প্রথম জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে । এর পর থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দেশে ঘটতে থাকে একের পর এক এ ধরনের হামলা। এ সময় জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদুল ইসলামী ও হিযবুত তওহীদ’ এই ৪টি জঙ্গি সংগঠন নানাভাবে তৎপর ছিল বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ।
২০০৬ সালে বাংলাভাইসহ কয়েকজন জঙ্গি নেতা গ্রেফতার ও পরবর্তীকালে তাদের ফাঁসি কার্যকর করার পর বড় ধরনের জঙ্গি হামলাও আড়ালে চলে যায়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রথম বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে যশোর টাউন হল ময়দানে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সম্মেলনে। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ রাতের ওই ভয়াবহ বোমা হামলায় প্রাণ যায় ১০ জনের এবং আহত হয় প্রায় ২০০ নারী-পুরুষ। সেই হামলার পরই দেশে আলোচনায় ওঠে আসে জঙ্গিবাদের বিষয়টি। এ ঘটনার অর্ধযুগ পর ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে সিরিজ বোমা হামলার মধ্য দিয়ে জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) নিজেদের শক্তি জানান দেয়।
সম্প্রতি জঙ্গি সংকটে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে ‘নারী জঙ্গি’। ২০১৬ সালের জুলাই মাসের শুরুতে গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক অভিযানের মধ্যে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে জেএমবির ৩ নারী সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের স্বামীরাও জঙ্গি কর্মকা-ে জড়িত বলে সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। জুলাই মাসেই সিরাজগঞ্জ শহরে জেএমবির সন্দেহভাজন ৪ নারী সদস্যকে আটক করে পুলিশ; তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় হাতবোমা, বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও উগ্র মতবাদের বই। এরপর আগস্টে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে জেএমবির ৪ নারী সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র্যাব, যারা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলের ছাত্রী।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ৪ জন তহবিল ও কর্মী সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অতঃপর ৫ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার গান্ধাইল ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ইতলী গ্রাম থেকে ৪ নারীকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা ‘জেএমবির আত্মঘাতী দলের সদস্য’। ওই পরিবারের ছেলে ফরিদুল ইসলাম ওরফে আকাশ অক্টোবরে গাজীপুরের এক জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নিহত হন। এর ৫ দিন পর ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরের একটি বাড়িতে পুলিশি অভিযানে সেখানে নব্য জেএমবির নেতা তানভীর কাদেরী আত্মহত্যা করেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। আর তানভীরের স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে খাদিজা, গুলশান হামলায় জড়িত নুরুল ইসলাম মারজানের স্ত্রী আফরিন ওরফে প্রিয়তি এবং জেএমবি নেতা বাসারুজ্জামান চকলেটের স্ত্রী শারমিন ওরফে শায়লা আফরিনকে পুলিশ আহত অবস্থায় আটক করেন। ওই তিন নারী মরিচের গুঁড়া ও ছোরা নিয়ে হামলা চালিয়েছিলেন বলে সেদিন পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। তিনজনের মধ্যে একজন পুলিশের গুলিতে আহত হন, বাকি দুজন ছুরি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন বলে জানায় পুলিশ। তানভীর-ফাতেমা দম্পতির যমজ ছেলেদের একজনকে আজিমপুরের অভিযানের সময় আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়। আরেক ছেলের খোঁজ করতে গিয়ে রাজধানীর দক্ষিণখানের আশকোনায় জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পায় পুলিশ।
গত ২৪ ডিসেম্বর আশকোনায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের মধ্যে সন্তান নিয়ে দুই নারী জঙ্গির আত্মসমর্পণ এবং গ্রেনেড ফাটিয়ে এক নারীর আত্মাহুতির ঘটনা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে বিশেষভাবে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কেউ কেউ ইতিমধ্যে সন্তানের মা হয়েও জঙ্গিত্বের পথ বেছে নেওয়ার কারণ কী? তারা কি রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের জন্য এ পথ বেছে নিয়েছে? নাকি স্বর্গ পেতে চেয়ে? তারা কি স্বেচ্ছায় এ পথে পা রাখছে, নাকি তাদেরকে প্ররোচিত কিংবা বাধ্য করা হচ্ছে? এ প্রসঙ্গে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে সম্প্রতি যা জানিয়েছেন তা আমরা আমলে নিতে পারি। তিনি জানিয়েছেন, নব্য জেএমবির যে কয়জন নারী সদস্য এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন বা আত্মসমর্পণ করেছেন, তারা সবাই স্বামীর চাপে বা সামাজিক কারণে ওই পথে গেছেন বলে ধারণা পেয়েছে পুলিশ। নব্য জেএমবিতে এমন কোনো নারী নেই যিনি নিজের ইচ্ছায় জঙ্গিবাদে জড়িয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার, আত্মসমর্পণ করে রিমান্ডে থাকা নারীদের কাছে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য এবং বিভিন্ন অভিযানে পাওয়া আলামত থেকে জানা গেছে, সামাজিক কারণে, আত্মীয়স্বজনদের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে এবং স্বামীদের চাপে তারা জঙ্গিবাদে যুক্ত হয়েছেন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন খবরে আরও জানা যায়, জঙ্গি নেতারা তাদের সন্তানদেরও জঙ্গি মতাদর্শে বিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে চাইতেন। তারা মনে করতেন, সন্তানের মাকে তাদের মতাদর্শে আনা গেলে তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে। এজন্য তারা স্ত্রীদের জঙ্গি মতাদর্শে বিশ্বাসী হিসেবে গড়ে উঠতে চাপ দিতেন। আবার স্বামী জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে খবর পেলে সামাজিকভাবে ছোট হয়ে যেতে হতো। আত্মীয়স্বজনরা তাকে কখনোই মেনে নিত না। তাই অনেকটা মনের বিরুদ্ধে তাকে স্বামীর সঙ্গে থাকতে হয়েছে। সত্য যদি এই হয়, তাহলে এক্ষেত্রে অভিযুক্ত নারীদের সরাসরি দায়ী করা কতটা যৌক্তিক? বরং বলা যায়, এক্ষেত্রে পরিবারের অপর সদস্যদের অসচেতনতাই অনেকাংশে দায়ী।

র্যাব ও পুলিশের দাবি, সারা দেশেই জেএমবিসহ বিভিন্ন উগ্রবাদী সংগঠনে এখন রিক্রুট করা হচ্ছে নারীদের। তাদের কাছে এর একটা তালিকাও আছে। তাতে দেড় সহস্রাধিক সক্রিয় সদস্য থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে হামলা চালানোর জন্য এদের ব্যবহারের পরিকল্পনা আছে উগ্রবাদীদের। নারী জঙ্গিরা জেলা পর্যায়ে পাড়া-মহল্লায় ধর্ম প্রচারের নামে ও ছোট ছোট সাপ্তাহিক ধর্মসভার আড়ালে কাজ করছে। পুরুষদের পাশাপাশি জঙ্গিবাদে মহিলাদের তৎপরতায় শঙ্কা বাড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতেও।
সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, জঙ্গিবাদী তৎপরতায় মহিলাদের ব্যবহারের কিছু সুবিধা আছে বিবেচনায় নিয়েই দলে টানা হচ্ছে। হতে পারে পর্দা করার কারণে এদের শনাক্ত করা কঠিন এবং অস্ত্র-বিস্ফোরক বহনও এদের জন্য সহজ। বিশেষ করে আত্মঘাতী হামলায় এদের ব্যবহারে বাড়তি সুবিধা পেতে পারে জঙ্গিরা। তাই উঠতি বয়সী তরুণীদের মধ্যেও জিহাদি মতাদর্শ বিস্তারে নানা ধরনের কৌশল খাটাচ্ছে জঙ্গিরা। বিশেষ করে তারা ইসলামি দাওয়া নামে মাহফিলের আড়ালে জঙ্গি মতাদর্শের দীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। জঙ্গিবাদ বিস্তারে মূলত ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করছে ঠান্ডা মাথায়, যদিও ইসলাম কখনো জঙ্গিবাদ সমর্থন করে না।
বলতে হচ্ছে, এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। ধর্মকে তারা সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখে। আর নারী জঙ্গিরা পুরুষ জঙ্গিদের শিক্ষামতে সেই ধর্মকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। এরা প্রথমে মানুষের সঙ্গে আন্তরিকতা বৃদ্ধি করে। খুব সুন্দর সুন্দর কথা বলে। ধর্মীয় আলোচনা, সবকিছুর খোঁজখবর নেওয়া এদের অনেকটা রুটিনওয়ার্ক। তারপর একদিন সেই সদ্য পরিচিতের বাসায় মাহফিলের নামে আয়োজন করে বিশেষ সভা। সেখানে তারা ধর্ম নিয়ে আলোচনা করে। কোনোভাবেই বোঝার উপায় থাকে না যে, এরা কাউকে সুকৌশলে বিপথগামী করার ষড়যন্ত্র করছে! এরা সহজ-সরল ও সাবলীল ভাষায় ধর্মীয় কথাবার্তা বলার এক পর্যায়ে হঠাৎ করেই আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সুকৌশলে জুড়ে দেয় রাজনৈতিক আলাপ। সেই পরিচিতের মনে কৌশলে ঢুকিয়ে দেয় কিছু বিশেষ চিন্তার খোরাক। তারপর এক সময় সদস্য করে নেয় নিজেদের দলের।
এক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে, তাদের অপতৎপরতা রোধে আমাদের সমাজে সচেতন মানুষের যে খুবই অভাব। চায়ের স্টলে গলা ফাটিয়ে নানা বিষয়ে মন্তব্য করতে আমরা যতটা পটুÑ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সুরক্ষায় ততটা নই! আর এ কারণেই আমাদের কারও না কারও মা, বোন কিংবা মেয়ে আজ জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। তাছাড়া ঘটনাচক্রে নিজেদের কেউ এ পথে পা রেখেছে জানলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছি না! তাহলে কি বলা যায় নাÑসচেতন দাবিদারদের অসচেতনতাও অসচেতন বা পরিস্থিতির শিকার হওয়াদের ভুল পথেই স্থির থাকতে বাধ্য করছে?
সবশেষে বলতে হয়, ধর্মকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা ধর্মান্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধীরা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সমাজকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। এমন প্রেক্ষাপটে দেশে নারী জঙ্গিদের উত্থান নিঃসন্দেহে নিরাপত্তার নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। আর এখনই জঙ্গিবাদকে মোকাবেলা না করলে আমাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে। সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। গ্রামে গ্রামে মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে, যেন নারী কিংবা পুরুষ কেউই কোনোভাবেই জঙ্গিবাদের বিস্তার না ঘটাতে পারে। তবে শুধু সরকার নয়, জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে হলে এগিয়ে আসতে হবে দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে সামাজিক নিরাপত্তা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সর্বজনীন অধিকার ভয়াবহভাবে ক্ষুণœ হবে এবং হুমকিতে পড়বে আমাদের জাতিসত্তা।
