উপকূলীয় বেড়িবাঁধ কাম রোড নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে নানা চড়াই-উৎরাই শেষে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে । অথচ এই প্রস্তাবনা ছিল ১৯৬১ এর মাস্টারপ্ল্যানে। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালের মাস্টারপ্ল্যানেও ছিল এই রোডটি বাস্তবায়নের কথা। ২০ বছর মেয়াদি সেই প্ল্যানও শেষ হয়েছে ২০১৫ সালে। কিন্তু রোড বাস্তবায়নে ছিল না কোনো উদ্যোগ। অবশেষে বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে সেই রোড।

মাত্র তিন মাসে ডিপিপি অনুমোদন, প্ল্যানিং কমিশনের অনুমোদন, প্রি-একনেক ও একনেক শেষ করে নির্মাণ হতে যাচ্ছে শাহ আমানত সেতুর চাক্তাই খাল থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত সাড়ে আট কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়কটি। সমুদ্র সমতল থেকে ২৪ ফুট উঁচু, রোডের নিচে ২৫০ ফুট চওড়া ও রোডের উপরিভাগে ৮০ ফুট চওড়া সড়কটি ২০২০ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে এক হাজার ৯৭৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়ন হবে প্রকল্পটি।

এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পুরো চান্দগাঁও ও বাকলিয়া এলাকার চিত্র বদলে যাবে জানিয়ে বিশিষ্ট ট্রান্সপোর্টেশন বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, ‘১৯৬১ ও ৯৫ এর মাস্টারপ্ল্যানেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা ছিল, কিন্তু এতোদিন তা হয়নি। দেরিতে হলেও এই রোডটি বাস্তবায়ন হলে চান্দগাঁও, বাকলিয়া, মোহরাসহ বিশাল এলাকার মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। একই সাথে এই রোডের সাথে অন্তর্বর্তী রোডগুলোও যুক্ত করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি এসব এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে। এতোদিন যাতায়াত ব্যবস্থার অভাব ও জোয়ারের পানির কারণে মানুষ এখানে আসতো না। এখন সবাই আসতে চাইবে এবং শহরটি এদিকে বিস্তার লাভ করবে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে চাক্তাই খাল থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত সাগর পাড়ের আউটার রিং রোডের আদলে নির্মিত হবে এই রোড। সমুদ্র সমতল থেকে ২৪ ফুট উঁচু, রোডের উপরিভাগে ৮০ ফুট চওড়া, রোডের নিচের দিকে ২৫০ ফুট চওড়া থাকবে। এছাড়া ১২টি খালে থাকবে টাইডাল রেগুলেটর ও পাম্প হাউস। এতে জোয়ারের পানিতে আর ডুবে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।’

তিনি বলেন, আউটার রিং রোডের আওতায় এই রোডটি নির্মাণের জন্য মাস্টারপ্ল্যানে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল। প্রথম পর্যায়ে আমরা সাগর পাড়ে নেভাল একাডেমি থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত চারলেনের উপকূলীয় বেড়িবাঁধ কাম রোড, ডিটি রোড থেকে থেকে বায়েজিদ পর্যন্ত চার লেনের বাইপাস সড়ক ও এখন কালুরঘাট থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত চার লেনের রোড নির্মিত হলে পুরো নগরী আউটার রিং রোডের মধ্যে বেষ্টিত হয়ে যাবে। এই রোডের মাধ্যমে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ সহজেই বঙ্গবন্ধু সড়ক হয়ে ডিটি বায়েজিদ সংযোগ রোড দিয়ে ঢাকা ট্রাঙ্ক রোডে যেতে পারবে। এতে নগরী যানজটমুক্ত হবে। তিনি আরো বলেন, এই রোডের কারণে চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, দেওয়ানবাজার, চকবাজার, বাকলিয়াসহ বিস্তৃত এলাকার মানুষ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে।

এই রোডটি একনেকে অনুমোদন দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে ১৮ নম্বর পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হারুনুর রশিদ বলেন, ‘আমার এলাকার মানুষ শীতকালের পূর্ণিমার জোয়ারেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন ধরে আমরা জলাবদ্ধতায় ভুগছিলাম। এখন রোড কাম বাঁধ নির্মিত হলে আমরা দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাব।’

একই ধরনের মন্তব্য করে চান্দগাঁও ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাইফুদ্দিন খালেদ বলেন, বৃষ্টিতে আমার এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা পানিবন্দি থাকে। এখন যদি কর্ণফুলীর পাড় দিয়ে রোড ও টাইডাল রেগুলেটর নির্মিত হয় তাহলে আমরা এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবো।

এদিকে সিডিএ প্রকৌশলীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় নদীর ভেতরের অংশে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ঢালু করে ব্লক বসানো হবে। আর চার লেনের এই রোডটির সাথে খাজা রোড, কে বি আমান আলী রোড ও মিয়াখান রোড যুক্ত হবে।

এই এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্প নেয়ার কথা ছিল সেই অনুযায়ী ডিপিপিও তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বপন বড়ুয়া বলেন, মদুনাঘাট থেকে নেভাল একাডেমি পর্যন্ত উপকূলীয় বাঁধ ও স্লুইস গেইট নির্মাণের জন্য সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে তা প্ল্যানিং কমিশনে জমা হয়েছে। বিশাল এ প্রকল্পের অর্থায়ন কে করবে তা নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়ায় দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে।

সিডিএ’র তত্ত্বাবধানে চাক্তাই থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত আউটার রিং রোড কাম উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মিত হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সিটি করপোরেশনের প্রকল্পের সাথে ওভারলেপিং হবে কিনা জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘ওভারলেপিংয়ের কোনো প্রশ্নই আসে না। সিডিএ যে অংশের কাজ করবে আমরা (সিটি করপোরেশন) সেই অংশটি বাদ দিয়ে করবো। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাকলিয়া ও চান্দগাঁও এলাকা জলাবদ্ধতামুক্ত হবে। আমরা তো পুরো শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন নিয়ে পরিকল্পনা করছি।’

Share Now
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031