ভয়ঙ্কর প্রতারক। কখনো তারা ইউএনও, কখনো ডিসি আবার কখনো সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তবে এসবই তাদের নকল পরিচয়। আসল পরিচয়, তারা একেকজন ভয়ঙ্কর প্রতারক। তারা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার হুবহু নম্বর ব্যবহার করে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে। হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা। তাদের টার্গেট জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন অফিসের অধস্তন কর্মকর্তা। কখনো সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দের নামে ঘুষ দাবি করে, আবার কখনো ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলে, আবার কখনো ভয়ভীতি দেখিয়ে এসব টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে বিপাকে পড়ছেন প্রকৃত কর্মকর্তারা। তাদের পরিচয়ে তাদেরই মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে এসব অপকর্ম ঘটায় চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন তারা। অবশেষে উপায় না পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। বুধবার রাত ৯টায় এ ধরনের একটি প্রতারকচক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৪। গতকাল দুপুরে এ ব্যাপারে রাজধানীর কাওরানবাজারস্থ র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় জানানো হয়, বিভিন্ন সময় চক্রটি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মোবাইল নম্বর ক্লোন করে এসব প্রতারণা চালায়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- আশরাফুল ইসলাম ওরফে আপেল (২০), মাহমুদল হাসান ওরফে হৃদয় চৌধুরী (১৯), রাকিবুল ইসলাম, মহিদুল ইসলাম ওরফে মিলন (২০), আবু কাউছার ওরফে সাবু (১৯) ও নাজমুল হাসান (১৯), সাগর হোসাইন (২৬), আমানউল্লাহ আমান (২৮) ও বিল্লাল হোসেন (২১)। এ সময় তাদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক (সিও) লুৎফুল কবীর জানান, গত ১২ই ডিসেম্বর ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেন চানকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মোবাইল নম্বর থেকে ফোন দিয়ে সরকারি প্রকল্প বরাদ্দের কথা বলে বিকাশের মাধ্যমে ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। এ বিষয়ে ঝিনাইগাতী থানায় ১৪ই ডিসেম্বর একটি জিডি করা হয়। গত ৬ই অক্টোবর আশুগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানের মোবাইলে ব্রাক্ষণবাড়ীয়া ডিসির মোবাইল নম্বর থেকে ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলে ৫০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। ওই টাকা পাঠানোর পর আবারও চাওয়া হলে মোবাইল নম্বরটি যাচাই করে উপজেলা চেয়ারম্যান বুঝতে পারেন তিনি প্রতারিত হয়েছেন। তাৎক্ষণিক বিষয়টি তিনি ব্রাক্ষণবাড়ীয়া জেলার ডিসিকে জানান এবং এ বিষয়ে ১৯শে নভেম্বর থানায় মামলা করেন। মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর স্পুফিং এর মাধ্যমে ব্যবহার করে অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনৈতিক দাবি এবং নির্দেশনা প্রদানের প্রেক্ষিতে আইনানুগ ব্যবস্থা চেয়ে র‌্যাব সদর দপ্তর বরাবর একটি আবেদন করেন উপ-পরিচালক। এ ছাড়াও তারা ডাচ্‌্‌-বাংলা ব্যাংকের হট লাইন (কাস্টমার সার্ভিস) নম্বর ১৬২১৬ এবং মোবাইল ফোন কোম্পানির কাস্টমার সার্ভিস নম্বর ১২১ ও ১২৩ ‘স্পুফিং’ করার তথ্য তাদের সার্ভারে পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে র‌্যাব অভিযান চালায়। এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব-৪ এর একটি দল মেজর মো. খুরশীদ আলম এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইব্রাহিম খলিল এর নেতৃত্বে গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মহানগরীর উত্তরা (পশ্চিম) থানাধীন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে প্রতারক চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানিয়েছে, ইতিমধ্যে তারা কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, দিনাজপুর, ব্রাহ্মণবাড়ীয়াসহ আরো অনেক জেলার ডিসি এবং ভোলা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, চাঁদপুর, মেহেরপুর, বাগেরহাটসহ মোট ৪০টিরও বেশি উপজেলার ইউএনও পরিচয় দিয়ে এ পর্যন্ত ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে।
র‌্যাব-৪ এর সিও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছে, তারা ‘ইয়েস কার্ড অ্যাপস’ এর মাধ্যমে মোবাইল নম্বর স্পুফিং করে নিজেরা ইউএনও, ডিসি পরিচয়ে গম, চাল এবং অন্যান্য কাজের জন্য বরাদ্দের কথা বলে বিভিন্ন ইউপি চেয়ারম্যান, জনসাধারণের কাছ থেকে বিকাশ নম্বরের মাধ্যমে প্রতারণা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়াও তারা দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া নামে রেজিস্ট্রিকৃত মোবাইল সিম বিভিন্ন অপরাধীর কাছে বিক্রয় করে আসছে। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে ২২টি মোবাইল ফোন সেট, ৫৩টি সিম, ২টি ল্যাপটপ, ৪টি সিপিইউ, ৫টি মনিটর, ১টি মডেম ও নগদ ১৭ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রতারকচক্রটি আরো জানায়, তারা পরস্পর যোগসাজশে বিটিআরসির অনুমোদন ছাড়া অবৈধভাবে তাদের ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনে এই অ্যাপসটি ব্যবহারের মাধ্যমে কল করার জন্য প্রতি মিনিট ১ টাকা ৭০ পয়সা করে অন্যান্য সদস্যের নিকট বিক্রি করত। পাশাপাশি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিভিন্ন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড শিখানোর বিজ্ঞাপন আপলোড করত। ‘ইয়েস কার্ড অ্যাপস’ বহির্বিশে প্রচলিত ‘আইটেল মোবাইল ডায়ালার’ সফটওয়ারটির রূপান্তরিত সংস্করণ। এ ধরনের সফটওয়ার সার্ভার বিদেশে নানা প্রতিষ্ঠানের হয়ে থাকে। কল করলে সেটি সার্ভার হয়ে বাংলাদেশের গেটওয়ে দিয়ে টার্গেট ব্যক্তির মোবাইলে আসে। যার কারণে যে নম্বরে কলটি আসে, সেটিতে রেকর্ড থাকলেও যার নম্বর ব্যবহার করা হয় সেটিতে কোনো রেকর্ড থাকে না। কারণ এই স্পুফিং কলে কোনো অপারেটরের টাওয়ার ব্যবহার হয় না। প্রতারিত ব্যক্তি যদি সে নম্বরে কল ব্যাক করেন তাহলে কলটি প্রকৃত ব্যবহারকারীর কাছেই যায়। তখনই কেবল প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ে। এই সফটওয়ারগুলোর একটি অংশ প্রতারকদের মোবাইলে ইন্সটল করা থাকে, ‘বিলিং ম্যানেজার’ নামে আরেকটি কম্পিউটারে ইন্সটল করা থাকে। যে নম্বর ব্যবহার করে প্রতারণা করা হয় তার জন্য ডলারের বিনিময়ে এই বিলিং ম্যানেজারের মাধ্যমে একটি ইউজার আইডি এবং পাসওয়ার্ড নিতে হয় এবং মিনিট কিনতে হয়। ক্রয়কৃত মিনিটগুলো দিয়ে মোবাইল সফটওয়ারটির মাধ্যমে টার্গেট ব্যক্তির মোবাইলে কল করা হয়। প্রতারণায় ব্যবহৃত এসব অ্যাপস এর নিয়ন্ত্রণকারী সার্ভার বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হওয়ায় এবং প্রতারকদের চিহ্নিত করার জন্য সরাসরি কোনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি না থাকায় এদের গ্রেপ্তার কষ্টকর ও সময়সাপেক্ষ।
সংবাদ সম্মেলনে লুৎফুল কবীর আরো বলেন, গ্রেপ্তারকৃত চক্রের প্রত্যেক সদস্যের কাজ ভাগ করা। এ চক্রের মূল হোতা আশরাফুল ইসলাম ওরফে আপেল। মাহমুদুল হাসান ওরফে হৃদয় চৌধুরী নম্বর ক্লোন করতে সরাসরি সহায়তা করতো। রাকিবুল ইসলাম মূল হোতা আপেলের প্রধান সহকারী। সে ব্যক্তিগত সহকারী, পিয়ন, বাড়ির দারোয়ান ও কাজের লোক সেজে ফোনে চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের কাছ থেকে টাকা নিতো। মহিদুল ইসলাম ওরফে মিলন, আবু কাউছার ওরফে সাবু ও নাজমুল হাসান সহযোগী হিসেবে বিকাশে টাকা সংগ্রহ করতো। সাগর হোসাইন ও আমানউল্লাহ আমান অবৈধভাবে ইন্টারনেটের ব্যবসায়ী ও চক্রের সহযোগী। আর বিল্লাল হোসেন ইয়েস কার্ড অ্যাপস বিক্রি করতো। এই র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন।

Share Now
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031