ ভক্তের দোয়ায় আপনি নিশ্চয় ওপারে ভাল থাকবেন।
লেখক
ডাঃ কাওসার আলম
মেডিকেল অফিসার ও রেসিডেন্ট
কার্ডিওলজি বিভাগ, বিএসএমএমইউ
