সরকারবিরোধী আন্দোলনে দলের শীর্ষ নেতারা যখন মাঠে সক্রিয় থাকতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তখন রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এসব নেত্রী। নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন তারা। সংসদের ভেতরে বক্তব্য দিয়ে যেমন গরম রাখতেন, তেমনি দলের হরতালসহ অন্যান্য কর্মসূচিতে সংসদ এলাকাও মাতিয়ে রাখতেন তারা। কখনো কখনো ছুটে আসতেন নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কর্মসূচিতে একাত্মতা জানাতে।

আলোচিত এই নেত্রীরা হলেন নিলোফার চৌধুরী মনি, আসিফা আশরাফী পাপিয়া, রেহানা আক্তার রানু ও শাম্মী আক্তার। তবে কালের পরিক্রমায় এসব নেত্রী দলের সাইডলাইনে আছেন। সবশেষ কাউন্সিলেও তারা পাননি গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদ। যা নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। তাদের কেউ একাদশ সংসদে মনোনয়ন চেয়েও পাননি। আবার সংরক্ষিত আসনে একটি সদস্যপদ বিএনপি পেলেও পুরোনো কাউকে মনোনয়ন দেয়নি দলটি। এতে ধীরে ধীরে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন একসময়ে রাজপথে থাকা এসব নেত্রী। দলের কর্মসূচিতেও তেমন একটা উপস্থিতি চোখে পড়ে না তাদের।

এই চারজনের মধ্যে পাপিয়া এবং মনিকে কিছুটা সক্রিয় দেখা গেছে টেলিভিশন টক শোতে। নিলোফার চৌধুরী মনি অনেকটা নিয়মিত বিভিন্ন টক শোতে দলের পক্ষে কথা বলছেন। তবে রানু আর শাম্মীকে সেই অর্থে কোথাও দেখা যায় না।

রেহানা আক্তার রানু একাদশ নির্বাচনে বিএনপি  চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আসন ফেনী-১ (পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া) থেকে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। তবে তাকে দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি।

রানু বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্যও। নতুন কমিটিতেও তাকে একই পদে রাখা হয়েছে। এছাড়া তিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদক। তবে এখন মূল দল ও নিজ এলাকায় অনেকটা প্রভাব হারিয়েছেন এই নেত্রী।

২০১৩ সালে সংসদে সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনার সময় নানা জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন রানু। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আঞ্চলিক ভাষায় তার ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়া চুদুরবুদুর চইলত ন’ বাক্যটি দেশজুড়ে ঝড় তুলেছিল তখন। এরপর থেকে সভা-সমাবেশে নেতাকর্মীদের কাছে আকর্ষণীয় বক্তার জায়গা দখল করেছিলেন রানু।

তবে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপির পাশাপাশি খালেদা জিয়ার ফেনী-১ আসনের দায়িত্বে থাকায় তার বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, প্রভাব খাটানোর অভিযোগও আছে। এসব কারণে ফেনীতে তিনি ‘ঘষেটি বেগম’ নামে পরিচিত বলে জানা গেছে। সম্প্রতি তাকে দলের কর্মসূচিতেও খুব একটা দেখা যায় না।

নীলফামারীর মেয়ে সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া নিজ এলাকার আবদুলপুর সরকারি কলেজে ছাত্রদলের একটি অনুষ্ঠানে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রনেতা রুহুল কবির রিজভীর প্রশংসা কুড়ান। পরে ১৯৮৬ সালে এইচএসসি পাস করে প্রথমে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। পরে ভর্তি হন আইন বিভাগে। কিছুদিন পর তাপসী হল ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ৮৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ভিপি নির্বাচনে অংশ নেন। একমাত্র নারী নেত্রী ভিপি নির্বাচিত হন তিনি। ৮৯ সালে দ্বিতীয়বার হলের ভিপি নির্বাচিত হন।

এরপর ছাত্রদলের রিজভী-ইলিয়াস কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন পাপিয়া। এরই মধ্যে বিএনপি-প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার আগ্রহে ব্যারিস্টার আমিনুল হকের মধ্যস্থতায় পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় আরেক ছাত্রনেতা হারুন অর রশিদের সঙ্গে। হারুনও তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য।

১৯৯৪ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বারে পেশাজীবন শুরু করেন পাপিয়া। ২০০৪ সালে মহিলা দলের দায়িত্ব ছেড়ে দেন। ওয়ান-ইলেভেনে জরুরি সরকারের আমলে স্বামী গ্রেপ্তার হলে চলে আসেন ঢাকায়। পাপিয়ার স্বামী বিএনপির বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব এবং আলোচিত সাংসদ হারুন অর রশিদ।

২০০৯ সালে ঢাকা বারে প্র্যাকটিস শুরু করেন পাপিয়া। ওই বছরই বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হন, একই সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ওই বছরই সংরক্ষিত আসনে এমপি নির্বাচিত হন তিনি। জানা গেছে, কেন্দ্রীয় অন্যান্য নেতার মতো পাপিয়ার বিরুদ্ধে ৮০টির মতো মামলা রয়েছে। তিনবার কারাবরণও করেছেন তিনি।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে নাটোর-৪ আসন থেকে নির্বাচন করতে চাইলেও দল থেকে মনোনয়ন পাননি পাপিয়া। তবে রাজনীতির বাইরে হাইকোর্টে আইনি পেশায় সময় দিচ্ছেন তিনি।

আরেক জ্বালাময়ী বক্তা হিসেবে পরিচিত নিলোফার চৌধুরী মনির এখন ব্যস্ততা অনেকটা টেলিভিশন টক শো ঘিরে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির এই সহ-সম্পাদক জামালপুর-৫ আসন থেকে গত নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তবে দল থেকে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি।

ঢাকায় অবস্থান করা এই নেত্রীকে জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ দলের ঘরোয়া অনুষ্ঠানে দেখা যায়। এছাড়া নিয়মিত টক শোতে কথা বলেন তিনি।

ঢাবি রোকেয়া হল শাখার ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শাম্মী আক্তার সাংসদ থাকাকালে হেলাল হাফিজের একটি কবিতা বলে সংসদে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিলেন। গত নির্বাচনে হবিগঞ্জ-৪ আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। সাংসদ থাকাবস্থায় বেশ প্রভাব নিয়ে চললেও সবশেষ কাউন্সিলে দলের কেন্দ্রীয় সহ-স্থানীয় বিষয়ক সম্পাদক করা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি মনোনয়নও পাননি। তাকে সেই অর্থে কোথাও দেখা যায় না।

Share Now
March 2026
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031