মিয়ানমারের তোম্বু এলাকায় থাকতো শিশু চারটি। বাবা-মার আদরেই বড় হয়েছে তারা। গত শুক্রবার রাতে হঠাৎ সেনাবাহিনীর আক্রমণ। নিজেরা পালাতে না পেরে, চার সন্তানকে পালিয়ে যেতে বলেন বাবা-মা। আর নানা পথ ঘুরে বাংলাদেশে এসেছে শিশু চারটি।
সোমবার উখিয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে এসেছে তারা। এদের দুই জনের বয়স ১০ থেকে ১২ এর মধ্যে। বাকিরা আরও ছোট। তাদের নানি হাসিনা বেগমের হাত ধরে টেকনাফ লেদা ক্যাম্পে এসে আশ্রয় নিয়েছে শিশু চারটি। তিনদিন পর দুপুরে ভাত খেতে পেরে মহাখুশি।
সবার বড় মরিয়াম (১২) ভয়ে ভয়ে কথা বলতে শুরু করে। ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে সে যা বলে তা হলো, শুক্রবার রাতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের ওপর আক্রমণ করে। তাদের মা হাসিনা বেগম ও বাবা আবুল কালাম চার ভাই বোনকে ঘর থেকে বের করে পালিয়ে যেতে বলেন। এরপর তারা অন্য লোকদের সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে এপারে প্রবেশ করেন।
মরিয়মের ভাই মো. সাবের বলে, ‘জানি না মা, বাবা বাঁচি আছে কি না। ওরা খুব খারাপ, আমাদের ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।’
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের দমনে সে দেশের সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশের দিকে ছুটে আসা হাজার হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে এই চারটি শিশুর বর্ণনা আলাদা কিছু নয়। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবির কড়া পাহারা, ধরা পড়লে ফেরত পাঠানোর মধ্যেও কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নানাভাবে ঢুকে পড়েছে জনপদে। আর ওপারের পরিস্থিতি জানেন বলে স্থানীয়রাও তাদেরকে গ্রহণ করছেন।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসাদের একজন আবদুর রহিম। তিনি মিয়ানমার মেরুল্লার পাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। তার স্ত্রী রহিমা খাতুনকে হারিয়ে চার সন্তান নিয়ে এপারে অনুপ্রবেশ করে টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছেন।
রহিমের সঙ্গে আসেন আরও ২০ জন মত রোহিঙ্গা। তারা সবাই উখিয়া রহমতবিল এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে লেদা বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছেন।
রহিম বলেন, ‘সেনারা চায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীদের রাখাইন রাজ্যে থেকে নির্মূল করতে। তাই তারা কিছু দিন পর পর এ হামলা চালায়। বর্তমানে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ছাড়তে ঘরবাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। যাতে কোন রোহিঙ্গা থাকার বাসস্থান না পায়।
হাজারো রোহিঙ্গা ঘরহারা হয়ে সীমান্ত ও জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে আছে জানিয়ে রহিম বলেন, ‘এমনকি তারা শিশুদের ওপর গুলি করে হত্যা করে।’
বিজিবির কড়া পাহাড়ার মধ্যেও রবিবার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছেন। এর মধ্যে উখিয়া সীমান্ত দিয়ে দেড় হাজার ও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে এসেছে পাঁচ শতাধিক মত।
সোমবার ভোরে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকালে পাচঁটি পয়েন্ট দিয়ে ২২২ জনকে আটক করেছে বিজিবি ও পুলিশ। পরে তাদেরকে মানবিক সহযোগিতা দিয়ে স্বস্ব সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠান হয়।
এছাড়া রাখাইনে জখম হওয়া ৩০ জনের বেশি রোহিঙ্গা উখিয়া-টেকনাফ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে চট্টগ্রামে চলে যান। এর মধ্যে দুই মারা গেছেন। তারা হলেন, মো. মুসা ও উখিয়া হারুন। তারা মিয়ানমার মংডু এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। গুলিবিদ্ধ অন্যরা হচ্ছে নাইম উল্লাহ, রাহামত উল্লঅহ, মো. ইমরান, মো. জাফর, নুরুল হক, মো. উল্লাহ।
সোমবার সকালে নাফনদী পার হয়ে হোয়াইক্যং উলুবনিয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেন নুর নাহার। তার সঙ্গে ছিল তার এক মাত্র শিশু কন্যা। এখন টেকনাফ লেদা রোহিঙ্গা বস্তিতে এসে কামাল হোসেনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে তিনি ওপারের সেনাবাহিনীর ববর্রতা বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘চোখে না দেখলে হয়তো বিশ্বাস করার মত নই। আমার সামনে আমার ছোট বোন দিল নেওয়াজকে গুলি করে হত্যা করেছে সেনারা।… শনিবার শিলখালী গ্রামে রাতে এদকদল সেনা হামলা দেয়। হঠাৎ করে রাতে আমার বাড়িতে ঢুকে পড়ে। তখন বাড়িতে আমার স্বামী নুর মোহাম্মদ বাড়িতে ছিল না। হয়তো এইটা তার ভাগ্যে। এরপর আমাকে টানা হেচড়া করে আর বলতে লাগে তোমাদের বস ‘আরসা’ কোথায়? এই কথা বলে আমাকে নির্যাতন শুরু করে।’
নুর নাহার জানান, তার বোন নির্যাতনে বাধা দিলে সেনারা তাকে গুলি করে হত্যা করে ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
‘আমি ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে বাহির হয়ে পালিয়ে যাই। গত তিন দিন ধরে এপাড়া ওপাড়া ঘুরতে থাকি। তারপর গত শুক্রবার মিয়ানমার সীমান্তে এসে পৌঁছি। সেখানে এক রাত থাকতে হয়েছিল। পরে কোন মতে নাফনদী পার হয়ে হোয়াইক্যং উলুবনিয়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আসি’-বলেন নূর নাহার।
‘গত চার দিন পর আজ সকালে এপারে এসে ভাত খেয়েছি। আমার স্বামী কি পরিণতি হয়েছে তা আমার জানা নেই। বেঁচে আছে কিনা সন্দেহ। মিলিটারি পাড়ায় ঢুকে পুরুষদের ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করছে।’
নূর নাহার জানান, সেনার নির্যাতনের সময় চিৎকার দিলে বলতে থাকে, ‘মরা বাঙালি, তাই বাংলাদেশে চলে যাও।’
টেকনাফ লেদা ক্যাম্পের নেতা আবদুল মতিন জানান, সেনারা এখন দিনের বেলায় বেশি হামলা করে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সীমান্ত থেকেও আগুন দেখা যায়। এইবার ধারণা করেন ওপারে কী ভয়াবহ অবস্থা।’
মতিন জানান, এক স্বজনের কাছে তিনি জেনেছেন সোমবার সেনারা ১৮টি গ্রামে ঘরবাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। এতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা ঘর হারা হয়ে জঙ্গল ও সীমান্তে অবস্থান করছে। কিছু রোহিঙ্গা এপারে অনুপ্রবেশ করেছে।
লেদা ক্যাম্পের আবদুল হাফেজ জানান- রাতের আঁধারে আইন প্রয়োগকারি সংস্থার দৃষ্টি এড়িয়ে দলে দলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। তিনি জানান- বেশির ভাগ রোহিঙ্গা কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নিচ্ছে। এখান থেকে অনেকে বিভিন্ন স্থানে চলেও যাচ্ছে।
সকাল ১০টার দিকে টেকনাফ স্টেশনে দেখা যায় দুটি রোহিঙ্গা পরিবার চাঁদের গাড়িতে উঠে অজ্ঞাত স্থানে চলে যাচ্ছে। এই রোহিঙ্গা পরিবার জানায় শনিবার ভোরে তাঁরা সীমান্ত অতিক্রম করে প্রথমে শাহপরীর দ্বীপে আসে। এরপর তারা কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলী এলাকায় স্বজনের কাছে চলে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠেছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল খায়ের বলেন, গতকাল রাত নয়টার দিকে পুলিশের একটি বিশেষ দল নারী-শিশুসহ ৮১ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে। পরে তাদের মানবিক সহযোগিতা দিয়ে বিজিবির মাধ্যমে ফেরত পাঠানো হয়।
জানতে চাইলে টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম আরিফুল ইসলাম বলেন, সীমান্ত জুড়ে বিজিবির টহল জোরদার রয়েছে। তবুও কিছু কিছু পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিজিবি তাদের প্রতিহত করছে।
