পাঁচ সংগঠনের উদ্যোগে আলাদা ব্যানারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিল কয়েক’শ মানুষ। মঙ্গলবার বেলা ১১টা। রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে ওভারব্রিজ থেকে ক্লাবের পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত ১০০ গজের মধ্যে উচ্চস্বরে বাজছিল পাঁচ পাঁচটি মাইক। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে দেখা যায় শতাধিক পুলিশ। মাইকের আওয়াজে উপস্থিত সবার কান ঝালাপালা হওয়ার অবস্থা। সংগঠনগুলোর দাবি-দাওয়া আলাদাভাবে তুলে ধরলেও মাইকের এলোমেলো আওয়াজে বোঝার কোনো উপায় নেই, সম্ভবও নয়। সাংবাদিকদেরকে দেখা গেল কাগজ কলম হাতে দৌড়ঝাঁপ করতে।মাইকের বিচ্ছিন্ন আওয়াজের কারণে সংবাদকর্মীদের তথ্য সংগ্রহ করতেও বেগ পেতে হচ্ছিল।

তবে মজার বিষয় হচ্ছে-কেউ কারো কথা শুনুক বা না-শুনুক নেতারা একবার বক্তৃতা করার সুযোগ পেলেই ব্যস, লম্বা সময় পার করে দিচ্ছেন। বক্তব্য শুরু করলে যেন আর শেষ করতে-ই চাইছেন না।এভাবেই ১০০ গজের মধ্যে পাঁচ সংগঠনের দুই ঘণ্টা ধরে চলে মানববন্ধন কর্মসূচি।

উপস্থিত এক বেরসিক এই প্রতিবেদককে বলছিলেন, ‘একসঙ্গে পাঁচ পাঁচটি মাইকের বিকট শব্দে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন রীতিমতো অশান্তিতে রূপ নিয়েছে ভাই’।

রাস্তার ফুটপাত ঘেঁষে দাঁড়ানোর জন্য পুলিশ বারবার তাগাদা দিলেও কে শোনে কার কথা। মানববন্ধনকারীরা মূল সড়কের অনেক দূর  পর্যন্ত চলে যাচ্ছিল। ফলে নগরীর ব্যস্ততম এই সড়কটিতে আটকা পড়ছিল শত শত যানবাহন। মানববন্ধন কভার করতে আসা গণমাধ্যমকর্মীদের বিশেষ করে ফটোসাংবাদিকদের রাস্তার মাঝ বরাবর চলে যাওয়ার কারণে সড়কের যানজট পরিস্থিতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। দায়িত্বরত পুলিশকেও অনেক সময় অসহায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। দুর্ঘটনার শঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছিল না। সর্বোপরি কোনো কিছুতেই যেন নজর নেই আয়োজকদের।

শুধু মঙ্গলবারই নয়। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এমন কর্মসূচির চিত্র থাকে বছরজুড়ে। ছোটখাটো রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনই বেশিরভাগ সময় এসব কর্মসূচি পালন করে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন দিবসকে ঘিরে প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে মানববন্ধনের সংখ্যা বেড়ে যায়।

বলা হয়ে থাকে, মানবনন্ধন করতে হলে কোনো হল রুম ভাড়া নিতে হয় না। প্রয়োজনে মাইক ছাড়াও কর্মসূচি পালন করা যায়। দাবি দাওয়া  সম্বলিত ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে বক্তব্য শুরু করে দিলেই হলো। যে কারণে অনেক সময় আয়োজকরা এমন কর্মসূচি পালনে স্বস্তিবোধ করেন। আর প্রেসক্লাব কেন্দ্রীক সাংবাদিকদের আনাগোনা বেশি থাকায় সহজে অনুষ্ঠানের কভারেজও পাওয়া যায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,মঙ্গলবার ১১টার দিকে প্রেসক্লাবের মূল ফটকের সামনে মানববন্ধন করছিল মুসলিম নিকাহ রেজিস্টার সমিতি। তাদের পূর্ব পাশে (ওভারব্রিজের নীচে) মানববন্ধনে অংশ নেয় নোয়াখালী প্রতিদিনের ব্যানারে অর্ধশতাধিক মানুষ। দুইপক্ষই মিয়ানমারের মুসলমানদের উপর নির্যাতন ও গণহত্যার প্রতিবাদ  এবং দায়ীদের শাস্তি দাবিতে মানববন্ধন করছিল।

একই সময় প্রেসক্লাবের মূল ফটক থেকে একটু পশ্চিমদিকে মানববন্ধন করছিল বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান আদিবাসী পার্টি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা এবং গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ওপর হামলার প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছিল। মানববন্ধন শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপিও দেয়া হয়।

আদিবাসীদের কর্মসূচির পাশেই ময়মনসিংহে পুলিশের গুলিতে শিক্ষক  নিহতের প্রতিবাদ এবং দায়িদের শাস্তি দাবিতে মানববন্ধনে যোগদেন শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোট। শিক্ষক নেতা সেলিম ভুইয়া এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিচ্ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ ও চলতি ইস্যুতে মানববন্ধন করলেও এতে উপস্থিতি ছিলো বিশজনের মতো।

এই যখন অবস্থা তখন আদিবাসী ও শিক্ষকদের মানববন্ধনের পেছনে কর্মসূচি পালনের অপেক্ষায় ছিলেন আরো একটি সংগঠন।  নিকাহ রেজিস্টার সমিতির কর্মসূচি শেষ হতে না হতেই ওই জায়গা দখলে নেয় প্রাইভেট মাদরাসা অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ। তারাও  মিয়ানমারের মুসলমানদের উপর নির্যাতন ও গণহত্যার প্রতিবাদ  এবং দায়িদের শাস্তি দাবিতে মানববন্ধন করেন। এতে দলপাড়া জামিয়া ইমদাদিয়া, উত্তরার শায়খুল হাদিস আল্লামা শেখ আজীমুদ্দীন অংশ নেয়।

মানববন্ধন থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন ও হত্যা বন্ধ না হলে দেশটির বাংলাদেশের দূতাবাস ঘেরাওয়ের হুমকি দেয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রেস ক্লাবের সামনে দায়িত্বরত পুলিশের একজন কর্মকর্তা ঢাকাটাইসকে বলেন,‘কেউ যাতে সড়ক বন্ধ করে বা কোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা না হয় সেজন্য কাজ করে থাকি। কিন্তু কারা কিভাবে মানববন্ধন করবে সেটা তাদের বিষয়।

Share Now
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031