এপাড়ে বাংলাদেশের পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার রামগড়। ওপাড়ে ভারতের অঙ্গরাজ্য ত্রিপুরা। মাঝে ফেনী নদী। একপাশে বিজিবি অন্য পাশে বিএসএফের কড়া পাহারা।
কিন্তু সেই পাহারা ভেঙ্গে সীমান্তের কাঁটাতারের বিভাজন উঠে যায় মাত্র একটি দিনের জন্য। দিনটি ছিল গত ২৬ মার্চ (রোববার)। ফেনী নদীতে বারুণী স্নানকে কেন্দ্র করে দু‘দেশের মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছিল মিলনের কেন্দ্রস্থল।
দু’পাড়ের মানুষের ভাষা এক বাংলা, সংস্কৃতিতেও অনেক মিল। শুধু জাতীয়তায় ভিন্নতা। দু’দেশের মানুষের মধ্যে কারো কারো রয়েছে আত্মীয়তার সম্পর্ক। আবার কারো কারো আপন রক্তের সম্পর্কের মানুষও বসবাস করেন কাঁটাতারের এপাড়-ওপাড়ে। পাসপোর্ট ভিসার জটিলতায় আপনজনদের সাথে মিলিত হতে চাইলেও অনেকের সাধ্য থাকেনা। এ দিনে প্রয়োজন পড়ে না এসব সরকারী বিধি নিষেধ। প্রাণের টানে ছুটে চলেন আপনজনদের কাছে। সেই সাথে উৎসুক মানুষরাও অনায়াসে পার হন ভিন্ন দেশের স্বাদ নিতে। দিনের আলো শেষ হওয়ার পূর্বেই ফেরার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে আসা যায়।

ফটিকছড়ি থেকে আসা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘খুব ভোর সকালে আসায় ত্রিপুরা রাজ্যের মূল পয়েন্ট ‘আগরতলা’ পর্যন্ত ঘুরে আসলাম। ওখানকার জীবনযাত্রাসহ দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শন করে বেশ ভাল লাগলো।’
মান্নানের মতো আরো অনেক বাংলাদেশী ভিসা পাসপোর্ট ছাড়া ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে একদিনের জন্য ঘুরে বেড়িয়েছেন। অনেকে সেখান থেকে কেনাকাটাও করেছেন।
ফটিকছড়ি থেকে আসা সংবাদকর্মী সাইফুর রহমান সোহান বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর হতে রামগড় হয়ে-সাবরুম সীমান্তে নির্মানাধীন স্থল বন্দরটিও পরিদর্শন করতে পারলাম। একই সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের মানুষের কৃষ্টি, কালচার ও জীবনযাপন সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেয়েছি। এখানে এসে সবচেয়ে আশ্চর্য্য হলাম যেটি দেখে তা হলো, দূর্গম দক্ষিণ ত্রিপুরার এ পাহাড়ি অঞ্চলেও সাহিত্যপ্রেমিদের দেখে। এখানে কিছুদূর যেতই চোখে পড়ে ‘সাহিত্য বিপনন কেন্দ্র ও পাঠাগার’। যা সত্যিই আমাকে অবাক করেছে।’
ত্রিপুরার উদয়পুরে বসবাস চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাণী ত্রিপুরার মাসিমার। তিনি পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে আত্মীয়ের বাড়ি এসেছেন। বলেন, সারা বছর নানা ব্যস্ততা আর ভিসা জটিলতার কারণে এখানে আসতে পারিনা। বারুনী øানের দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকি সারা বছর। এমন একটি সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়াতে বিএসএফ-বিজিবি উভয়কে ধন্যবাদ।’
জানা যায়, বৃটিশ শাসনামল থেকেই চৈত্রের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশি তিথিতে প্রতি বছর ফেনী নদীতে বারুণী স্নানে মিলিত হন দুই দেশের হিন্দু , ত্রিপুরা, মারমা, চাকমা ধর্মাবলম্বীরা। বাংলাদেশের পার্বত্য খাগড়াছড়ির রামগড় ও ভারতের ত্রিপুরার সাবরুম অংশে নদীর দুই তীরে দুই দেশের পৌরহিতরা সকালেই বসেন পূজা অর্চণায়। পূর্ব পুরুষদের আত্মার শান্তি কামনা ছাড়াও নিজেদের পুণ্যলাভ ও সকল প্রকার পাপ থেকে মুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে বারুণী স্নানে ছুটে আসেন তাঁরা।
চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ফেনী, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি থেকে হাজারো নারী-পুরুষ পূণ্যøানে অংশ নিতে ছুটে আসেন রামগড় পৌর সদরের এ সীমান্তে। নদীর দু‘পারে বসে মেলা। যেখানে চলে দিনব্যাপী হরেক রকমের বিকিকিনি।
