দেশি বিদেশি ফ্লাইট অপারেটরদের আনাগোনায় বিমানবন্দরের ব্যস্ততা অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বেড়েছে। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আক্ষরিক অর্থে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে। বেড়েছে ফ্লাইটের সংখ্যা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে থাই স্মাইল এবং মালিন্দোর যাত্রা শুরু হয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে চট্টগ্রামের জন্য পূর্ব এবং পশ্চিম দুয়ার পুরোপুরি খুলে যাবে। যা চট্টগ্রামের ব্যবসা বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর। চল্লিশের দশকের শুরুতে এয়ারফিল্ড হিসেবে চট্টগ্রামে এই বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবিমানের জ্বালানি সরবরাহের জন্য এ এয়ারফিল্ড তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তা বিমানবন্দরে রূপ নেয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এটি বাণিজ্যিক অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। বাংলাদেশ বিমান এবং ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স এখানে ফ্লাইট অপারেট করতে থাকে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ বিমান মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই ও সৌদি আরবে যাত্রী পরিবহন শুরু করলে বিমানবন্দরটি ১৯৯০ সালে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপ নেয়। তবে বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে প্রায় ২৩ বছর পর ২০১৩ সালে।
এর আগে জাপানি সংস্থা জাইকার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ১৯৯৮ সালে বিমানবন্দরটির আধুনিকায়নের কাজ শুরু হয়। ৫৭০ কোটি টাকা (৫১.৫৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয়ে প্রায় দুই বছর সময়ে আধুনিকায়নের কাজ সম্পন্ন হয়। ২০০১ সালে চট্টগ্রাম এম এ হান্নান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামে নতুন অবয়বে যাত্রা শুরু করে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিমানবন্দরটির নাম এম এ হান্নানের নামে থাকলেও বিএনপি সরকার দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামকরণ করে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করলেও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা এই বিমানবন্দরের রয়েছে। অবশ্য অটো রিফুয়েলিংসহ বিভিন্ন সুবিধা এই বিমানবন্দরকে একটি সুবিধাজনক অবস্থানেও রেখেছে।
বিমানবন্দরটি নামে আন্তর্জাতিক হলেও তেমন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কোন বিদেশি ফ্লাইট এখানে চলাচল করতো না। বাংলাদেশ বিমান সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ফ্লাইট অপারেট করতো। পরবর্তীতে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান সিল্ক এয়ার, ফুকেট এয়ার এবং থাই এয়ার চট্টগ্রামে আসলেও ক্রমে তারা ব্যবসা গুটিয়ে চলে যায়। কেবলমাত্র রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ফ্লাইট অপারেটর বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটই এখান থেকে চলাচল করতে থাকে। দিনকাল পাল্টাতে শুরু করেছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দেশি বিদেশি বিভিন্ন ফ্লাইট অপারেটর পূর্ব এবং পশ্চিমমুখী ফ্লাইট অপারেট করছে। এই বিমানবন্দর থেকে প্রতিদিনই একাধিক আন্তর্জাতিক রুটে বিমান উড়াল দিচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান ছাড়াও রিজেন্ট এয়ারওয়েজ, ইউএস বাংলা এয়ারওয়েজ, নভো এয়ার, ফ্লাই দুবাই, এয়ার এরাবিয়া, ওমান এয়ার, থাই স্মাইল এয়ারওয়েজ, মালিন্দো এয়ার চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট অপারেট করছে। এমিরেটস এবং ইত্তেহাদ এয়ারওয়েজ কার্গো ফ্লাইট অপারেট করে।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ম্যানেজার উইং কমান্ডার রিয়াজুল কবির দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে জানান, আমাদের বিমানবন্দরটি বর্তমানে বেশ ব্যস্ত একটি বিমানবন্দর। একটি আন্তর্জাতিক আবহ এই বিমানবন্দরে তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন ৪৪টি ফ্লাইট উঠানামা করে এরমধ্যে তেরটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রুটের।
চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি থাইল্যান্ড, কুয়ালালামপুর, সৌদি আরব, দুবাইসহ সংযুক্ত আরব আমিরাত, কলকাতায় সরাসরি ফ্লাইট অপারেট হওয়ায় চট্টগ্রামের জন্য পূর্ব এবং পশ্চিমমুখী দুয়ার পুরোপুরি খুলে গেছে বলে উল্লেখ করে একাধিক ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতি বলেছেন, বিষয়টি খুবই আনন্দের। এখন চট্টগ্রাম থেকেই বিশ্বের যে কোন দেশে উড়াল দেয়া যাচ্ছে। আগে ঢাকা হয়ে যাতায়াত করতে হতো। এই সুযোগ চট্টগ্রামের ব্যবসা বাণিজ্য এবং বিনিয়োগে বড় ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেও তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
চট্টগ্রাম চেম্বার প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম দৈনিক আজাদীকে বলেছেন, যে কোন উন্নয়নের পূর্ব শর্ত হচ্ছে কানেক্টিভিটি। চট্টগ্রাম কানেক্টিভিটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এখন আবার যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়েছে। এটি আমাদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
– See more at: http://www.dainikazadi.org/details2.php?news_id=2&table=april2017&date=2017-04-01&page_id=1&view=0&instant_status=0#sthash.WBKoJ4ES.dpuf